সোনার গয়নার লোভে সিরিয়াল কিলার হয়ে ওঠেন ‘সায়ানাইড মল্লিকা’

সোনার দাম দিন দিন বেড়েই চলেছে। তারপরও কমছে না এর প্রতি নারীদের আকর্ষণ। নারীরা অনেক বেশি সাজগোজ, বিয়ে কিংবা দৈনন্দিন ব্যবহারে সোনার গয়না কেনেন। অনেকে একে ভবিষ্যতের বিপদের মুশকিল আসান মনে করেন। এজন্য অল্প অল্প করে সোনার গয়না কিনে জমাতে থাকেন। শুধু নারীরাই নন, পুরুষেরও সোনার গয়নার প্রতি আকর্ষণ কম নয়। তবে জানেন কি? এই সোনার গয়নার লোভে সিরিয়াল কিলার হয়ে ওঠেন এক নারী। তাও আবার বাংলায়। বাংলার প্রথম নারী সিরিয়াল কিলার তিনি। তবে এটি বহু শতাব্দীর আগের কোনো ঘটনা নয়। গত শতাব্দীর শেষ দিকেই এমন কান্ড ঘটিয়েছিলেন এক গৃহবধূ। ইতিহাসে তিনি পরিচিত ‘সায়ানাইড মল্লিকা’ নামে। তিনিই ভারতের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রথম নারী সিরিয়াল কিলার। ১৯৯৯ সাল থেকে পরবর্তী আট বছরে তিনি খুন করেন ৬ নারী। কথায় আছে- ‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু’। লোভ মানুষকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। তাই বলে গয়নার লোভে একজন সাধারণ গৃহবধূ সিরিয়াল কিলার হয়ে গেলেন, এই কাহিনি অবাক করেছে সবাইকে। ৬জন নারীকে ঠান্ডা মাথায় সায়ানাইড দিয়ে হত্যা করেন তিনি। আসুন এর পেছনের গল্প জেনে আসা যাক। কীভাবে তিনি খুনের ছক সাজাতেন, হত্যার পর কি করতেন এবং অবশেষে কীভাবেই বা তিনি ধরা পড়লেন সব জানাব আজ, সঙ্গে থাকুন। ভারতের কর্নাটকের কগ্গলীপুরার বাসিন্দা কেডি কেম্পাম্মা। জন্ম নিম্নবিত্ত এক পরিবারে। বাবা-মা ঠিকমতো সন্তানদের তিনবেলা খাবার দিতে পারতেন না সন্তানদের মুখে। তাই খুব অল্প বয়সেই কেডি কেম্পাম্মাকে বিয়ে দিতে দেন। অভাবী পরিবারে বেড়ে ওঠা মেয়েটির বিয়েও হয়েছিল আরও একটি অভাবী পরিবারে। ফলে অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী। স্বামী দর্জির কাজ করতেন। সংসার চালাতে তাই নিজেকেও পরিচারিকার কাজে নামতে হয়। অন্যের বাড়িতে কাজ করার সময় ছোটখাট চুরি করতেন। তাদের ভালো, আয়েশি, বিলাসবহুল জীবনযাপন, নারীদের গয়না পরা দেখে তার খুব শখ হত তাদের মত জীবন কাটানোর। কিন্তু একজন পরিচারিকার কাজ করে যে টাকা আয় করত, তা দিয়ে বিলাসবহুল জীবনযাপন, তার উপর সংসার খরচ একটা অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছুই না। কিন্তু সেই অলীককে বাস্তবে রূপায়িত করার পথ খুঁজতে থাকেন। যেসব বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করতেন, সেই বাড়িগুলোতেই ছোটখাটো চুরি করা শুরু করেন। এক দিন ধরাও পড়ে গেলেন। জেলেও যেতে হল। জেল থেকে ফিরে স্বামীর ঘরেও আর ঠাঁই হয়নি। কিন্তু এখানেই থেমে থাকেননি। চিটফান্ড সংস্থা বানিয়ে টাকা উপার্জনের চেষ্টা করেন। সেটাও ঠিকমতো চলেনি। আর এখান থেকেই অপরাধের জগতে পা রাখেন কেডি কেম্পাম্মা। এক সাধারণ নারী থেকে সিরিয়াল কিলার হয়ে ওঠার কাহিনির শুরু এখান থেকেই। বেছে বেছে বিত্তশালী নারীদের শিকার বানাতেন কেম্পাম্মা। বিশেষ করে যাদের অর্থ থাকলেও কোনো মানসিক সুখ ছিল না, এমন নারীদের নিজের শিকার বানাতেন। প্রথমে তাদের সঙ্গে আলাপ জমাত, তার পর তাদের টাকা, গয়না সব লুট করে সায়ানাইড খাইয়ে খুন করতেন। বেঙ্গালুরু শহরের বিভিন্ন মন্দিরগুলোই ছিল তার টার্গেট পয়েন্ট। সন্ন্যাসিনীর বেশ ধরে বিভিন্ন মন্দিরে মন্দিরে ঘুরতেন তিনি। মন্দির আসা বিভিন্ন নারীদের দেখে বোঝার চেষ্টা করতেন, কে কে পারিবারিক সমস্যার কারণে অবসাদে আছেন। এমন নারীদের খুঁজে বের করে; তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতেন সাইনাইড মল্লিকা। তাদের বিশ্বাস অর্জন করে ফাঁকা কোনো মন্দিরে নিয়ে যেতেন। সেখানে সমস্যা সমাধানের জন্য যজ্ঞ করার পরামর্শ দিতেন। তবে এই নারীর শর্ত থাকত একটিই, তাদের আলমারিতে থাকা সবচেয়ে দামি শাড়ি এবং সব গয়না পরে আসতে হবে। তার কথা মেনে যে নারী ফাঁকা মন্দিরে আসতেন, সুযোগ বুঝে সায়ানাইড মেশানো পানি খাইয়ে হত্যা করে শাড়ি-গয়না নিয়ে পালিয়ে যেতেন সাইনাইড মল্লিকা। তার প্রথম শিকার ১৯৯৯ সালে। বেঙ্গালুরুর বাইরে মমতা রাজন নামে ৩০ বছরের এক নারীকে খাবারের সঙ্গে সায়ানাইড মিশিয়ে খুন করেন কেডি। তারপর তার গয়না, টাকা লুট করে পালায়। ২০০৬ সালে এক নারীকে খুন করে লুট করার চেষ্টা করতে গিয়ে ব্যর্থ হন। সেই ঘটনায় কেম্পাম্মা ধরা পড়েন এবং ছ’মাস জেলেও খাটেন। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে এই কাজের গতি আরও বাড়ায় কেম্পাম্মা। এবার অন্য কৌশল নিলেন তিনি। কার সন্তান হচ্ছে না, কার বিয়ে, কার সংসারে অশান্তি এসব সমস্যা ঠিক করার নামে নারীদের নিজের শিকার বানাতে শুরু করেন। যখন কোনো নারী ওই পানি খেতে না চাইতেন; তখন তাদের নাক চেপে ধরে জোর করে তা খাওয়াতেন তিনি। ভিকটিম কখন মারা যাবেন, সেজন্য অপেক্ষা করতেন; তারপর অর্থ ও মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনতাই করতেন সাইনাইড মল্লিকা। প্রতিটি খুনের পরই তিনি বেশ-ভূষা পরিবর্তন করতেন। সাত বছরে সাতটা খুন করেন। প্রতিটি খুনের ক্ষেত্রে তদন্তকারীরা একই ধরন দেখতে পেয়েছিলেন। খুনের ধরনের সূত্র ধরে এগোতেই কেম্পাম্মার অপরাধের সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছিলেন তারা। ২০০৮ সালে নাগবেণী নামে এক নারীকে সায়ানাইড দিয়ে খুন করার পর যখন টাকা গয়না নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন, তখনই পুলিশ কেম্পাম্মাকে গ্রেফতার করে। কেম্পাম্মার বিরুদ্ধে একাধিক নারী হত্যার অভিযোগ থাকলে, সুনির্দিষ্ট ৬ নারীকে হত্যার জন্য তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। গ্রেফতারের পর তিনি জানান, সিনেমার মাধ্যমে তিনি সায়ানাইড দিয়ে হত্যা সম্পর্কে জানতে পারেন। এই পদ্ধতির কারণেই তিনি ‘সায়ানাইড মল্লিকা’ নামে আলোচিত হয়ে ওঠেন। পুলিশী জেরায় নিজের অপকর্মের কথা স্বীকার করেন কুখ্যাত এই নারী। পুলিশ জানায়, ডাকাতির উদ্দেশ্যেই এসব নৃশংস কাজ করেন তিনি। একাধিক খুনের জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয় থাকে। ২০১০-২০১২ সালের মধ্যে বিচারবিভাগ মোট ৬ নারীকে হত্যার দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। কেম্পাম্মার জীবনী নিয়ে নির্মিত ছবি ‘সায়ানাইড মল্লিকা’ প্রকাশ পেয়েছে ২০২১ সালে। এ ছবির মূল চরিত্রে অভিনয় করেছে সানজানা প্রকাশ। চাইলে দেখে নিতে পারেন বাংলার প্রথম নারী সিরিয়াল কিলারের জীবনীর ওপর ভিত্তি করে তৈরি সিনেমাটি। সূত্র: গাল্ফ নিউজ আরও পড়ুনদেউলিয়ার পর বন্ধ হয়ে গেল ব্রিটিশদের সেই ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ফেব্রুয়ারি মাস কেন ২৮ দিনে হয় জানেন? কেএসকে