সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও শীর্ষ কর্মকর্তারা নিহত হওয়ার পর আরব উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালাচ্ছে ইরান। এরই মধ্যে রোববার (১ মার্চ) সকালেও টানা দ্বিতীয় দিনের মতো সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, কাতারের রাজধানী দোহা ও বাহরাইনের রাজধানী মানামাতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তেল-গ্যাসসমৃদ্ধ এসব দেশের ঘাঁটিগুলোতে হাজারো মার্কিন সেনা অবস্থান করেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা বলছে, বহু বছর ধরে তুলনামূলক শান্ত ও নিরাপদ হিসেবে পরিচিত উপসাগরীয় অঞ্চলে এ দৃশ্য বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। দোহায় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তারা কয়েকটি প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন ও শহরের দক্ষিণ অংশের পরিষ্কার আকাশে ঘন কালো ধোঁয়া উড়তে দেখেছেন। Doha today morning Sanaiya Street 4 7:30 Am#IranWar #iranvsisrael pic.twitter.com/HFMTe6ScEK — ABDUL ★ (@abdulw0rld) March 1, 2026 এর কিছুক্ষণের মধ্যেই দুবাইয়ে নতুন করে বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়। আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের পর সাদা ধোঁয়ার রেখা দেখা যায়; পাশাপাশি জেবেল আলি বন্দরের ওপর ঘন কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে ব্যস্ত সমুদ্রবন্দরগুলোর একটি। বাহরাইনের রাজধানী মানামাতেও অন্তত চারটি বড় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। তবে রোববারের (১ মার্চ) বিস্ফোরণগুলোতে ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের কোনো তাৎক্ষণিক তথ্য মেলেনি। এর আগে শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিসহ ওমান ছাড়া অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর বিভিন্ন স্থাপনায় সমন্বিত হামলা চালায় ইরান। ওমানের হামলা না করার কারণ হলো, দেশটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক আলোচনায় মধ্যস্থতা করছে। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ইরান ১৩৭টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ২০৯টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এর ফলে দুবাইয়ের আইকনিক স্থাপনা পাম জুমেইরা ও বুর্জ আল-আরবে আগুন লেগে যায়। তাছাড়া আবুধাবি বিমানবন্দরে এক ব্যক্তি নিহত ও সাতজন আহত হয়েছেন বলে কর্তৃপক্ষ জানায়। বিশ্বের ব্যস্ততম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দুবাই বিমানবন্দরসহ কুয়েত বিমানবন্দরও হামলার শিকার হয়। অন্যদিকে কাতারি কর্মকর্তারা জানান, শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) দেশটির দিকে ইরান থেকে ৬৫টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ১২টি ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়। অধিকাংশই প্রতিহত করা সম্ভব হলেও হামলায় ১৬ জন আহত হয়েছেন। উপসাগরীয় উত্তেজনার মধ্যে জর্ডান জানায়, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাজধানী আম্মান ও দেশের উত্তরাঞ্চলে অনুপ্রবেশকারী ক্ষেপণাস্ত্র আটকে দিয়েছে। কুয়েতেও সাইরেন বেজে ওঠে। উত্তর ইরাকের এরবিল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটি ড্রোন বিধ্বস্ত হয় বলে স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। সেখানকার আকাশে বড় ধোঁয়ার মেঘ দেখা যায়। আইএসবিরোধী আন্তর্জাতিক জোটের অংশ হিসেবে এখনো মার্কিন সেনারা ইরাকের কুর্দি অঞ্চলে অবস্থান করছে। এদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান খামেনির হত্যাকে ‘চরম অপরাধ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ আবদুর রাহিম মুসাভিও নিহত হয়েছেন। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের কালিবার রোববার (১ মার্চ) এক টেলিভিশন বক্তব্যে বলেন, তোমরা (যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল) আমাদের লালরেখা অতিক্রম করেছ ও এর মূল্য তোমাদের দিতে হবে। আমরা এমন বিধ্বংসী আঘাত হানবো যে তোমরাই করুণা চাইতে বাধ্য হবে। এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান যদি খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নিতে যুক্তরাষ্ট্রকে আঘাত করে, তবে তারা ইরানকে ‘ইতিহাসে দেখা যায়নি এমন শক্তি দিয়ে’ আঘাত করবে। ট্রাম্প ট্রুথ সোশালে লিখেছেন, ইরান বলছে তারা আজ খুব শক্ত আঘাত হানবে, যা তারা কখনো করেনি। তারা যেন সেটা না করে! করলে আমরা এমন শক্তি দিয়ে হামলা করবো যা পৃথিবী কখনো দেখেনি! ইরানে নিহত ২০০ জনেরও বেশি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী রোববার ভোরে জানায়, তারা পশ্চিম ও মধ্য ইরানে ৩০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে ও ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র সাইট, সামরিক সদরদপ্তরসহ আরও বিভিন্ন ‘রেজিম টার্গেটে’ হামলা অব্যাহত থাকবে। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) থেকে এখন পর্যন্ত ইরানে ২০১ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে শুধু দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় ১৪৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের ২৭টি সামরিক ঘাঁটি, ইসরায়েলের তেল নোফ বিমানঘাঁটি, তেল আবিবের হাকিরিয়া সামরিক সদরদপ্তর এবং একটি বৃহৎ প্রতিরক্ষা শিল্প কমপ্লেক্সে হামলা চালাচ্ছে। রোববার (১ মার্চ) স্থানীয় সময় ভোর ৬টার পর ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে তেল আবিবে, টানা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেলে সাইরেন বাজতে শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে ইরান ঘোষণা করেছে যে, সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর দেশ পরিচালনার জন্য তিন সদস্যের অন্তর্বর্তী কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে খামেনির অনুসারীরা রাস্তায় নেমে শোক প্রকাশ করছে। এছাড়া প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান সাত দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছেন, যা সরকারের আগে ঘোষণা করা ৪০ দিনের শোক সময়ের সঙ্গে যুক্ত হবে। সূত্র: আল-জাজিরা এসএএইচ