মৃত্যুর আগে শেষ পোস্টে যা লিখেছেন অভিনেতা আলভীর স্ত্রী

ছোটপর্দার অভিনেতা জাহের আলভীর স্ত্রী ইকরা আত্মহত্যা করেছেন। দেশের বেসরকারি একটি গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে অভিনেতার শ্বশুরবাড়ির পরিবার। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুর দেড়টার দিকে মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার একটি বাসায় এ ঘটনা ঘটে।জানা গেছে, অভিনেতা বর্তমানে নেপালে আছেন। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘কথা বলার মতো অবস্থায় তিনি এখন নেই।’এদিকে আত্মহত্যার আগে নিজের ফেসবুকে এক দীর্ঘ পোস্ট করেন ইকরা। সেখানে তিনি লেখেন- আমার বোনের মাতৃত্বযাত্রার এক তিক্ত অভিজ্ঞতা।হুবহু পোস্টটি তুলে ধরা হলো-অক্টোবর ২০২৪,শুনুন তার মুখ থেকেই২০২৪ সালের ১৩ই অক্টোবর—দিনটি আমার জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করে। সেদিন ৩২ সপ্তাহে হঠাৎ আমার ওয়াটার ব্রেক হয়। দ্রুত আমি লালমাটিয়ায় অবস্থিত মাদার কেয়ার হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হই, যেখানে পুরো প্রেগন্যান্সি জুড়ে আমি ডা. সেলিনা খানের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিয়ে আসছিলাম।হাসপাতালে পৌঁছানোর পর তারা আমাকে পরীক্ষা করে দ্রুত ভর্তি করে নেয়। কিন্তু তখন জানতে পারি, ডা. সেলিনা খান জরুরি একটি অপারেশনের কারণে দুই থেকে তিন দিনের ছুটিতে আছেন। পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে আমাকে জানানো হয় যে ওয়াটার ব্রেক হওয়ায় একটি আল্ট্রাসাউন্ড করা জরুরি।কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো—সেই সময় হাসপাতালে কোনো আল্ট্রাসাউন্ড টেকনিশিয়ান উপস্থিত ছিলেন না। যিনি আল্ট্রাসাউন্ড করেন, তাকে ফোন করে ডাকা হয়।অনেক অনুরোধের পর তিনি হাসপাতালে আসার আগে আমার কাছ থেকে আগাম যাতায়াত ভাড়া দাবি করেন। একজন ভর্তি রোগী হিসেবে এই পরিস্থিতি আমার জন্য ছিল অত্যন্ত বিব্রতকর ও মানসিকভাবে কষ্টদায়ক। তবুও জরুরিতার কথা ভেবে অনুরোধ করে তাকে আসতে রাজি করাই।পরে আল্ট্রাসাউন্ড করে জানানো হয় যে ভেতরের পানি তখনও অক্ষত রয়েছে। আরও পড়ুন: অভিনেতা জাহের আলভীর স্ত্রীর মৃত্যু এরপর আমাকে দোতলায় একটি বেডে শুইয়ে রাখা হয়। স্যালাইন চলতে থাকে, এবং বলা হয় যতটা সম্ভব নড়াচড়া না করতে। ক্যাথেটার পরানো অবস্থায় আমি সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী হয়ে পড়ি।১৪ ও ১৫ অক্টোবর—এই দুই দিন কোনো পুনরায় আল্ট্রাসাউন্ড বা স্পষ্ট মেডিকেল আপডেট আমাকে দেওয়া হয়নি। আমার শারীরিক অবস্থা কী, আমাকে বাড়ি যেতে দেওয়া হবে কি না, নাকি ডেলিভারির প্রস্তুতি নিতে হবে—এসব বিষয়ে কোনো পরিষ্কার তথ্য পাইনি। অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্যে দিন দুটি কেটেছে।১৬ই অক্টোবর যা ঘটলো, তা ছিল আমার কল্পনার বাইরে। আমাকে দোতলা থেকে তিনজন স্টাফ কাঁধে ভর দিয়ে হুইলচেয়ারে করে নিচে নামান। এমনভাবে একজন সম্ভাব্য সিজারিয়ান রোগীকে স্থানান্তর করা অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও অস্বস্তিকর মনে হয়েছে আমার কাছে।পরে আল্ট্রাসাউন্ড করে জানানো হয়—আমার শরীরে আর কোনো অ্যামনিয়োটিক ফ্লুইড নেই; জরুরি ভিত্তিতে সিজারিয়ান অপারেশন করতে হবে। সেই সময় ডা. সেলিনা খান উপস্থিত ছিলেন।আমরা জানতে চাই—হাসপাতালে কি এনআইসিইউ সুবিধা আছে? যদি নবজাতকের বিশেষ যত্ন প্রয়োজন হয় তবে কী হবে? উত্তরে বলা হয়, এখানে এনআইসিইউ নেই; প্রয়োজনে পাশের হাসপাতালে নেওয়া হবে।একজন মা হিসেবে আমার উদ্বেগ ছিল স্বাভাবিক—মা ও শিশু আলাদা হাসপাতালে থাকলে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তখন আমাদের জানানো হয়, চাইলে আমরা অন্য হাসপাতালে চলে যেতে পারি।কিন্তু প্রশ্ন হলো—যদি এমন গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা এখানে না থাকে, তবে আমাকে আগেই কেন জানানো হয়নি? কেন দুই দিন ধরে আমাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখা হলো? কেন একটি মা ও শিশু হাসপাতালে আল্ট্রাসাউন্ড সার্ভিস নিয়মিতভাবে উপস্থিত থাকবে না?আরও উদ্বেগজনক বিষয় ছিল—এর আগে যখন এনআইসিইউ সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম, তখন আমাকে বলা হয়েছিল, “কিছু হবে না, এনআইসিইউ লাগবে না।” চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় এমন আশ্বাস কি যথেষ্ট?ডা. সেলিনা খান নিঃসন্দেহে একজন দক্ষ ও সুনামধন্য চিকিৎসক। তবে তিনি যখন উপস্থিত ছিলেন না, তখন হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ছিল রোগীর যথাযথ পর্যবেক্ষণ, স্বচ্ছ তথ্য প্রদান ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিশ্চিত করা। সেই জায়গায় আমি অবহেলা ও সমন্বয়ের অভাব অনুভব করেছি।এই দুই দিন যদি আমার বা আমার সন্তানের কোনো বড় ক্ষতি হতো—তাহলে দায়ভার কে নিত?এই পরিস্থিতির মধ্যে অবশেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় আমাকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করার।সকালবেলা জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের মাধ্যমে আমাকে দ্রুত গ্রিন লাইফ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ডা. সারোয়াত জাহান জুবায়রা ম্যাম এর তত্ত্বাবধানে আমাকে অত্যন্ত মানবিক ও পেশাদারভাবে গ্রহণ করা হয়। আরও পড়ুন: 'দয়া করে একটু মানবিক হই' প্রয়োজনীয় সব তথ্য নিয়ে দ্রুত ফর্ম পূরণ করে আমাকে ভর্তি করা হয়। মাত্র পাঁচ থেকে দশ মিনিটের মধ্যেই ওটি প্রস্তুত ছিল। ডা. জুবায়রা ম্যাম জরুরি সিজারিয়ান ডেলিভারির মাধ্যমে আমাকে একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তানের মা হওয়ার সৌভাগ্য দেন আলহামদুলিল্লাহ।সেই মুহূর্তের দ্রুত সিদ্ধান্ত, দক্ষতা এবং মানবিক আচরণ আমার এবং আমার সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। আমি বিশ্বাস করি, তিনি যদি সেই সময় জরুরি সহায়তা না দিতেন, তাহলে হয়তো পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত।আমি ডা. জুবায়রা ম্যাম এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তার পেশাদারিত্ব, দ্রুততা এবং মানবিকতা আমার জীবনের এক সংকটময় মুহূর্তকে আশীর্বাদে পরিণত করেছে।আমি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে বিনীত অনুরোধ জানাই—রোগী ব্যবস্থাপনা, জরুরি সেবা, তথ্য প্রদান এবং অবকাঠামোগত প্রস্তুতির বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল ও স্বচ্ছ হোন।একজন মা যখন প্রসবের জন্য হাসপাতালে যান, তখন তিনি শুধু চিকিৎসা নয়—নিরাপত্তা, নিশ্চয়তা ও মানবিক আচরণ প্রত্যাশা করেন।আমার এই অভিজ্ঞতা শেয়ার করার উদ্দেশ্য কাউকে ছোট করা নয়; বরং ভবিষ্যতে যেন আর কোনো মা এমন অনিশ্চয়তা ও মানসিক কষ্টের মধ্যে না পড়েন—সেই সচেতনতা তৈরি করা।