রোগমুক্তির আশায় এ মসজিদে আসেন অন্য ধর্মাবলম্বীরাও

আওলাদে রাসূলের স্মৃতিবিজরিত ঐতিহাসিক এক মসজিদ। যে মসজিদে নামাজ পড়তে ভিড় করেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ। শুধু মুসলমানরাই নয়, রোগবালাই থেকে মুক্তিলাভের আশায় ও বিভিন্ন কারণে এ মসজিদে মানত করতে আসেন অন্য ধর্মাবলম্বীরাও।ঐতিহাসিক এই মসজিদটি রাজবাড়ী পৌরসভার সামনে ৮৫ শতাংশ জমির ওপর অবস্থিত। একতলা ভবনবিশিষ্ট মসজিদটির রয়েছে সুবিশাল এক গম্বুজ। নারীদের জন্য রয়েছে আলাদা নামাজের জায়গা। হুজুরা শরীফ, খানকা শরীফ, অতিথিদের থাকাসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। আঞ্জুমান-ই-কাদেরীয়া পরিচালিত এ মসজিদটি জেলার সবচেয়ে সুন্দর ও মর্যাদাপূর্ণ মসজিদ বলে দাবি কাদেরীয়া তরিকার মুরিদান এবং সাধারণ মুসল্লিদের। নান্দনিক এই মসজিদে প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের মুসল্লি ও দর্শনার্থীদের আগমন ঘটে। এখানে একসঙ্গে প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। এ মসজিদটি কত বছর আগে নির্মাণ হয়েছে তার সঠিক তথ্য কেউ বলতে না পারলেও, এটি ১৮২০ থেকে ১৮৩০ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় বলে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠালগ্নে এই মসজিদটির নাম ছিল রাজবাড়ী টাউন মসজিদ। পরে রাসূল মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর ৩১ তম বংশধর হজরত সৈয়দ শাহ মুরশিদ আলী আল কাদেরী ১৮৯২ সালে রাজবাড়ীতে অবস্থান নেন। তার ছোঁয়ায় এই মসজিদটি বড় মসজিদ (খানকা শরীফ) হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তখন মসজিদটি দোচালা ছনের ছিল। ওই সময় মহকুমার সাব রেজিস্ট্রার এনামুল কবিরসহ তিনজন তার কাছে মুরিদান গ্রহণ করেন। তখন থেকে ধীরে ধীরে টাউন মসজিদ থেকে রাজবাড়ী বড় মসজিদ (খানকা শরীফ) নামকরণ হয় মসজিদটির। আরও পড়ুন: মক্কা-মদিনা, কারবালা এবং ফিলিস্তিনের মাটি ব্যবহার হয়েছে বরিশালের এই মসজিদটিতে এরপর হজরত সৈয়দ শাহ মুরশিদ আলী আল কাদেরীর সুযোগ্য শাহজাদা হজরত সৈয়দ শাহ এরশাদ আলী আল কাদেরী এখানে আগমন করেছিলেন এবং পরে তার সুযোগ্য শাহজাদা হজরত সৈয়দ শাহ মুস্তারশীদ আলী আল কাদেরীও আগমন করেছিলেন। তার অবর্তমানে তারই সুযোগ্য শাহজাদা হজরত সৈয়দ শাহ রশিদ আলী আল কাদেরী গদ্দেনশীন হওয়ার পর পাঁচবার এখানে আগমন করেছেন। তার অবর্তমানে তার ছোট ভাইয়ের ছেলে হজরত সৈয়দ শাহ ইয়াসুব আলী আল কাদেরী আল বাগদাদী আল হাসানি আল হোসাইনি আল মেদিনীপুরী (আ.) এর আগমন ঘটেছে এখানে। বর্তমানে আঞ্জুমান-ই-কাদেরীয়া (সংগঠন) মসজিদটি পরিচালনা করে। মাহাতাব উদ্দিন নামে স্থানীয় এক মুসল্লি বলেন, আমি প্রায় ৬০ বছর ধরে এই মসজিদে নামাজ পড়ি। সব থেকে বড় কথা এই মসজিদে এলে আমার মনে তৃপ্তি লাগে। আমার আওলাদে রাসুলের গওসপাকের কদম আছে এই মসজিদে। রাজবাড়ী জেলার সকল মানুষ এই মসজিদকে পবিত্র স্থান বলে মনে করে। মসজিদের অভ্যন্তরে টুপি, তসবি ও আতর বিক্রি করেন গোলাই মল্লিক। তিনি বলেন, আমি ২০ বছর যাবত এই মসজিদে টুপি, আতর, তসবি বিক্রি করি। এখানে অনেক দূরদূরান্ত থেকে মানুষ নামাজ পড়তে আসে। মানুষের মনের একটা আশা বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানীর মসজিদ, আওলাদে রাসুলের মসজিদ, এ কারণে অনেকেই দূরদূরান্ত থেকে নামাজ পড়তে আসেন। মসজিদ দেখে সবাই প্রশংসা করেন। এ ছাড়া অনেকে তাদের ছোট বাচ্চাকে চিনি মুখে দিতেও এই মসজিদে নিয়ে আসে। মসজিদের পেশ ইমাম হাফেজ মো. শাহজাহান বলেন, আমাদের এই মসজিদটা ঐতিহ্যবাহী বড় মসজিদ নামে পরিচিত। এই মসজিদে আল্লাহর রাসুল (সা.) প্রদত্ত কিছু নেয়ামত রয়েছে। যার কারণে বিভিন্ন জায়গা থেকে মুসল্লিদের আগমন ঘটে। এই মসজিদে আওলাদে রাসুলের কদম পাক আছে। এছাড়া এই মসজিদে আরও কিছু ঐতিহ্য রয়েছে। যেমন: পাঁচজন আওলাদে রাসুল এখানে আগমন করেছেন। অনেক মুসল্লি বলেন এই মসজিদে নামাজ পড়লে অন্তর শীতল হয়ে যায়, তাদের নামাজ ও ইবাদতে মনোযোগ আসে। তিনি আরও বলেন, রাজবাড়ী পৌরসভার মধ্যে এখন অনেক মসজিদ রয়েছে। তবে ব্রিটিশ আমলে এখানে মাত্র তিনটি মসজিদ ছিল। তার মধ্যে একটি হচ্ছে রাজবাড়ীর বড় মসজিদ। ১৮৯২ সালে আওলাদে রাসূলের ৩১তম বংশধর হজরত সৈয়দ শাহ মুরশিদ আলী আল কাদেরী এখানে এসেছিলেন। তার কদম পাকের ছোঁয়া এখানে পড়েছে। তারপর থেকেই এটি বড় মসজিদ নামে পরিচিতি লাভ করে। হাফেজ মো. শাহজাহান আরও বলেন, আমাদের এই মসজিদে মুসল্লিদের জন্য প্রায় সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এছাড়া মসজিদের ভেতরের সৌন্দর্য, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে অনেক ভালো। এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হয়। প্রতি ওয়াক্তে তিন শতাধিক মুসল্লি নামাজ পড়েন। এ ছাড়া জুমার নামাজে প্রায় দেড় হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করেন। মুসল্লিদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়ার জন্য মসজিদ কর্তৃপক্ষ আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। আরও পড়ুন: মুসলিম ঐতিহ্যের সাক্ষ্য গালুয়ার সেই পাকা মসজিদ এছাড়া মাহে রমজানে প্রতিদিন কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে ইফতারের আয়োজন করা হয় এবং অগণিত লোক এখানে ইফতারিতে শরিক হন। এছাড়া পবিত্র খতম তারাবিহ হয়। দুজন হাফেজ সাহেব খতম তারাবিহ নামাজ পড়ান। এছাড়া কেউ বড় বিপদে পড়লে, কঠিন অসুস্থ হলে আওলাদে রাসূলের এই দরবার শরীফে এসে বিভিন্ন মানত করেন। এই জন্য মসজিদটি অন্যান্য মসজিদ থেকে একটু ব্যতিক্রম ও মর্যাদাপূর্ণ বলে সবাই মনে করেন।