ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা আমাদের ভাষার গৌরব আর চেতনার রঙে উজ্জ্বল হয়ে উঠি। কিন্তু এই উৎসবের আবহে আমাদের মনন আর মেধার প্রকৃত মানচিত্রটি আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে? গতকাল ২৬ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধন এবং সম্প্রতি প্রশাসনিক কিছু বড় সংস্কারের তথ্য আমাদের সামনে এমন কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে, যা একইসঙ্গে উদ্বেগের এবং সম্ভাবনার। একজন বিশ্লেষক হিসেবে আমি মনে করি, এই পরিবর্তনশীল তথ্যপ্রবাহের গভীরে লুকিয়ে আছে একটি জাতির মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর রসদ। সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে কেন এই বিষয়গুলো জানা এবং বিশ্লেষণ করা জরুরি তা নিয়ে আজকের এই নিবন্ধ। পড়ার অভ্যাসে আমরা কোথায়? ১০২ দেশের মধ্যে ৯৭তম!বই পড়ার অভ্যাস নিয়ে সম্প্রতি যে বৈশ্বিক পরিসংখ্যান সামনে এসেছে, তাকে মেধাসম্পন্ন জাতি গঠনের পথে এক অশনি সংকেত বললে ভুল হবে না। আন্তর্জাতিক এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১০২টি দেশের মধ্যে পাঠাভ্যাসে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। পরিসংখ্যানটি আরও ভয়াবহ যখন দেখা যায় যে, এ দেশের একজন মানুষ বছরে গড়ে মাত্র ৩টি বই পড়েন। সাংস্কৃতিক এই দেউলিয়াত্ব কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতার মজ্জাগত অবক্ষয়কে নির্দেশ করে। এই পাঠবিমুখতা দূর করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। \"ইন্টারনেটে বই পড়া গেলেও কাগজের পাতায় কালো অক্ষরের গভীরতা অন্য কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়। গবেষকরা বলছেন, অতিরিক্ত ইন্টারনেট আসক্তি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার আগ্রহ কমিয়ে দেয়। তাই তরুণদের বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে তোলার উপায় আমাদের বের করতে হবে।\" বই পড়া কেবল শখ নয়, এটি মস্তিষ্কের জন্য একটি \'ব্যাংক\'ডিজিটাল আসক্তির এই যুগে আমরা যখন অন্তহীন \'স্ক্রলিং\'-এর গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছি, তখন প্রধানমন্ত্রী বই পড়াকে মস্তিষ্কের জন্য একটি \"ব্যাংক\" হিসেবে অভিহিত করে এক চমৎকার রূপক ব্যবহার করেছেন। এটি কেবল কোনো আলঙ্কারিক কথা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে গভীর বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য। বিশ্বের ১০২টি দেশের মধ্যে পাঠাভ্যাসে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। পরিসংখ্যানটি আরও ভয়াবহ যখন দেখা যায় যে, এ দেশের একজন মানুষ বছরে গড়ে মাত্র ৩টি বই পড়েন। সাংস্কৃতিক এই দেউলিয়াত্ব কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতার মজ্জাগত অবক্ষয়কে নির্দেশ করে। এই পাঠবিমুখতা দূর করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বই পড়ার অভ্যাস যেমন একজন নাগরিককে ব্যক্তিগতভাবে সমৃদ্ধ করে, তেমনি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। বই পড়া মস্তিষ্কে এমন এক স্থায়ী জ্ঞানতাত্ত্বিক আমানত জমা করে, যা সময়ের সাথে সাথে বৃদ্ধি পায়। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস আলজাইমার বা ডিমেনশিয়ার মতো জটিল রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়। ডিজিটাল মাধ্যমের খণ্ডিত তথ্যের চেয়ে কাগজের বইয়ের গভীর পাঠ আমাদের মনোযোগের গভীরতা ফেরাতে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অপরিহার্য। এটি কোনো ক্ষণস্থায়ী বিনোদন নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিয়োগ। অমর একুশে বইমেলা: আন্তর্জাতিক ও দেশব্যাপী প্রসারের স্বপ্নবইমেলাকে কেবল ঢাকা কেন্দ্রিক বা নির্দিষ্ট একটি মাসভিত্তিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে একে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তাবটি সুশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ—সাংস্কৃতিক বিকেন্দ্রীকরণ। লক্ষ্য হলো, বছরজুড়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও যেন বইয়ের আলো পৌঁছাতে পারে। বইমেলাকে \'অমর একুশে আন্তর্জাতিক বইমেলা\' হিসেবে রূপান্তরের যে স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, তার দুটি প্রধান উদ্দেশ্য রয়েছে: প্রথমত, বিশ্ব সাহিত্যের সঙ্গে আমাদের নাগরিকদের সরাসরি মেলবন্ধন ঘটানো; এবং দ্বিতীয়ত, বহু ভাষা ও সংস্কৃতির আদান-প্রদানের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের লক্ষ্যটিকে বিশ্বমঞ্চে আরও জোরালো করা। একুশের হাত ধরেই এসেছে বইমেলা। বাংলা একাডেমি চত্বরে চিত্তরঞ্জন সাহা যে মেলা শুরু করেছিলেন তা আজ ফুলে ফলে মহীরুহ। বাঙালির কোনো সাংস্কৃতিক উৎসব নেই। সেদিক থেকে বইমেলা আমাদের সাংস্কৃতিক উৎসবে রূপ নিয়েছে। এর পরিসর ব্যাপ্তি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠনের সূত্রটি নিহিত আছে তার জ্ঞানতৃষ্ণা এবং শাসনব্যবস্থার সততার মেলবন্ধনে। বই পড়ার অভ্যাস যেমন একজন নাগরিককে ব্যক্তিগতভাবে সমৃদ্ধ করে, তেমনি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। যখন একজন নাগরিক বেশি বই পড়েন, তিনি অধিকতর সচেতন হন এবং প্রতিষ্ঠানের কাছে জবাবদিহিতা দাবি করার সক্ষমতা অর্জন করেন। একটি জ্ঞানভিত্তিক এবং স্বচ্ছ সমাজ গড়তে এই দুটি ধারাকে এক সুতোয় গাঁথা আজ সময়ের দাবি। একটি জ্ঞানভিত্তিক এবং স্বচ্ছ সমাজ গড়তে আপনি ব্যক্তিগতভাবে কোন পদক্ষেপটি সবার আগে নিতে চান? আপনার ক্ষুদ্র একটি অভ্যাসই হতে পারে আগামীর বাংলাদেশের পরিবর্তনের কারিগর। আর পাঠাগার আন্দোলন সেখানে গতি আনতে পারে। লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ। drharun.press@gmail.com এইচআর/জেআইএম