আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ডিজিএফআইয়ের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার (জেআইসি) সেলে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে করা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের চতুর্থ সাক্ষী বীর মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল চৌধুরী জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, তাকে যে ছোট কক্ষে আটকে রাখা হয়েছিল একে জীবন্ত কবর মনে হয়েছিল। সোমবার (২ মার্চ) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ তিনি জবানবন্দি দেন। পরে বিচারিক প্যানেল পরবর্তী শুনানির জন্যে আগামী ৫ মার্চ দিন ঠিক করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলাটি চলছে। আদালতে আজ রাষ্ট্রপক্ষের শুনানিতে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম, শাইখ মাহদীসহ অন্যরা। ২০১৮ সালে গুমের শিকার হওয়া ইকবাল চৌধুরী জবানবন্দিতে বলেন, ‘২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিডিআর হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড, খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া, গুম-খুন, ভারতীয় আধিপত্যবাদসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে ফেসবুকে লেখালেখি করতাম। এরই ফলশ্রুতিতে ২০১৮ সালের ৭ মে রাত ১১টায় মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধে আমার তৎকালীন ভাড়া বাসায় কলিং বেল চাপেন সাদা পোশাকধারী সাত-আটজন লোক। ওই সময় দরজা খোলেন আমার স্ত্রী লায়লা আঞ্জুমান। দরজা খোলার পর আমি বাসায় আছি কি না জানতে চান তারা। একপর্যায়ে আমি এগিয়ে যাই।’ ‘আমাকে দেখেই তারা জিজ্ঞাসা করেন ইকবাল চৌধুরী কি না। আমি স্বীকার করে জানতে চাই আপনারা কারা। তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোক বলে জানান। একই সঙ্গে কিছু তথ্য জানার জন্য তাদের অফিসে যেতে বলেন। কোন অফিসে যেতে হবে- এমন কথা বলতেই তারা ধমকের সুরে বলেন, “এত কথা বলা যাবে না। আমরা আপনাকে নিতে এসেছি। আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।” এসব বলে আমাকে তারা পঞ্চমতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নিয়ে যান। চিৎকার করতে করতে আমার সঙ্গে আঞ্জুমানও নিচে নামেন,’ যোগ করেন সাক্ষী। তিনি বলেন, ‘নিচে নেমে কিছু দূর এগিয়ে গেলে কালো গ্লাসের সাদা রঙয়ের মাইক্রোবাস দেখতে পাই। ওই গাড়িতে আমাকে ওঠানোর সময় ডিবির পোশাক পরা দুজনকে দেখি। তখন গাড়িতে উঠতে না চাইলে আমার পিঠে অস্ত্র ধরে ধাক্কা দিয়ে গাড়িতে ওঠান তারা। গাড়িতে ওঠার পর আমার চোখ বেঁধে ফেলা হয়। এরপর জমটুপি পরিয়ে হাতকড়া লাগিয়ে দেন। গাড়ি ছেড়ে দিলে একজন আমাকে বলেন, “যা জিজ্ঞাসা করবো সত্য বলতে হবে। অন্যথায় ক্রসফায়ার দিয়ে লাশ গুম করে ফেলবো।” গাড়িটি ২০-৩০ মিনিট চলার পর হর্নের শব্দ শুনতে পাই। একই সঙ্গে একটি গেট খোলার শব্দ কানে বাজে। তখন গাড়িটি গেটের ভেতরে প্রবেশ করে।’ ইকবাল আরও বলেন, ‘গেট খোলার দুই মিনিট পর গাড়ির দরজা খুলে দুজন ব্যক্তি আমাকে হাত ধরে নামিয়ে এক জায়গায় বসান। একজন লোক এসে আমার নাম জিজ্ঞাসা করেন। আরেকজন ব্লাড প্রেশার মাপেন। সেখান থেকে এক-দেড় মিনিট হাঁটিয়ে নিয়ে আরেকটি জায়গায় দাঁড় করান। তখন আমার চোখের বাঁধন, জমটুপি ও হাতকড়া খুলে দেওয়া হয়। এরপর পরনের কাপড় খুলতে বললে খুলে দেই। তখন আমাকে একটি পুরোনো লুঙ্গি ও পুরোনো টি-শার্ট দেওয়া হয়।’ ভুক্তভোগী বলেন, ‘আমাকে ৮/১০ ফুটের একটি কক্ষে রাখা হয়। সেখানে ছোট একটি চৌকি ছিল। এতে একটি তেল চিকচিকে বালিশ ও একটি পুরোনো ময়লা চাদর বিছানো ছিল। কক্ষটির দেয়ালে কোনো পলেস্তারা ছিল না। দেয়ালগুলো ছিল এবড়োথেবড়ো। কক্ষটির বিছানার সোজা ওপরে ছিল একটি লাইট, যা ২৪ ঘণ্টা জ্বলতো। সামনের দেয়ালে বড় একটি এগজস্ট ফ্যান ছিল, এতে প্রচণ্ড শব্দ হতো। কক্ষটির সামনে ছিল লোহার শিকের দরজা। শিকের পর কাঠের দরজা। তারা এগজস্ট ফ্যানটি চালিয়ে লোহার দরজা ও কাঠের দরজাটি বন্ধ করে চলে যান। এতে আমি আতঙ্কগ্রস্ত ছিলাম। কান্নাকাটি করতে করতে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকি। মনে হলো আমি একটি জীবন্ত কবরে আছি।’ এ পর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সাক্ষী। পরে জবানবন্দি শেষ না হওয়ায় আগামী ৫ মার্চ পর্যন্ত তা মুলতবি করেন ট্রাইব্যুনাল। আজ শুনানির জন্য মামলার ১৩ আসামির মধ্যে গ্রেফতার তিনজনকে ঢাকা সেনানিবাসের বিশেষ কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তারা হলেন- ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। পলাতক ১০ আসামির পাঁচজনই ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন বিভিন্ন মেয়াদে। এর মধ্যে রয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক। বাকি পলাতকরা হলেন- শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষাবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মখছুরুল হক। গুমের এ মামলায় গত বছরের ৮ অক্টোবর ১৩ জনের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দেওয়া অভিযোগ আমলে নেন আদালত। পরে ২২ অক্টোবর সেনা হেফাজতে থাকা তিন কর্মকর্তাকে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। ১৮ ডিসেম্বর ১৩ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। এফএইচ/একিউএফ