জীবনে এমন অনুভূতি হয়নি, মনে হচ্ছিল মাটি নিচ থেকে সরে যাচ্ছে

জীবনে প্রথমবার তীব্র মাত্রার ভূমিকম্প অনুভব করলেন সাতক্ষীরা সদরের সুলতানপুর গ্রামের বৃদ্ধ আকবার আলী। জুমার নামাজের পর মসজিদে সুন্নত নামাজরত অবস্থায় হঠাৎ কেঁপে ওঠে চারপাশ। অনেকেই আতঙ্কে নামাজ ছেড়ে বাইরে ছুটে গেলেও তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন মসজিদেই। ৭৫ বছর বয়সী এই বৃদ্ধ পরে বলেন, ‌‘ভয় তো লাগছিল খুব। মনে হচ্ছিল মসজিদের দেয়াল ভেঙে পড়বে। কিন্তু ভাবলাম, যদি নামাজের মধ্যে মৃত্যু হয়, আল্লাহ হয়তো জান্নাত নসিব করবেন। তাই সেখান থেকে নড়িনি। পরে দেখি কম্পন থেমে গেছে। আমার জীবনে এমন তীব্র ভূমিকম্প দেখিনি।’ শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১টা ৫২ মিনিটে কয়েক সেকেন্ডের তীব্র ঝাঁকুনিতে কেঁপে ওঠে পুরো জেলা। রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৪ মাত্রার এ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল আশাশুনি উপজেলার আনুলিয়া ইউনিয়ন জানিয়েছে স্থানীয় আবহাওয়া অফিস। কম্পনের সময় শহর থেকে গ্রাম সবখানেই ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে খোলা জায়গায় আশ্রয় নেন। বিভিন্ন এলাকায় ভবনের দেওয়ালে ফাটল দেখা গেছে। তালা উপজেলায় একটি মাটির ঘর আংশিক ধসে পড়ে কয়েকজন আহত হয়েছেন। স্থানীয়ভাবে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। মাটি দুলছিল, বুক কেঁপে উঠেছিল সদরের মুনজিৎপুর এলাকার বাসিন্দা শাহাজাহান বলেন, ‘হঠাৎ দেখি ফ্যান দুলছে, আলমারি কাঁপছে। বুঝতে পারলাম ভূমিকম্প। জীবনে এমন অনুভূতি হয়নি। মনে হচ্ছিল মাটি নিচ থেকে সরে যাচ্ছে।’ একই এলাকার রাজু বলেন, ‘প্রথমে ভাবছিলাম মাথা ঘুরছে। পরে দেখি সবাই দৌড়াচ্ছে। বাচ্চাদের নিয়ে রাস্তায় চলে আসি। কয়েক সেকেন্ড হলেও মনে হচ্ছিল অনেকক্ষণ।’ কাটিয়া এলাকার মানিক বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় দেখেছি, জলোচ্ছ্বাস দেখেছি কিন্তু মাটি কাঁপার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। ঘর ভেঙে পড়বে ভেবে পরিবার নিয়ে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে পড়েছিলাম।’ গৃহিণী মাসুদা বেগম বলেন, ‘চুলায় ভাত বসানো ছিল। হঠাৎ ঘর কাঁপতে শুরু করলে কিছুই বুঝিনি। শুধু বাচ্চাদের নিয়ে বাইরে দৌড়েছি। এখনো ভয় কাটেনি।’ আরও পড়ুন: তীব্র ঝাঁকুনিতে কাঁপলো উৎপত্তিস্থল সাতক্ষীরার আশাশুনি ১২ বছর বয়সী শিশু শোয়াইবের ভাষ্য, ‘নামাজ পড়ে বাসায় আসার পরই হঠাৎ টেবিল কাঁপতে লাগল। খুব ভয় পেয়েছি। মনে হচ্ছিল ঘর ভেঙে পড়বে। পরে আম্মুর সঙ্গে বাড়ির বিমের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলাম।’ উদ্বেগে উপকূলবাসী উপকূলীয় এ জেলায় বড় ধরনের ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা খুবই বিরল। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে অভ্যস্ত মানুষ মাটির এমন তীব্র কম্পনে নতুন এক শঙ্কায় পড়েছেন। কিছুদিন আগে কলারোয়ায় ৪ দশমিক ১ মাত্রার আরেকটি ভূকম্পন অনুভূত হয়েছিল। পরপর কম্পনে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রাসেল জানান, শুক্রবার দুপুর ১টা ৫২ মিনিটে ৫ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পটি অনুভূত হয়। এর উৎপত্তিস্থল ছিল আশাশুনি উপজেলার আনুলিয়া ইউনিয়ন এলাকায়। কম্পনটির স্থায়িত্ব ছিল কয়েক সেকেন্ড। উপকূলীয় অঞ্চলে এ মাত্রার ভূমিকম্প তুলনামূলকভাবে অস্বাভাবিক হলেও এটি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত। পরবর্তী আফটারশকের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও জানান, বিষয়টি কেন্দ্রীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সাতক্ষীরা স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘ভূমিকম্পের পর জেলার বিভিন্ন স্টেশন থেকে তাৎক্ষণিক খোঁজ নেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের প্রাণহানি বা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর পাওয়া যায়নি। কিছু এলাকায় ভবনের দেওয়ালে ফাটলের তথ্য পাওয়া গেছে। আমরা সেগুলো পরিদর্শন করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘তালা উপজেলায় একটি মাটির ঘর আংশিক ধসে কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জেনেছি। স্থানীয়ভাবে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।’ সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে খোলা স্থানে অবস্থান নেওয়া, গুজব না ছড়ানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে প্রবেশ না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান ফায়ার সার্ভিসের এ কর্মকর্তা। আহসানুর রহমান রাজীব/এসআর/এএসএম