কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলে ক্রমশ বাড়ছে সামুদ্রিক কচ্ছপের মৃত্যুর মিছিল। গত এক সপ্তাহে মাত্র সাড়ে ৩ কিলোমিটার সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে মিলেছে ২০টিরও বেশি মৃত মা কচ্ছপ, যাদের সবকয়টির পেটেই ডিম ছিল। প্রতিবছর এভাবে কচ্ছপের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ায় উদ্বিগ্ন পরিবেশ অধিদফতর।সরজমিনে কক্সবাজার সোনারপাড়া সমুদ্র উপকূলে দেখা যায়, বালিয়াড়িতে মৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে মা কচ্ছপ। একদিকে পেটে রয়েছে ডিম, অন্যদিকে শরীরে আঘাতের চিহ্ন। শুধু সোনারপাড়া উপকূল নয়, পেচারদ্বীপ সমুদ্র উপকূলেও ভেসে আসছে মৃত কচ্ছপ। স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলে, ট্রলিং জাহাজ, বড় ট্রলার ও অবৈধ জাল এসব কচ্ছপের মৃত্যুর জন্য দায়ী। সোনারপাড়ার জেলে রশিদ বলেন, কচ্ছপ জাল আটকে গেলে জেলেরা পাখা কেটে দেয়, এরপর কচ্ছপ দুর্বল হয়ে কূলে এসে মারা যায়। বড় ট্রলার ও ট্রলিং জাহাজের আঘাতেও মারা যায় কচ্ছপ। আরও পড়ুন: টেকনাফ / সাগরে অবমুক্ত হলো আরও ৫২১টি কাছিমের ছানা আরেক জেলে সৈয়দ উল্লাহ বলেন, সাগরে প্রায়ই কচ্ছপ ভেসে থাকে। গতকালও ১০-১২টি মৃত কচ্ছপ পানিতে ভেসে ছিল। প্রধান কারণ মাছ ধরার জাল। বড় ট্রলারের জালে আটকে তারা শ্বাস নিতে না পেরে মারা যায়। কিছু জেলে ইচ্ছাকৃতভাবেও আঘাত করে। এক সপ্তাহের মধ্যে শতাধিক মৃত কচ্ছপ সাগরে ভাসতে দেখেছি। গত ৪ বছর ধরে সোনারপাড়া সমুদ্র উপকূলে কচ্ছপ রক্ষণাবেক্ষণ ও ডিম সংরক্ষণে কাজ করছেন স্থানীয় যুবক নবী হোসেন। তার দাবি, উপকূলে ডিম পাড়তে এসে প্রাণ হারাচ্ছে একের পর এক মা কচ্ছপ। নবী হোসেন বলেন, এক সপ্তাহে প্রায় ২০টি মৃত কচ্ছপ পেয়েছি। নিজ উদ্যোগে এগুলো মাটিতে চাপা দিয়েছি। যদি ফেলে রাখা হয়, দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং আশেপাশের ছোট বাচ্চাদের জন্য ক্ষতিকর। মানুষ কচ্ছপ ও পরিবেশ রক্ষার কাজে সচেতন হোক; এটাই আমার চেষ্টা। একের পর এক কচ্ছপের মৃত্যুর মিছিল নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় খোদ পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তারাও। গবেষকরা বলছেন, কচ্ছপ রক্ষায় আইন প্রয়োগ এবং জেলেদের সচেতন করার বিকল্প নেই। রেডিয়েন্ট রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন সেন্টারের গবেষক মো. আব্দুল কাইয়ুম জানান, গত দুই মাসে প্রায় ৬০-৭০টি মৃত কচ্ছপ উপকূলে ভেসে এসেছে। বিশেষ করে সোনাদিয়া দ্বীপ, কক্সবাজার, টেকনাফ পেনিনসুলা ও সেন্টমার্টিনস দ্বীপ এলাকায় ঘটনা বেশি। ডিম পাড়ার সময় কচ্ছপ সাগরে জালে আটকে যায় বা ট্রলারের আঘাতে গুরুতরভাবে আহত হয় উল্লেখ করে তিনি আরও জানান, অনেক সময় জাল কেটে দেওয়া হলেও রক্তক্ষরণ বা আঘাতের কারণে কচ্ছপ মারা যায়। গত বছরও মৃত কচ্ছপ উদ্ধারের সংখ্যা ২০০-এর বেশি ছিল। তাই সরকারি বিধিনিষেধ, মোবাইল কোর্ট এবং জনসচেতনতা জরুরি। মো. আব্দুল কাইয়ুম বলেন, উপকূলের জেলে ও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীকে বোঝাতে হবে-সামুদ্রিক কচ্ছপ টিকে থাকলে জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য বজায় থাকে। এতে জেলিফিশের আধিক্য কমে, মাছের উৎপাদন বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে জেলেদেরই লাভ হয়। পরিবেশকর্মী, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগে সচেতনতা তৈরি করা গেলে পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব। আরও পড়ুন: কুয়াকাটা সৈকতে একের পর এক মৃত জেলিফিশ ভেসে আসছে কেন? পরিবেশ অধিদফতর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপ-পরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, সামুদ্রিক কচ্ছপ সমুদ্র ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। তাই সংরক্ষণে সবার সচেতনতা ও অংশগ্রহণ অপরিহার্য। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে কচ্ছপ মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। বাংলাদেশ ওশেনোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা ফলাফলও ইঙ্গিত করছে, প্রতিবছর মৃত কচ্ছপের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক এবং গভীর দুশ্চিন্তার কারণ। খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, সোনাদিয়া দ্বীপে একটি সংরক্ষণ প্রকল্প চলছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে হ্যাচারি স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একজন গার্ড নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন। দক্ষিণপাড়া, পশ্চিমপাড়া ও পূর্বপাড়ার অন্তত দুটি স্থানে হ্যাচারি হবে, যেখানে ডিম নিরাপদে সংরক্ষণ ও ফুটানোর ব্যবস্থা থাকবে। সমন্বিত উদ্যোগ, কঠোর নজরদারি ও জনসচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে কচ্ছপ সংরক্ষণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।