আদর্শ সন্তান না কি অতি-নির্ভরতা? মিলিয়ে নিন মামা’জ বয়-এর ১০ লক্ষণ

মায়ের সঙ্গে সন্তানের আবেগীয় ঘনিষ্ঠতা সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি। এটি সন্তানের শক্তির জায়গা। কিন্তু সেই সম্পর্ক যদি প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে ব্যক্তিত্ব, সিদ্ধান্ত ও দাম্পত্য সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তখন সেটি হয়ে উঠতে পারে অতি-নির্ভরতা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মামা’জ বয় শব্দটি এখন বেশ জনপ্রিয়। বিশেষ করে অনেক স্ত্রী অভিযোগ করেন যে, তার সঙ্গী একজন মামা’জ বয় বলে তাদের সম্পর্কে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তার মানে কি – একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের সঙ্গে তার মায়ের আবেগীয় ঘনিষ্ঠতা খারাপ বিষয়? বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। বরং মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ভালোবাসা ও নির্ভরতার মাঝে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। সেটি বোঝাই আসল বিষয়। নিজের সঙ্গে মিলিয়ে নিন একজন মামা’জ বয়ের ১০টি সাধারণ লক্ষণ – ১. সব সিদ্ধান্তে মায়ের চূড়ান্ত মত সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাবা-মায়ের পরামর্শ নেওয়া স্বাভাবিক একটি বিষয়। কখনও কখনও তাদের অভিজ্ঞতা থেকে দেওয়া পরামর্শ সন্তানকে অনেক বিপদ থেকেও বাঁচিয়ে দিতে পারে। কিন্তু যদি সম্পর্কের মতো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তেও নিজস্ব মত গড়ে না উঠে এবং সবকিছুতেই মায়ের অনুমোদন অপরিহার্য হয়ে পড়ে, তাহলে তা আত্মনির্ভরতার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে যদি একজন বিবাহিত পুরুষ জীবনের ব্যক্তিগত বিষয়ে সঙ্গীর কথার গুরুত্ব না দিয়ে মায়ের সিদ্ধান্তে দুজনের জীবন চালাতে চয়, তখন পরিস্থিতি খুব জটিল হয়ে পড়ে। ২. ব্যক্তিগত সীমারেখা নেই আমেরিকান সাইকোলজিকাল অ্যাসোসিয়েশন বলছে, সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক সম্পর্কে স্পষ্ট সীমারেখা থাকা জরুরি। মা-ছেলের সম্পর্ক যদি এতটাই জড়িয়ে থাকে যে নতুন সঙ্গী বা পরিবারের জন্য আলাদা জায়গা না থাকে, তখন সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট হয়। ৩. সঙ্গীর সঙ্গে তুলনা করা ‘মা এভাবে করতেন না’ বা ‘মায়ের মতো হলো না’ - এসব মন্তব্য সঙ্গীর আত্মসম্মানে আঘাত করে। এতে সঙ্গী নিজেকে শাশুড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আবিষ্কার করে, যা দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্কে দূরত্ব বাড়ায়। ৪. দ্বন্দ্বে অন্ধভাবে পক্ষ নেওয়া কোনো পারিবারিক ঝামেলায় নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ না করে সবসময় মায়ের পক্ষ নেওয়ার অর্থ হলো সন্তান নিজের বিচার-বিবেচনা দিয়ে ভাবতেই শখেনি। এতে সঙ্গী নিজেকে একা অনুভব করতে পারেন। ৫. দীর্ঘায়িত আর্থিক নির্ভরতা প্রাপ্তবয়স্ক হয়েও যদি নিজের আয়-ব্যয়ের দায়িত্ব নিতে অনীহা থাকে এবং মায়ের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা চলতেই থাকে, তবে তা স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা তৈরি করে। ৬. আবেগগত স্বাতন্ত্র্যের ঘাটতি মায়ো ক্লিনিক বলছে, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনভাবে সম্পর্ক গড়া মানসিক পরিপক্বতার অংশ। যদি সব আবেগগত সান্ত্বনা শুধু মায়ের কাছেই খোঁজা হয়, তবে সঙ্গীর সঙ্গে গভীর সংযোগ তৈরি হওয়া কঠিন। ৭. অতিরিক্ত ঘন ঘন যোগাযোগ প্রতিদিনের ছোটখাটো বিষয়েও ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা - যেমন কী খাওয়া হবে বা কোথায় যাওয়া হবে। এগুলো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা ছোট করে দেয়। ৮. সমালোচনা সহ্য করতে না পারা মায়ের সম্পর্কে সামান্য সমালোচনাতেও তীব্র রাগ বা প্রতিরক্ষামূলক আচরণ দেখানো বোঝায় যে সম্পর্কটি আবেগগতভাবে অতিসংবেদনশীল ও অনিরাপদ। কেননা, মা-ও একজন মানুষ; তার দোষ-গুণ সবই থাকবে। এটাই স্বাভাবিক। ৯. দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া ভুল করলে দায় স্বীকার না করে পরিবার বা পরিস্থিতিকে দায়ী করা ম্যাচুরিটি ঘাটতির লক্ষণ। এতে আত্মউন্নয়নের সুযোগ কমে যায়। বিশেষ করে ছোটেবেলা থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি খারাপ বিষয়ে মা-কে দোষারোপ করা এক একটি লক্ষণ। ১০. দ্বৈত অপরাধবোধ মায়ের সঙ্গে সময় কাটালে সঙ্গীর কাছে অপরাধবোধ, আবার সঙ্গীর সঙ্গে থাকলে মায়ের কাছে অপরাধবোধ - এই টানাপোড়েন দেখায় যে স্পষ্ট সীমারেখা তৈরি হয়নি। মায়ের প্রতি ভালোবাসা অমূল্য। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে নতুন সম্পর্ক, দায়িত্ব ও সিদ্ধান্তের জায়গা তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রশ্নটা দোষারোপের নয়, বরং সচেতনতার। সূত্র: আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, মায়ো ক্লিনিক, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি ফ্যামিলি রিসার্চ, সাইকোলজি টুডে, হেলথলাইন এএমপি/এমএস