বদলি, দলিল ও দলিলের নকল তুলতে নির্দিষ্ট হারে ঘুস নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বরিশাল জেলা রেজিস্ট্রার মোহছেন মিয়ার বিরুদ্ধে। বরিশালে যোগদানের পর থেকেই নিয়মিত তিনি ঘুস নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। তার এই ঘুস বাণিজ্যের কারণে বরিশাল সদর সাবরেজিস্ট্রার অফিস ও দশটি উপজেলা সাবরেজিস্ট্রার অফিস অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় তিন বছর ধরে বরিশাল জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে থাকা এই কর্মকর্তা নিয়মিত ঘুস নিয়ে আসছেন। বদলি বাণিজ্য, দলিল প্রতি ঘুস, দলিলের নকল তুলতে ঘুস ও দলিল লেখকদের কাছ থেকে বাৎসরিক টাকা নেওয়া এখন ‘ওপেন সিক্রেট’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার এই নিয়মিত ঘুস আদায়ের জন্য দুজন সহযোগীও রয়েছেন। তারা হলেন- বরিশাল জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের অফিস সহকারী হালিম সিপাহি ও মহাদেব। মোহছেন মিয়ার নির্দিষ্ট ঘুসের টাকা আদায় করেন তারা। এদিকে ঘুস বাণিজ্যের অভিযোগে গত বছরের ১৬ এপ্রিল মোহছেন মিয়ার বিরুদ্ধে অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সেসময় অভিযানের খবর টের পেয়ে আগেই সটকে যায় মোহছেন মিয়া। জানা যায়, বরিশাল জেলার আওতাধীন কর্মকর্তাদের বদলির নামে বাণিজ্য করছেন মোহছেন। এছাড়া দলিল প্রতি ২০০ টাকা, নকল উঠানো বাবদ ৩৫ টাকা, ৩০০ দলিল লেখকদের কাছ থেকে বাৎসরিক নবায়ন বাবদ দেড় হাজার করে টাকা আদায় করা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবরেজিস্ট্রার অফিসের একাধিক কর্মচারী বলেন, মোহছেন মিয়া বরিশালে যোগদানের পর থেকেই বদলি বাণিজ্য করছেন। ৩-৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে এসব বদলি করেন তিনি। এছাড়া বরিশাল সাবরেজিস্ট্রার অফিসে ৩০০ দলিল লেখক রয়েছেন, তাদের কাছ থেকে বাৎসরিক লাইসেন্স নবায়ন বাবদ দেড় হাজার করে টাকা নেন মোহছেন মিয়া। জানা যায়, বরিশাল সদর অফিস থেকে দুর্নীতির দায়ে বদলি হওয়া শাহিনকে চার লাখ টাকা ঘুসের বিনিময়ে আবারও অফিস সহকারী হিসাবে যোগদান করান মোহছেন মিয়া। ঘুসের টাকা না পেয়ে মিজানুর রহমান নামের এক অফিস সহকারীকে বদলি করায় প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন ওই ভুক্তভোগী। রেকর্ড কিপার বিধান চন্দ্রকে চার লাখ টাকার বিনিময়ে বরিশাল সদর অফিসে বদলি করা হলেও একমাস পরে যোগদান করতে হয় তাকে। এরপর যোগদানের দুই মাস পরেই বিধান চন্দ্র সুতারকে হিজলায় বদলি করেন তিনি। সম্প্রতি হিজলা উপজেলা সাবরেজিস্ট্রার অফিসের নকলনবিশ দিলিপ চন্দ্রকে মোহরার পদে পদোন্নতি দেওয়ার বিনিময়ে দশ লাখ টাকা ঘুস নেন মোহছেন মিয়া। এছাড়া আগৈলঝাড়া সাবরেজিস্ট্রার অফিসের অফিস সহকারী ফাতেমাতুজ জোহরাকে আট লাখ টাকার বিনিময়ে পদোন্নতি দেওয়ার বন্দোবস্ত করেছেন এই জেলা রেজিস্ট্রার। অভিযোগ রয়েছে, বরিশাল সাবরেজিস্ট্রার অফিসের সাবেক পিওন জাহাঙ্গীর হোসেন অবসরে যাওয়ার সময় তার পেনশনের টাকা উঠানোর জন্য ছয় লাখ টাকা ঘুস দাবি করেন মোহছেন। পরে তার ছেলে জাহিদের মাধ্যমে চার লাখ টাকা ঘুস দিয়ে মোহছেন মিয়ার সঙ্গে রফাদফা করতে বাধ্য হন পিয়ন জাহাঙ্গীর। মোহছেন মিয়ার এসব ঘটনায় ঢাকা আইজিআর অফিসে অভিযোগ গেলেও লালন নামের তৎকালীন এক অফিস সহকারীকে টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করেন তিনি। দলিল করতে আসা একাধিক ভুক্তভোগী বলেন, এরকম একজন দুর্নীতিগ্রস্ত অফিসারকে বদলি করা না হলে মানুষের ভোগান্তি কমবে না। ঘুস বাণিজ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযোগ অস্বীকার করেন মোহছেন মিয়া। এছাড়া দুদকের অভিযানের সময় সটকে পরার বিষয়ে তিনি জানান, অফিসের কাজে ওইদিন ঢাকায় ছিলেন। তবে বরিশাল জেলা রেজিস্ট্রার অফিস সূত্রে জানা যায়, দুদকের অভিযানের সময় তিনি অফিসেই ছিলেন। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো. খাইরুল আলম সুমন বলেন, ঘুস ও দুর্নীতির বিষয়ে যদি কেউ সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শাওন খান/এমএন/এএসএম