রমজানে পায় নতুন চেহারা, বছরজুড়ে টানে পর্যটক

ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে অপূর্ব অলংকরণে সুশোভিত একটি মসজিদ আছে ময়মনসিংহে। তিনতলা বিশিষ্ট এ মসজিদে একসঙ্গে ছয়-সাত হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। ঈদ ও জুমায় স্থানীয়রা ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ নামাজ পড়তে আসেন। ঈদ ও বিশেষ রজনীগুলোতে মুসল্লিদের ঢল নামে। পবিত্র রমজান মাসেও মুসল্লিদের উপস্থিতি বাড়ে। প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অসংখ্য মুসল্লি এ মসজিদে ইতেকাফ করেন। মসজিদের খতিব, মুয়াজ্জিন ও মুসল্লিদের প্রচেষ্টায় এ মাসে নতুন চেহারা পায় মসজিদটি। ময়মনসিংহ শহরের কোতোয়ালি মডেল থানা সংলগ্ন চকবাজার এলাকায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ‘বড় মসজিদ’-এর চিত্র এটি। ধারণা করা হয়, রমজানে এ মসজিদেই জেলার সবচেয়ে বড় তারাবির জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ইতিহাসের অন্যতম নিদর্শন ও দ্বীনের আলোয় আলোকিত বড় মসজিদ যুগের পর যুগ ধরে ধর্মীয় স্মারক হয়ে টিকে আছে। প্রতি বছরের মতো এবারও রমজানে বয়স্কদের জন্য পবিত্র কোরআন শিক্ষা কার্যক্রম, পাশাপাশি শুদ্ধভাবে আরবি সাহিত্যের প্রশিক্ষণ ও দাওয়াতি কার্যক্রম চলমান আছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, মসজিদটির প্রবেশমুখেই জলকেলিরত রং-বেরঙের মাছের শোভামণ্ডিত স্বচ্ছ-পবিত্র পানির হাউজ। আছে আলাদা অজুখানা। মসজিদের অভ্যন্তরে মূল্যবান মোজাইক পাথরের মেঝে, দেওয়ালজুড়ে শ্বেতশুভ্র মনোরম টাইলস, সুদৃশ্য ঝাড়বাতি, অত্যাধুনিক শব্দ নিয়ন্ত্রণ ও তাপানুকূল ব্যবস্থা। মসজিদের পশ্চিম দিকে আছে দুটি অনুচ্চ ফাঁপা গম্বুজ। প্রধান তিনটি প্রবেশমুখেও আছে অনুচ্চ গম্বুজ শোভিত ফটক। ছাদের রেলিং দেওয়া হয়েছে মিনার-গম্বুজের আদলে ঢেউ খেলানো শোভায়। ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা জানান, এ মসজিদ ময়মনসিংহ বিভাগের কেন্দ্রীয় দ্বীনি প্রতিষ্ঠান। মসজিদটি বৃহত্তর ময়মনসিংহের গর্ব ও ঐতিহ্যের স্মারক। ইসলাম প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রেও এ মসজিদের ভূমিকা অনেক। সেইসঙ্গে মসজিদকেন্দ্রিক বড় আবাসিক হাফেজিয়া ও দাওয়াতে হাদিস পর্যন্ত কওমি মাদরাসাও সুনাম-সুখ্যাতি অক্ষুণ্ন রেখেছে। মসজিদে নামাজ আদায় করে মানসিক প্রশান্তি লাভ করেন মুসল্লিরা। আরও পড়ুনঐতিহ্যের মহিমায় টিকে আছে ভাংনী বাজার মসজিদ  মসজিদের ১২৫ ফুট উঁচু দুটি মিনার ও একটি কেন্দ্রীয় সুবৃহৎ গম্বুজে ব্যবহৃত হয়েছে চীনামাটির তৈজসপত্রের টুকরো দিয়ে তৈরি নান্দনিক নকশাকৃত আস্তরণ। যা আরও বেশি মসজিদের আকর্ষণ বাড়িয়েছে। মাথা উঁচু করে থাকা প্রাণজুড়ানো মিনার ও মসজিদ চোখ টানে বহু পর্যটকের। ইতিহাসের অন্যতম নিদর্শন ও দ্বীনের আলোয় আলোকিত বড় মসজিদ যুগের পর যুগ ধর্মীয় স্মারক হয়ে টিকে থাকবে অনন্তকাল এমনটাই চাওয়া সবার। বড় মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়েন সোহরাব হোসেন। তিনি বলেন, ‘মুসলিম স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন বড় মসজিদ। মসজিদে একসঙ্গে অনেক মানুষ নামাজ পড়েন। রমজান মাস উপলক্ষে মুসল্লি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। একসঙ্গে অনেকে নামাজ পড়তে পাড়ায় মনের ভেতরে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি পাওয়া যায়।’ সিদ্দিকুর রহমান নামের আরেকজন মুসল্লি বলেন, ‘এ মসজিদের প্রতি বাড়তি মোহাব্বত ও আলাদা আকর্ষণ আছে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের। ফলে স্থানীয় লোকজন ছাড়াও দূর থেকেও অনেকে নামাজ পড়তে আসেন। এ মসজিদে নামাজ পড়লে আলাদা প্রশান্তি পাওয়া যায়। অনেকে ক্লান্ত শরীরে মসজিদের ফ্লোরে শুয়ে-বসে বিশ্রাম নেন। আমি নিয়মিত এ মসজিদে নামাজ পড়ি।’ সংশ্লিষ্টরা জানান, সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের আমলেই বড় মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। আনুমানিক পৌনে ২০০ বছর আগে (১৮৫০-১৮৫২ সাল) গণ্যমান্য মুসলমানরা নামাজ আদায়ের জন্য টিনের ছাপরা দিয়ে এ মসজিদ নির্মাণ করেন। ১৯৩৫ সালের বেঙ্গল ওয়াকফ অ্যাক্টের অধীনে মসজিদটি পাবলিক এস্টেটে পরিণত হয়। প্রায় শূন্য এক দশমিক ৯ একর জমির ওপর নির্মিত হয় বড় মসজিদ। মসজিদটির দৈর্ঘ ১০৫ ফুট ও প্রস্থ ৮৫ ফুট। আরও পড়ুনসুলতানি আমলের ঐতিহাসিক নিদর্শন মসজিদকুঁড়  প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত মিশর থেকে আগত প্রখ্যাত কারি ও আলেম মাওলানা আবদুল আওয়াল (রহ.) ইমামের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪১ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত টানা ৫৬ বছর মাওলানা আশরাফ আলী থানভির (রহ) খলিফা হজরত মাওলানা ফয়জুর রহমান (রহ.) ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৭ সাল থেকে আল্লামা শায়খ আবদুল হক অত্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে তিনতলা বিশিষ্ট এ মসজিদের প্রতি তলায় ১৮টি কাতার আছে। মসজিদে একসঙ্গে ছয় থেকে সাত হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। ঈদ ও বিশেষ রজনীগুলোতে প্রায় ১০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করেন। ১৯৩২ সালে মসজিদ প্রাঙ্গণে হাফেজিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৫ সালে কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ ক্লাস দাওরায়ে হাদিস খোলা হয়। এ মাদরাসায় অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের শিক্ষাও দেওয়া হয়। মাদরাসায় ১২শ’র বেশি শিক্ষার্থী আছে। বড় মসজিদের ইমাম ও খতিব মাওলানা আবদুল হক বলেন, ‘বড় মসজিদটি শুধু এ অঞ্চলের ইসলাম ধর্মাবলম্বীর কাছে নয়, বৃহত্তর ময়মনসিংহসহ আশপাশের অঞ্চলের ইসলাম ধর্মাবলম্বীর কাছে অত্যন্ত আবেগের একটি জায়গা।’ এমডিকেএম/এসইউ