পাবনায় রমজান ঘিরে অস্থির হয়ে উঠেছে ফলের বাজার। প্রতি কেজি ফলে দাম বেড়েছে ৩০ থেকে ৭০ টাকা। বেশি দাম বেড়েছে আপেল ও মাল্টার। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এক টুকরো আপেল বা মাল্টায় ইফতার যেন এক অসাধ্যের গল্প। তথ্য বলছে, কৃষি প্রধান জেলা হিসেবে পাবনার খ্যাতি থাকলেও পাবনায় বরই ও পেয়ারা ছাড়া কোনো ফলেরই আবাদ হয় না। ফলে ঢাকা, সিরাজগঞ্জ ও নাটোর থেকে আমদানি করা ফলে চাহিদা মেটে পাবনার মানুষের। রমজানের সপ্তাহ দুয়েক আগে বিভিন্ন ফলের দাম কিছুটা কম থাকলেও রমজান শুরুর আগের সপ্তাহ থেকেই বাজারে উত্তাপ বাড়তে থাকে। রমজানের দুদিন আগে থেকে দ্বিতীয় রমজান পর্যন্ত এ উত্তাপ আরও বেড়ে যায়। প্রতি কেজি ফলের দাম বেড়ে যায় ৫০ থেকে ১০০ টাকা। তবে এখন দাম কিছুটা কমেছে। রমজানের আগের তুলনায় এখন বাড়তি ৩০ থেকে ৭০ টাকা গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। বাজার ঘুরে জানা যায়, প্রতি কেজি লাল আপেলের বর্তমান মূল্য ৩৮০ টাকা। রমজানের আগে থেকে দ্বিতীয় রমজানের শুরুতে এই দাম উঠেছিল ৪০০ টাকা। রমজানের আগে যা ছিল ৩৪০-৩৫০ টাকা। ফুজি আপেলের বর্তমান বাজারদর ৩৪০ টাকা। রমজানের আগে ছিল ৩০০ টাকা। একইভাবে দাম বেড়ে গালা আপেল ৪২০ ও সবুজ আপেল ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ২২০ টাকার কেনু কমলা ২৬০, ৩২০ টাকার ম্যান্ডারি কমলা ৩৫০, ৩৫০ টাকার নাশপাতি ৪৪০, ৩০০ টাকার মাল্টা ৩৪০ ও সাইজ ভেদে ৫০০ থেকে ৫৮০ টাকার বেদেনা ৫২০ থেকে ৬১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে এরও আগে এর দাম ছিল ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে। এছাড়া একটু কম দামি ফলের মধ্যে প্রতি কেজি আনারস ৭০ টাকা, চলতি মৌসুমের তরমুজ ৮০ টাকা, রমজানের শুরুতে জান্নাত তরমুজ বিক্রি হয়েছে ১০০ টাকায়, দ্বিতীয় রমজান পর্যন্ত ১৫০ টাকায় বিক্রি হওয়া বরই বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা, প্রতি হালি কলা বিক্রি হচ্ছে ৩০-৪০ টাকায়। এছাড়া মানভেদে প্রতি কেজি হিসেবে বর্তমানে খেজুর বিক্রি হচ্ছে ২৮০ থেকে ১৭০০ টাকায়। রমজানের এক সপ্তাহ আগে থেকে প্রথম রমজান পর্যন্ত এসব খেজুর বিক্রি হয়েছে ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেশি দরে। এদিকে দাম কমেছে আঙুরের। সাধারণ বা সবুজ আঙুর প্রতি কেজির বর্তমান বাজারদর ৪০০-৪২০ টাকা। এর আগে এর দাম ছিল ৪৫০ টাকা। একইভাবে ৬০০ টাকার লাল আঙুরের দাম কমে হয়েছে ৫৫০ ও ৬০০ টাকার কালো আঙুর হয়েছে ৫৬০ টাকা। ক্রেতারা বলছেন, ফলের দাম সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা দেশি ফলের দিকে ঝুঁকছে। কিন্তু সেখানেও স্বস্তি নেই। দেশি বা আমদানি সব ফলের দামই চড়া। ইফতার বা সাধারণ প্রয়োজনেও ফলে হাত দেওয়ার অবস্থা নেই। এক্ষেত্রে সুযোগ বুঝে বিক্রেতাদের দাম বাড়ানোয় লাগাম টানতে বাজার তদারকি জোরদার করা উচিত বলে দাবি ক্রেতাদের। পাবনা শহরের আব্দুল সড়কের ফলের দোকানগুলোতে ফল কিনতে আসা হাফিজা হাসান জানান, সারাদিন রোজা রাখার পর শরীরে ভিটামিনসহ প্রয়োজনীয় উপাদানের জন্য ইফতারে কিছু ফলমূল রাখা উচিত। এজন্য দোকান ঘুরে ঘুরে দেখছি। কিন্তু ফলের যা দাম তাতে কোনোটাতেই হাত দেওয়ার অবস্থা নেই। আপাতত নাগালের মধ্যে আছে বরই ও পেয়ারা। তবে তুলনামূলকভাবে এগুলোর দামও অতিরিক্ত। কিনতে হবে, এজন্ই বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে কয়েকটা আপেল ও মাল্টা নিবো। আরেক ক্রেতা রাইসুল বলেন, রোজার আগের সপ্তাহ থেকে ফলমূলের দাম বাড়ানো শুরু হয়। রোজা শুরুর আগের দুদিন ও প্রথম রোজায় সব ফলের দাম ব্যাপক বাড়ানো হয়। কোনো কোনো ফলে ১০০ টাকাও বাড়ানো হয়। সরবরাহ কমের অযুহাতে বিক্রেতারা এই কারসাজি করেন। প্রশাসনকে দেখাতে মূল্য তালিকা ঝুলিয়ে রাখলেও অনেক দোকানদার তার থেকে বেশি দাম হাঁকে। এভাবেই বাজার ক্রেতা সাধারণ বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে গেছে। রিকশাচালক মতিন ও পাবনার স্থানীয় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে লেবার পোস্টে চাকরি করা আজমত শেখ জানান, বাজারের যা অবস্থা তাতে সবজি ও তরি তরকারিসহ নিত্য পণ্য কিনতেই ঘাম ছুটে যাচ্ছে। এটা নিলে সেটা নেওয়া যাচ্ছে না। সেখানে ফল তাদের জন্য বড় রকমের বিলাসিতা। একটা আপেল কিনতে গেলে ৫০-৬০ টাকা গুনতে হয়। রিকশা চালিয়ে ভাড়া ও চার্জ বাদে দিনে বর্তমানে সর্বোচ্চ আয় ৪০০ ও চাকরির বেতন অনুযায়ী আয় ৫০০ টাকা। এ দিয়ে চাইলেও ফল দিয়ে ইফতার করার সুযোগ নেই। বিসমিল্লাহ ফল ভান্ডারের ফজলু বলেন, রমজানের কয়েকদিন আগে থেকে শুরু পর্যন্ত দাম একটু বাড়তি ছিল। এখন সে তুলনায় কিছুটা কমেছে। আমরা মূল্য তালিকা টাঙিয়ে বিক্রি করছি। অতিরিক্ত দাম নিই না। বাড়তির দামের ব্যাপারে নিউ পাবনা ফল ভান্ডারের রাফিদ ইসলাম বলেন, দাম বৃদ্ধি নিয়ে ভোগান্তি শুধু ক্রেতাদের নয়, আমাদেরও। দাম বেশি হওয়ায় আমাদের বেচা বিক্রি কম হয়। আমরাও চাই দাম সহনীয় পর্যায়ে থাক। সবাই আমাদের কাছে এসে ফল কিনতে পারুক। কিন্তু এসবতো আর আমাদের হাতে থাকে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ফল বিক্রেতা বলেন, পাবনার ফলের বাজার নির্ভর করে ঢাকা, সিরাজগঞ্জ ও নাটোরের ফল ব্যবসায়ীদের ওপর। তাদের থেকে স্থানীয় আমদানিকারকরা আনেন এবং পরে তা আমাদের দোকানগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। সবচেয়ে বেশি ফল আসে ঢাকা থেকে। এক্ষেত্রে তারা যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন বাজার সেদিকে যায়। এখানে আমাদের স্থানীয় আমদানিকারকদেরও কিছুটা সমস্যা আছে। কারণ শহরের বাইরে বেড়ার কাশিনাথপুর বা অন্যান্য উপজেলায় আমাদের তুলনায় দাম কিছুটা কম। অন্যান্য রমজানের তুলনায় এবার বেচা বিক্রি কম জানিয়ে শহরের মায়ের দোয়া ফল ভান্ডারের মঞ্জু বলেন, রমজান এলে ফলের চাহিদা বাড়ে, এদিকে সরবরাহ কম। এজন্য এসময় একটু দাম বাড়ে। এখানে আমাদের কিছু করার নেই। ফলভেদে কেজি প্রতি ৩০-৫০ টাকা লাভ আমাদের সর্বোচ্চ চাওয়া। কারণ ফল পচনশীল, আবার আসতেও কার্টুন প্রতি ২-৩ কেজি করে নষ্ট হয়। পাবনা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাহমুদ হাসান রনি বলেন, রমজানের বাড়তি চাহিদাকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে অনেক ফল ব্যবসায়ী বাজারকে অস্থির করে তোলেন। এতে ক্রেতারা ভোগান্তির শিকার হন। এটি লাঘবে আমরা রমজানের শুরু থেকেই নিয়মিত বাজারগুলোতে তদারকি করছি। অতিরিক্ত দাম রাখা বা অসঙ্গতি পেলেই জরিমানা ও অন্যান্য ব্যবস্থা নিচ্ছি। বুধবারও হাজিরহাটসহ বিভিন্ন জায়াগায় ফলের দোকানগুলোতে অভিযান চালানো হয়েছে। ন্যায্যমূল্যে পণ্য কেনার ক্ষেত্রে ভোক্তার অধিকার রক্ষায় আমরা সর্বোচ্চ তৎপর রয়েছি। আলমগীর হোসাইন নাবিল/এফএ/এএসএম