প্রেম ও বিয়ের প্রলোভন, রিহ্যাব থেকে ছাড়ানোর নামে অর্থ সংগ্রহ, মামলায় আপোষের আশ্বাস, আর আপত্তিকর ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি। এমন একাধিক অভিযোগে সংগীতশিল্পী মাইনুল আহসান নোবেলের বিরুদ্ধে। গত ২০২৫ সালের ১৩ আগস্ট নোবেলসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন এক ভুক্তভোগী নারী। মামলায় নোবেলের মা নাজমা হোসেন, স্ত্রী ইসরাত জাহান প্রিয়া, পরিচিত মাসুদ রানা ও সহকারী মুনেম শাহ সৌমিককেও আসামি করা হয়। মামলাটিতে বর্তমানে আপোসের শর্তে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি জামিন পেয়েছেন সংগীতশিল্পী নোবেল। তবে জামিন পাওয়ার পর, ভুক্তভোগী আবার শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।সম্প্রতি এক মামলায় গ্রেফতার হয়ে জামিনে ছাড়া পান নোবেল সম্প্রতি ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। রাজধানীর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ২৮ নম্বর আদালতের নির্দেশে পরিচালিত এই তদন্তে আর্থিক লেনদেনের কিছু প্রমাণ মিললেও শারীরিক নির্যাতন ও পর্নোগ্রাফি সংক্রান্ত অভিযোগে পর্যাপ্ত আলামত পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলাটি দণ্ডবিধির ৪০৬ (বিশ্বাসভঙ্গ), ৪১৭ ও ৪২০ (প্রতারণা), ৫০৬ (হুমকি), ৩৮৩ (চাঁদাবাজি), ১০৯ (সহায়তা) ধারাসহ পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২–এর ৮(১)/৮(২) ধারায় দায়ের করা হয়। তদন্ত শেষে গত ৭ জানুয়ারি উপ-পরিদর্শক (নিরস্ত্র) নুরুজ্জামান অভিযুক্ত পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। পরে ২ ফেব্রুয়ারি আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। পরিচয় থেকে প্রেম, এরপর অর্থ লেনদেনমামলার বাদী আনাননিয়া শবনম রোজ অনন্যা (১৯)। অভিযোগে তিনি বলেন, ২০২৩ সালের আগস্টে ছোট ভাইকে গান শেখাতে নিয়ে যাওয়ার সূত্রে নোবেলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। নিয়মিত যোগাযোগ থেকে সম্পর্ক প্রেমে রূপ নেয়। সম্পর্ক গভীর হওয়ার পর বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ দাবি করা শুরু হয় বলে বাদীর দাবি। ভালোবাসার সম্পর্কে আস্থার জায়গা থেকে তিনি নগদ ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে একাধিকবার অর্থ প্রদান করেন। তদন্তে পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৫ অক্টোবর পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট বিকাশ নম্বরে মোট ৬০ হাজার ৫৪০ টাকা প্রেরণের তথ্য মিলেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক এজেন্টের কেওয়াইসি (KYC) ফরম সংগ্রহ করে পিবিআই নিশ্চিত হয়েছে, বাদী তার বাসার নিকটবর্তী এজেন্টদের মাধ্যমে অর্থ পাঠান। নোবেলের ব্যবহৃত একটি বিকাশ নম্বরের হিসাব বিবরণীও সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা হয়েছে। রিহ্যাব পর্ব ও সহকারীর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহপ্রতিবেদনে বলা হয়, একপর্যায়ে নোবেল মাদকাসক্তির কারণে রিহ্যাবে ভর্তি হন। ২০২৩ সালের ২৭ নভেম্বর তার সহকারী হিসেবে পরিচিত মুনেম শাহ সৌমিক বাদীর সঙ্গে যোগাযোগ করে রিহ্যাব থেকে ছাড়ানোর জন্য অর্থের প্রয়োজনীয়তার কথা জানান। বাদীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২৯ নভেম্বর তিনি ৭০ হাজার টাকা এবং ৬ ডিসেম্বর আরও ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা দেন। পরবর্তী সময়ে নগদ ও মোবাইল লেনদেন মিলিয়ে সহকারী সৌমিক মোট ৪ লাখ ৫৮ হাজার টাকা গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ। এ অর্থ গ্রহণের বিষয়ে অডিও রেকর্ডসহ একটি পেনড্রাইভ পিবিআই জব্দ করেছে। তবে অর্থ ফেরত চাইলে ২০২৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারির পর থেকে সৌমিক যোগাযোগ বন্ধ করে দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। পরে নোবেল রিহ্যাব থেকে বের হলে বিষয়টি তাকে জানালে তিনি নিজে দেখবেন বলে আশ্বাস দেন। এমন কথোপকথনের রেকর্ডও তদন্তকারীদের কাছে উপস্থাপিত হয়েছে। এনগেজমেন্ট, পারিবারিক যোগাযোগ ও অভিযোগিত নির্যাতনবাদীর দাবি, ২০২৪ সালের ১০ মার্চ নোবেলের সঙ্গে তার এনগেজমেন্ট সম্পন্ন হয়। এ উপলক্ষে নোবেলের মা নাজমা হোসেনের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। এনগেজমেন্টের পর দুই পরিবারের মধ্যে যাতায়াত বাড়ে। অসুস্থ শ্বশুরকে হাসপাতালে দেখতে যাওয়া এবং স্বজনদের কাছে তাকে ‘হবু স্ত্রী’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। তবে ২০২৪ সালের ১৯ জুন ডেমরার বাসায় ডেকে নিয়ে বিয়ের কথা বলে পরে শারীরিক সম্পর্কের চেষ্টা, বাধা দিলে মারধর, মোবাইল ভাঙচুর, আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ এবং সেগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকির অভিযোগ তোলেন বাদী। তদন্তে এ সংক্রান্ত কোনো ভিডিও বা নগ্ন ছবির আলামত পাওয়া যায়নি বলে পিবিআই প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। বাদীকে প্রমাণ উপস্থাপনের অনুরোধ করা হলেও তিনি কোনো ডিজিটাল আলামত দিতে পারেননি। অভিযুক্তদেরও তদন্ত কর্মকর্তার কাছে হাজিরার নোটিশ দেওয়া হলেও তারা উপস্থিত হননি। অন্য মামলার প্রেক্ষাপট ও ‘আপোষ’ আলোচনার অভিযোগএদিকে নোবেলের বিরুদ্ধে অন্য একটি মামলায় গ্রেফতারের পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয় বলে বাদীর দাবি। কারাগারে সাক্ষাতে নোবেল ও তার মা জামিন দ্রুত করতে আর্থিক সহায়তা চান এবং বের হয়ে বিয়ে সম্পন্ন করার আশ্বাস দেন। এমন অভিযোগ রয়েছে। বাদীর ভাষ্য অনুযায়ী, নোবেলের পরিচিত মাসুদ রানা ‘আপোষ’ করাতে সহায়তার কথা বলে যোগাযোগ করেন। সংশ্লিষ্ট মামলার বাদী ইসরাত জাহান প্রিয়া প্রথমে ১০ লাখ টাকা দাবি করেন, পরে তা ৫ লাখ টাকায় নামান। বাদীর দাবি, মায়ের গয়না বিক্রি ও সঞ্চয় ভেঙে ৫ লাখ টাকা মাসুদের হাতে দেওয়া হয়, যা টাঙ্গাইলে প্রিয়ার কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। এরপর আইনি খরচের কথা বলে আরও ৩ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব অর্থপ্রদানের প্রত্যক্ষ দলিল সীমিত; কিছু অডিও রেকর্ড ও কথোপকথনের স্ক্রিনশট জব্দ করা হয়েছে। তদন্তের ধারাবিবরণীতে বলা হয়েছে, বাদী মোটামুটি ২০ লাখ টাকা বিভিন্ন সময়ে প্রদান করেছেন বলে দাবি করেন। এর মধ্যে ৬০ হাজার ৫৪০ টাকার মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন নিশ্চিত হয়েছে; সহকারী সৌমিকের মাধ্যমে ৪ লাখ ৫৮ হাজার টাকা গ্রহণের অডিও রেকর্ড জব্দ করা হয়েছে; বাকি অংশের ক্ষেত্রে নগদ লেনদেন ও আপোষ সংক্রান্ত অর্থের বিষয়ে সীমিত প্রমাণ পাওয়া গেছে। মামলা, গ্রেফতার ও জামিনঅভিযোগে গত ২০২৫ সালের ১৩ আগস্ট নোবেলসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন অনন্যা। অভিযোগে বলা হয়, প্রেমের সম্পর্ক ও বিয়ের আশ্বাস দেখিয়ে ২০২৩ সালের ২৫ আগস্ট থেকে গত বছরের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ১৩ লাখ ১৮ হাজার ৫৪০ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। পাশাপাশি বাদীকে আটকে রেখে হেনস্তা ও আপত্তিকর ছবি তৈরির চেষ্টার অভিযোগ তোলা হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকা থেকে নোবেলকে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন ২৪ ফেব্রুয়ারি তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে পাঠানোর আবেদন জানানো হয়। সেদিন আদালতেই উভয় পক্ষের মধ্যে আপসের আলোচনা হয়। বিচারক জানতে চাইলে দুই পক্ষই আপসের সম্মতি জানান। এরপর নোবেলের আইনজীবী মো. রানা শেখের আবেদনের পর আদালত এক হাজার টাকা মুচলেকায় ২ এপ্রিল পর্যন্ত জামিন মঞ্জুর করেন। বাদীপক্ষের আইনজীবী সাজিদুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, বিয়ের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই সেদিন জামিনে আপত্তি করা হয়নি। তবে জামিনের পর নির্যাতনের ঘটনায় এখন জামিন বাতিলের আবেদন করা হবে। জামিনের পর নতুন অভিযোগগত বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে গণমাধ্যমের সামনে আনাননিয়া শবনম রোজ অনন্যা অভিযোগ করেন, মঙ্গলবার জামিন পাওয়ার পর নোবেল তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন। জামিন বাতিলের আইনি উপায় জানতে মা ও ছোট বোনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি আদালতে এসেছেন বলে জানান। অনন্যার ভাষ্য, আদালতে আপসের আশ্বাস দিয়ে জামিন নেওয়ার পর বাসায় ফিরে তার ওপর হামলা চালানো হয়। তিনি সাংবাদিকদের সামনে হাতে আঘাতের দাগও দেখান। তার অভিযোগ, মামলা করার কারণেই তাকে মারধর করা হয়েছে। গণমাধ্যমে নোবেলের যে চিত্র দেখা যায়, ব্যক্তিজীবনে তিনি ভিন্ন আচরণ করেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ সময় অনন্যার মা বিবি কুলসুম অভিযোগ করেন, মিষ্টি কথায় জামিন নিলেও পরে আচরণ বদলে যায়। তার দাবি, প্রায় তিন বছর আগে মেয়ের সঙ্গে নোবেলের বিয়ে হয়, যদিও সে সময় বিষয়টি প্রকাশ করা হয়নি। জামিনের পর মেয়েকে বাসায় নিয়ে গিয়ে পুনরায় নির্যাতন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনার ভিডিওসহ কিছু প্রমাণ তাদের কাছে রয়েছে বলে জানান কুলসুম। মা-মেয়ের অভিযোগ, নোবেল তাদের হুমকিও দিয়েছেন, যার কারণে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। মামলাটির আইনি অবস্থানমামলার তদারকি কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থোয়াইঅংপ্রু মারমার তত্ত্বাবধানে তদন্ত পরিচালিত হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা ঘটনাস্থল একাধিকবার পরিদর্শন করে খসড়া মানচিত্র, সূচিপত্র ও আলোকচিত্র প্রস্তুত করেন। বাদী ও তার পরিবারের দুই সদস্যের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। আইনজীবীদের মতে, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ আদালতে গ্রহণযোগ্য হলে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গ সংক্রান্ত ধারায় বিচার অগ্রসর হতে পারে। তবে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ও জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্কের অভিযোগে ডিজিটাল ফরেনসিক বা প্রত্যক্ষ আলামত না থাকলে প্রমাণের মানদণ্ড পূরণ কঠিন হতে পারে। অন্যদিকে বাদীপক্ষের দাবি হুমকি ও সামাজিক চাপে অনেক প্রমাণ সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। অভিযুক্তরা তদন্তে সহযোগিতা করলে আরও তথ্য উদঘাটিত হতে পারত। অভিযুক্তদের বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি। এমডিএএ/এলআইএ