আপাতত আগামী দুই বছর বিদ্যুতের দাম বাড়াতে চায় না সরকার। তবে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিপুল অঙ্কের দেনার চাপ। যদিও সিস্টেম লস কমিয়ে ঘাটতি সামলানোর পরিকল্পনা করছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। পাশাপাশি ক্যাপাসিটি চার্জের চাপ কমাতে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে সমঝোতার কথা ভাবা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্নীতি-লুণ্ঠনমূলক ব্যয় রোধ, সাশ্রয়ী জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ কমানো সম্ভব।দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়লেও গ্রাহকের ওপর চাপ হয়ে দাঁড়ায় ক্রমাগত দামবৃদ্ধি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরের শাসনামলে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে অন্তত ১৪ বার। তবুও থেমে নেই এ খাতে ভর্তুকি আর দেনার চাপ। ফলে বিদ্যুৎ খাতে লোকসান ছাড়িয়েছে বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকা, যা মেটাতে সরকারকে দিতে হচ্ছে বড় অঙ্কের ভর্তুকি। বিপরীতে এই ভর্তুকি কমাতে চাপ আছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পক্ষ থেকে। নানামুখী এমন সব চ্যালেঞ্জ মধ্যেও আগামী দুই বছর গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর পক্ষে নতুন সরকার। সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বিদ্যুতের দাম অপরিবর্তিত রাখতে কর্মকৌশল সাজানোর নির্দেশনা দেন জ্বালানিমন্ত্রী। সেক্ষেত্রে সিস্টেম লস বা পদ্ধতিগত লোকসান কমাতে জোর দেয়া হয় বৈঠকে। আরও পড়ুন: বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়েই জনগণকে লাভবান করার চেষ্টা করছি: জ্বালানিমন্ত্রী তবে কেবল সিস্টেম লস কমিয়ে ঘাটতি কতটা পূরণ করা যাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, সিস্টেম লস কমিয়ে হয়ত ৫ হাজার কোটি টাকা কমানো যেতে পারে। কিন্তু এ বছর হয়ত ৫৫ হাজার কোটি টাকা যাবে। তাহলে ৫ হাজার কোটি টাকা কমালেও ৫০ হাজার কোটি টাকা রয়ে যাচ্ছে। ৫০ হাজার কোটি টাকার চাপ অর্থনীতির জন্য সাংঘাতিক। সেক্ষেত্রে দুর্নীতি, লুণ্ঠনমূলক অযৌক্তিক ব্যয় রোধের ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তুলনামূলক সাশ্রয়ী জ্বালানি গ্যাস-কয়লা ব্যবহারে অগ্রাধিকার দেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, যারা বেশি বেশি পয়সা নিয়ে যাচ্ছে, নানাভাবে চুক্তি করেছে, নানা কৌশল নিচ্ছে। এসব কৌশলের ওপর ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া তরল জ্বালানি যে ৭ থেকে ৮ হাজার মেগাওয়াট আছে, সেগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। এতে বছরে ২০ থেকে ২২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা আছে ৭ হাজার মেগাওয়াটের ওপরে। কিন্তু এর উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার হচ্ছে মাত্র ৪৫ শতাংশ, যেটা ৯০ শতাংশ ব্যবহার হওয়ার কথা। আরও পড়ুন: আদানির চুক্তি ইস্যুতে নড়েচড়ে বসেছে সরকার, খতিয়ে দেখা হচ্ছে অসঙ্গতি বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় বাড়ার আরেক বড় কারণ বিপুল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ, যা গত বছর ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। আর সেই চাপ কমাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কোনো সমঝোতায় যাওয়া যায় কিনা, সেটিও বিবেচনা করছেন জ্বালানিমন্ত্রী। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমাতে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে শক্তিশালী করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।