অনেক সম্পদের মালিক হতে হলে, নিজেকে তৈরি কর

মানুষ সাধারণত সম্পদ বলতে যা বোঝে, তা হলো অর্থ, জমি, বাড়ি, গাড়ি বা দৃশ্যমান কোনো প্রাচুর্য। কিন্তু ইতিহাস এবং বাস্তবতা বারবার প্রমাণ করেছে—সম্পদের আসল উৎস বাইরের কিছু নয়, বরং ভেতরের প্রস্তুতি। জিম রন একবার বলেছিলেন, “Don’t wish it were easier, wish you were better.” এই কথার মধ্যে এমন একটি সত্য লুকিয়ে আছে যা অনেকেই উপলব্ধি করতে পারে না। অধিক সম্পদের অধিকারী হতে হলে আগে নিজেকে সেই সম্পদের উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হয়। বিশ্বব্যাপী সম্পদ নিয়ে কাজ করা সংস্থা Credit Suisse-এর একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বের শীর্ষ ১% মানুষের হাতে মোট সম্পদের প্রায় ৪৫% রয়েছে। কিন্তু এই সম্পদের বড় অংশ উত্তরাধিকারসূত্রে নয়, বরং স্ব-নির্মিত ব্যক্তিদের হাতেই তৈরি হয়েছে। গবেষণা সংস্থা Wealth-X জানিয়েছে, বিশ্বের অতিধনী ব্যক্তিদের প্রায় ৬৮% নিজ প্রচেষ্টায় সম্পদ অর্জন করেছেন। অর্থাৎ সম্পদের মূল রহস্য জন্ম বা ভাগ্যে নয়—নিজেকে তৈরি করার ক্ষমতায়। ওয়ারেন বাফেট বলেছেন, “The best investment you can make is in yourself.” অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ বলছে, যেসব ব্যক্তি নিয়মিত নিজেদের দক্ষতা, জ্ঞান ও মানসিক সক্ষমতা উন্নত করেন, তাদের আয়ের সম্ভাবনা দীর্ঘমেয়াদে গড় মানুষের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হয়। হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ক্রমাগত শেখার মানসিকতা ধরে রাখেন, তাদের ক্যারিয়ার বৃদ্ধির হার প্রায় ৩০% বেশি। শেষ পর্যন্ত, সম্পদের মালিক হওয়া মানে শুধু অর্থের মালিক হওয়া নয়, এটি নিজেকে এমন একজন মানুষে পরিণত করা, যে মূল্য তৈরি করতে পারে। আপনি যদি নিজেকে প্রস্তুত করেন—চিন্তায়, জ্ঞানে, চরিত্রে—তাহলে সম্পদ আপনার কাছে আসবে। কিন্তু আপনি যদি নিজেকে প্রস্তুত না করেন, তাহলে সম্পদ এলেও তা স্থায়ী হবে না। আমরা প্রায়ই সম্পদের পেছনে ছুটি, কিন্তু নিজেকে প্রস্তুত করার দিকে মন দিই না। অথচ বাস্তবতা হলো, সম্পদ একটি ফল, কারণ নয়। আপনি যদি মানসিকভাবে, বৌদ্ধিকভাবে এবং আচরণগতভাবে প্রস্তুত না হন, তাহলে হঠাৎ অর্জিত সম্পদও টিকে থাকে না। National Endowment for Financial Education-এর একটি রিপোর্টে দেখা গেছে, লটারিতে বড় অঙ্কের অর্থ জেতা ব্যক্তিদের প্রায় ৭০% কয়েক বছরের মধ্যে আবার আর্থিক সংকটে পড়ে। কারণ তারা সম্পদ পেয়েছিল, কিন্তু সেই সম্পদ পরিচালনার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করেনি।স্টিভ জবস একবার বলেছিলেন, “Your work is going to fill a large part of your life… the only way to be truly satisfied is to do what you believe is great work.” এই ‘great work’ তৈরি হয় না বাইরের সুযোগ দিয়ে, এটি তৈরি হয় ভেতরের সক্ষমতা দিয়ে। আপনি যত বেশি দক্ষ, যত বেশি সচেতন, যত বেশি মানসিকভাবে স্থিতিশীল—আপনার তৈরি করার ক্ষমতা তত বেশি। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হবে মানবিক দক্ষতা—সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা। এই দক্ষতাগুলো কেনা যায় না, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যায় না, এগুলো গড়ে তুলতে হয়। এই কারণেই মনোবিজ্ঞানী ক্যারল ডুয়েকের “growth mindset” ধারণা এত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন, যারা বিশ্বাস করেন যে তারা নিজেদের উন্নত করতে পারে, তারা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক ও পেশাগতভাবে বেশি সফল হয়। থমাস এডিসন বলেছিলেন, “Opportunity is missed by most people because it is dressed in overalls and looks like work.” সুযোগ সবার সামনে আসে, কিন্তু প্রস্তুত মানুষই সেটিকে সম্পদে রূপান্তর করতে পারে। অপর প্রস্তুত ব্যক্তি সেই একই সুযোগ হারিয়ে ফেলে।McKinsey-এর একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, যে সব ব্যক্তি নিয়মিত নিজেদের দক্ষতা আপডেট করেন, তাদের কর্মজীবনের স্থায়িত্ব ও আয়ের স্থিতিশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। অর্থাৎ সম্পদ কেবল অর্জনের বিষয় নয়, এটি ধরে রাখারও বিষয়। আর ধরে রাখার জন্য প্রয়োজন মানসিক শক্তি, শৃঙ্খলা এবং দূরদৃষ্টি। বুদ্ধ বলেছেন, “What we think, we become.” আপনার চিন্তার ধরনই আপনার সিদ্ধান্তকে তৈরি করে, আর সিদ্ধান্ত আপনার ভবিষ্যৎ তৈরি করে। আপনি যদি স্বল্পমেয়াদী আনন্দের দিকে ঝুঁকে থাকেন, তাহলে সম্পদ ক্ষণস্থায়ী হবে। আপনি যদি দীর্ঘমেয়াদী মূল্য তৈরির দিকে মনোযোগ দেন, তাহলে সম্পদ স্থায়ী হবে। স্ট্যানফোর্ডের গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বিলম্বিত সন্তুষ্টির ক্ষমতা (delayed gratification) রাখে, তারা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেশি সফল হয়। অর্থাৎ যারা আজকের ছোট আনন্দ ত্যাগ করে ভবিষ্যতের বড় ফলের জন্য অপেক্ষা করতে পারে, তাদের সম্পদ গড়ার সম্ভাবনা বেশি।নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, “Education is the most powerful weapon which you can use to change the world.” শিক্ষা শুধু ডিগ্রির বিষয় নয়, এটি নিজেকে ক্রমাগত উন্নত করার প্রক্রিয়া। আপনি যত বেশি শিখবেন, তত বেশি মূল্য তৈরি করতে পারবেন। আর মূল্য তৈরি করতে পারলে সম্পদ স্বাভাবিকভাবেই আপনার দিকে আসবে। অর্থনীতিবিদ পিটার ড্রাকার বলেছিলেন, “The best way to predict the future is to create it.” নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে হলে প্রথমে নিজেকে তৈরি করতে হয়। কারণ সম্পদ কখনও শূন্যে জন্মায় না, এটি মানুষের চিন্তা, দক্ষতা এবং অধ্যবসায়ের ফল। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, আত্ম-উন্নয়নে বিনিয়োগ করা ব্যক্তিদের জীবন সন্তুষ্টি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদে বেশি থাকে। কারণ তারা বাইরের পরিস্থিতির উপর নির্ভর না করে নিজেদের সক্ষমতার উপর নির্ভর করে। শেষ পর্যন্ত, সম্পদের মালিক হওয়া মানে শুধু অর্থের মালিক হওয়া নয়, এটি নিজেকে এমন একজন মানুষে পরিণত করা, যে মূল্য তৈরি করতে পারে। আপনি যদি নিজেকে প্রস্তুত করেন—চিন্তায়, জ্ঞানে, চরিত্রে—তাহলে সম্পদ আপনার কাছে আসবে। কিন্তু আপনি যদি নিজেকে প্রস্তুত না করেন, তাহলে সম্পদ এলেও তা স্থায়ী হবে না। এই কারণেই সত্যটি সরল কিন্তু গভীর, অনেক সম্পদের মালিক হতে হলে, প্রথমে নিজেকে তৈরি করতে হয়। লেখক: দ্য আর্ট অফ পার্সোনাল ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট, দ্য আর্ট অফ কর্পোরেট ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট, দ্য সাকসেস ব্লু প্রিন্ট, আমি কি এক কাপ কফিও খাব না ইত্যাদি বইয়ের লেখক, ফাইন্যান্স এন্ড বিজনেস মেন্টর। এইচআর/এএসএম