ইরান ইস্যুতে কি পুনরাবৃত্তি হচ্ছে ইরাক যুদ্ধের ইতিহাস?

২০০৩ সালে কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ‘গুরুতর হুমকি’ আখ্যা দিয়ে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রাখার অভিযোগ তোলেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই শুরু হয় ইরাক যুদ্ধ। ২৩ বছর পর একই কংগ্রেস ভবনে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে প্রায় একই সুরে ইরানকে ‘অসাধু শাসনব্যবস্থা’ ও ‘পারমাণবিক হুমকি’ বলে চিত্রিত করেন। বিশ্লেষকদের মতে, বুশ ও ট্রাম্পের ভাষা ও উপস্থাপনায় মিল থাকলেও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট এখন ভিন্ন। ভয় তৈরির নতুন ভাষা ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ‘মাশরুম ক্লাউড’ বা জৈব অস্ত্রের আতঙ্ক ছড়িয়ে ইরাককে তাৎক্ষণিক হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। ২০২৬ সালে সেই ভয়কে স্থানান্তর করা হয়েছে ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার দিকে—এমনটাই বলছেন ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্লেষক ওসামা আবু ইরশায়েদ। আরও পড়ুন>>ইরানে হামলায় শীর্ষ নেতৃত্বকে নিশানা, সরকার বদলের চিন্তা যুক্তরাষ্ট্রেরইরান ঘিরে উত্তেজনা/ লেবাননে মার্কিন দূতাবাসের কর্মীদের সরিয়ে নিলো যুক্তরাষ্ট্রইরানে মার্কিন হামলায় যোগ দেওয়া সমর্থন করেন ৫৯ শতাংশ ইসরায়েলি ট্রাম্প তার ভাষণে দাবি করেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানার লক্ষ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠন করছে। তবে হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তা ও বিশেষ দূতদের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা গেছে। একদিকে ২০২৫ সালের ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এ ইরানের স্থাপনা ধ্বংসের দাবি, অন্যদিকে ‘ইরান এক সপ্তাহ দূরে’—এমন সতর্কবার্তা—এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। শাসন পরিবর্তনের প্রশ্নে বিভক্তি ২০০৩ সালে বুশ প্রশাসনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ডসহ নীতিনির্ধারকেরা একই অবস্থানে ছিলেন। কিন্তু ২০২৬ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে মতপার্থক্য স্পষ্ট। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ প্রকাশ্যে বলেছেন, তাদের লক্ষ্য ‘শাসন পরিবর্তন’ নয়, বরং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা। তবে সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প লেছেন, ‘বর্তমান ইরানি শাসন যদি ইরানকে মহান করতে না পারে, তাহলে শাসন পরিবর্তন কেন নয়?’ তার এই মন্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে ঘিরে কঠোর অবস্থান নেওয়ার মধ্য দিয়ে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। জোট নয়, একক অবস্থান? ২০০৩ সালে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের সমর্থনে ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’ গঠন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৬ সালে সেই ধরনের বিস্তৃত জোট গঠনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না বলেই মত বিশ্লেষকদের। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক টানাপোড়েনে রয়েছে। যুক্তরাজ্য নাকি ইরানবিরোধী হামলায় দ্বীপ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। ফলে মার্কিন বি-২ বোমারু প্লেনকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘপথ উড়ে অভিযান চালাতে হবে। নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতা ইরাক যুদ্ধের পর গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও তথ্য বিভ্রান্তি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। কংগ্রেসের নজরদারি জোরদারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও ২০২৬ সালে সেই নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কংগ্রেস সদস্য রো খান্না ও টমাস ম্যাসি অননুমোদিত যুদ্ধ ঠেকাতে পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় তা কঠিন হয়ে উঠেছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। নতুন চুক্তি নাকি নতুন যুদ্ধ? জেনেভায় মার্কিন ও ইরানি আলোচকদের বৈঠক চলছে। তবে একই সঙ্গে গত বছরের সামরিক অভিযানের ছায়া পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—দুই দেশের দীর্ঘ বৈরিতা কি নতুন কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাবে, নাকি ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের মতো আরেকটি বৃহত্তর সংঘাতে রূপ নেবে? ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি না ভিন্ন অধ্যায়—উত্তর নির্ভর করছে কূটনীতি, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। সূত্র: আল-জাজিরাকেএএ/