জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেয়া দেশের প্রথম গণতান্ত্রিক সরকার তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। দীর্ঘদিনের চিরাচরিত ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ নীতি থেকে সরে এসে নতুন প্রশাসন এখন ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা ‘আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে প্রাধান্য দিতে চায়।সরকারের নীতিনির্ধারক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মেরুদণ্ড শক্ত করে নিজের চোখে বিশ্ব দেখা, শক্তিশালী নিরাপত্তা কৌশল এবং অর্থনৈতিক স্বার্থই হবে এই নতুন পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি। বিগত ১৭ বছরের পররাষ্ট্রনীতিকে ‘নতজানু’ আখ্যা দিয়ে সরকারের দায়িত্বশীলরা বলছেন, বাংলাদেশ এখন তার হারানো মর্যাদা পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট। নতুন পররাষ্ট্রনীতি মূলত বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কূটনৈতিক দর্শনের আদলে সাজানো হচ্ছে।পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এ বিষয়ে স্পষ্ট করে বলেন, ‘‘আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’। আমরা মেরুদণ্ড শক্ত করে বিশ্বমঞ্চে এগিয়ে যেতে চাই। জাতীয় স্বার্থকে সবার উপরে রাখাই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার।’’বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা দুই ধরনের সমীকরণের কথা বলছেন।চীন-পাকিস্তান অক্ষ: যেখানে ‘জিও-ইকোনমিক্স’ ও ‘জিও-সিকিউরিটি’ বা ভূ-অর্থনীতি ও ভূ-নিরাপত্তা হবে প্রধান ভিত্তি। বিশেষ করে অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের ভূমিকা অপরহার্য।ভারত-যুক্তরাষ্ট্র অক্ষ: যেখানে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি ‘জিও-পলিটিক্স’ বা ভূ-রাজনীতি গুরুত্ব পাবে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে মানবাধিকার ও ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি এবং ভারতের ক্ষেত্রে সীমান্ত ও বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ।আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি সফল করতে হলে তৃতীয় কোনো পক্ষের প্রভাবে প্রভাবিত হওয়া যাবে না। তিনি বলেন, কারো সাথে সম্পর্কের শর্ত যদি হয় অন্য দেশের সাথে বৈরিতা, তবে সেখানে ‘বাংলাদেশ প্রথম’ হলো না। প্রতিটি দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক হবে স্বতন্ত্র।আরও পড়ুন: সার্ক পুনরুজ্জীবিত করতে সমর্থন দেবে বাংলাদেশ: পররাষ্ট্রমন্ত্রীঅন্যদিকে ওসমানী সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের চেয়ারম্যান ড. লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মাহফুজুর রহমান সিঙ্গাপুরের উদাহরণ টেনে বলেন, সিঙ্গাপুর যদি চীনের সঙ্গে বিশাল বাণিজ্য বজায় রেখেও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নিরাপত্তা ও সহযোগিতা নিশ্চিত করতে পারে, তবে বাংলাদেশ কেন পারবে না? এজন্য আমাদের ডিফেন্স পলিসি বা প্রতিরক্ষা নীতিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই পররাষ্ট্রনীতি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বিশ্ব দরবারে শক্ত অবস্থান জানান দিতে হলে দর কষাকষিতে দক্ষ ও জ্ঞানসমৃদ্ধ কূটনীতিক তৈরি করতে হবে। বিদ্যমান পররাষ্ট্র সংক্রান্ত বিভিন্ন চুক্তি ও নীতি পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে এবং নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ঘটাতে হবে।দীর্ঘদিন স্থবির থাকার পর পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক উন্নয়নের সম্ভাবনা এবং ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিমুখী চাপের মধ্যে বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সাথে এই ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবায়ন করতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।