ঊর্ধ্বমুখী সড়ক দুর্ঘটনার হার, কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় বাড়ছে প্রাণহানি

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা যেন এক নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাণ ঝরছে অসংখ্য মানুষের। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে ৫৫৯ টি দুর্ঘটনায় সড়কে প্রাণ হারিয়েছে ৪৮৭ জন, আহত ১ হাজার ১৯৪ জন। দুর্ঘটনার কারণসমূহ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন,গাড়ির উচ্চগতি, ওভারটেকিং, চালকের অদক্ষতা, ট্রাফিক আইন অমান্য, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতিকে দায়ী করা হচ্ছে।গত কয়েক বছরে সড়ক দুর্ঘটনা ও দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকহারে বেড়েছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন এর বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে পাওয়া যায়, ২০২৫ এ সড়ক দুর্ঘটনা ২০২৪ এর তুলনায় প্রায় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে উন্নত বিশ্বের দেশগুলিতে যখন সড়ক দুর্ঘটনার হার নিম্নমুখী সেখানে বাংলাদেশে প্রতি বছর বাড়ছে কেন?চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. স্বপন কুমার পালিত এর অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করছেন জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সড়কের নকশাগত ত্রুটি এবং কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনাকে।ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিং এ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক পালিত বলেন, 'অধিক জনসংখ্যার কারণে যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে। এর মধ্যে নিম্নক্ষমতা ও স্বল্পগতির যানবাহনের সংখ্যাই বেশি। ফলে একই সড়কে সাইকেল, রিকশা ও বাস একসঙ্গে চলাচল করছে। এতে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা অনেক বৃদ্ধি পায়। আবার সড়কের পাশে ফুটপাথগুলো অবৈধভাবে দখল করে বাজার স্থাপন হয়েছে, এতে পথচারীদের চলাচলের পর্যাপ্ত জায়গা থাকে না। ফলে পথচারীদের অনেকেই দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে।'সড়ক নির্মাণে তদারকির অভাবে নকশাগত ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। তিনি বলেন, 'সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রথমে  সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হয়। জ্যামিতিক ডিজাইন, পেভমেন্ট ডিজাইন, স্লোপ ডিজাইন, ম্যাটেরিয়াল মিক্স ডিজাইন, ড্রেনেজ ডিজাইন এবং ক্রস-ড্রেনেজ ডিজাইন করতে হয়। একটি প্রতিষ্ঠান এসকল নকশা করার পর তা অন্য বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান দিয়ে যাচাই করাতে হয়। নকশায় ত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের পর নির্মাণকাজে যাওয়া দরকার। নির্মাণকাজ অবশ্যই অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী হতে হবে। নির্মাণের সময় উপকরণের ল্যাবরেটরি টেস্ট ও ফিল্ড টেস্ট করতে হবে। মাঠপর্যায়ে এসবের সার্বক্ষণিক তদারকি থাকা জরুরি। কিন্তু কোনো ইঞ্জিনিয়ার বা কনসালটেন্টকে এসব বিষয় তদারকি করতে দেখা যায়না। সড়ক নির্মাণের পর অডিট করতে হয় নকশা অনুযায়ী কাজ হয়েছে কি না তা যাচাই করার জন্য। তবে বাংলাদেশে এসব বিষয় যথাযথভাবে অডিট হয় না। ফলে নকশায় ত্রুটি থেকে যায়।'আরও পড়ুন: সড়ক দুর্ঘটনায় বাবার পর প্রাণ হারালেন ছেলেওসড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের নানা অব্যবস্থাপনাও দায়ী বলে মনে করেন তিনি, 'যাত্রী ওঠা নামার জন্য নির্দিষ্ট বাস স্টপেজ ও আলাদা বে নির্মাণ করতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে যেখানে সেখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করতে দেখা যায়, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়াও আমাদের দেশে সড়কগুলোতে সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্দেশিত থাকলেও সর্বনিম্ন গতিসীমার কোনো নির্দেশনা দেওয়া থাকেনা। উন্নত দেশগুলোতে সর্বোচ্চ গতির পাশাপাশি সর্বনিম্ন গতিসীমাও নির্দিষ্ট থাকে। সেখানে স্বল্পগতির যানবাহনের সংখ্যাও তুলনামূলক কম। তাই দুর্ঘটনাও কম ঘটে থাকে।'আরও পড়ুন: রাজশাহীতে সড়ক দুর্ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীসহ নিহত ৩, মহাসড়ক অবরোধট্রাফিক আইন না মানার সংস্কৃতি দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ। অধ্যাপক পালিত বলেন, 'আমাদের দেশে প্রায় ইন্টারসেকশনের আশেপাশে অবৈধ পার্কিং দেখা যায়, গাড়ি থেকে যাত্রী ওঠানামা করে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী ইন্টারসেকশনের ৩০০ ফুটের মধ্যে কোনো গাড়ি দাঁড়ানোর নিয়ম নেই। ড্রাইভার ও পথচারীদের বেশিরভাগই ট্রাফিক আইন মেনে চলেন না। উন্নত দেশগুলোতে রোড ইউজাররা আইন মেনে চলেন, সেখানে আইন ভঙ্গ করলে জবাবদিহি করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সড়ক আইন এর প্রয়োগও তেমন একটা দেখা যায়না।' বিগত পাঁচ বছরে সড়কে দৈনন্দিন দুর্ঘটনা, প্রাণহানি ও আহতের তুলনামূলক চিত্র ২০২১ থেকে ২০২৫ পাঁচ বছরে সড়কে দুর্ঘটনা বেড়েছে প্রায় দেড়গুণবিগত পাঁচ বছরের সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান বলছে ২০২১ থেকে ২০২৫ এ দুর্ঘটনা বেড়েছে প্রায় দেড়গুণ।  ২০২১ সালে যেখানে মোট দুর্ঘটনা ছিল ৫ হাজার ৩৭১টি, সেখানে ২০২২ সালে তা ২৭ দশমিক ১৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৮২৯টিতে। পরের বছর বৃদ্ধির হার কমে এলেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকে। ২০২৩ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা হয় ৬ হাজার ৯১১টি, যা আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। ২০২৩ এর তুলনায় ২০২৪ সালে শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ বেশি দুর্ঘটনা ঘটে, সে বছর মোট দুর্ঘটনা ঘটে ৬ হাজার ৯২৭টি । গেল বছর সড়কে স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। ২০২৪ এর তুলনায় প্রায় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে ২০২৫ সালে। মোট দুর্ঘটনা ছিল ৭৫৮৪টি। সমগ্র চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিগত পাঁচ বছরে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৩৮ শতাংশ।মূলত মহাসড়কগুলোতে স্বল্প গতির যানবাহন চলাচলের সংখ্যা অতিমাত্রায় বেড়ে যাওয়া, মিশ্র ট্রাফিক ব্যবস্থা এবং ট্রাফিক আইনের কার্যকর প্রয়োগের ঘাটতিই দুর্ঘটনা বৃদ্ধির প্রধান কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।