অর্থনীতিতে ভয়াবহ নিরব ঘাতক রিবা

বর্তমানে বিভিন্ন মানুষের কাছে প্রায় শোনা যায়, ‘আমার দোয়া কবুল হচ্ছে না কেন? এত কান্নাকাটি করি তবুও কেন আল্লাহ আমার দোয়া শোনেন না?অভিযোগ সত্য। তবে সমস্যার গভীরে আমরা প্রবেশ করি না। রসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যার খাদ্য, পানীয় ও পোশাক হারাম, তার দোয়া কবুল হয় না। (সহিহ মুসলিম: ১০১৫।)  অথচ আজ নামে বেনামে কতশত হারাম উপার্জন আমাদের শরীরে ঢুকে যাচ্ছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। এর মধ্যে প্রধানতম হচ্ছে সুদ। সুদ আজ আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে।  অথচ ইসলামে শিরকের পর সবচেয়ে কঠিনভাবে নিষেধাজ্ঞা এসেছে সুদের বিষয়ে। সুদ কি শুধু আমাদের জন্য পরকালীন ক্ষতির কারণ? নাকি পার্থিব জীবনেও অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করে যাচ্ছে? সেই বিষয়েই আজকের প্রতিবেদন। সুদ আর রিবা আদৌ কি পরিপূর্ণ এক? আচ্ছা বলতে পারেন কি? রিবা আর সুদের সংমিশ্রণে যেই শরবত আমাদেরকে গেলানো হচ্ছে, সেই শরবতের হাকিকত আসলে কি?  ইংরেজিতে সুদের প্রতিশব্দ হচ্ছে interest এবং usury। Oxford dictionary তে interest সম্বন্ধে বলা হয়েছে-  Interest (financial): The extra money that you pay back when you borrow money, or that you receive when you invest money. অর্থাৎ, ঋণ নেওয়ার সময় মূল টাকার অতিরিক্ত যে টাকা দিতে হয়, অথবা টাকা ধার দেওয়া/ব্যাংকে জমা রাখার বিনিময়ে যে অতিরিক্ত টাকা পাওয়া যায় সেটিই হলো Interest বা সুদ। (শায়খুল ইসলাম মুফতি মুহাম্মাদ তাকী উসমানী ইসলাম অউর জাদীদ মাআশী মাসায়েল’, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ১৩, প্রকাশনী: ইদারায়ে ইসলামিয়্যাত, পাকিস্তান। প্রকাশকাল: ১৪২৯হি./২০০৮ঈ.। পৃষ্ঠা: ৮১২, ৮ম সংস্করণ, ২০১০ঈ.।)বাংলা একাডেমির ‘আধুনিক বাংলা অভিধানে’ ‘সুদ’ এর অর্থ বলা হয়েছে গৃহীত ঋণের ওপর যে মূল্য পরিশোধ করতে হয়, বিনিয়োগের ওপর যে নির্দিষ্ট হারে লভ্যাংশ দেওয়া হয়। পৃষ্ঠা: ১৩৩৪, প্রকাশকাল: এপ্রিল, ২০১৬। উর্দু অভিধানগুলোতে সুদের অর্থ বলা হয়েছে- سود: قرض دئے ہوئے روپے پر نفع۔ অর্থাৎ, সুদ হচ্ছে প্রদানকৃত ঋণের অর্থের উপর লাভ নেয়া।‘ফিরুযুল লুগাহ’, পৃষ্ঠা: ৪৩২। প্রকাশনী: জি. এইচ. সেন্ট সিঙ্গ এন্ড সন্স, দিল্লি। প্রকাশকাল: ১৯৮৫ঈ.। আরও পড়ুন: আজান দেয়নি, ইফতার করা যাবে? তবে আরবিতে সুদের যেই প্রতিশব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা হলো ‘রিবা’। এর অর্থ হচ্ছে- الزياده، العلو، النماء، - অর্থাৎ, অতিরিক্ত, উঁচু, বৃদ্ধি। ইবনে ফারেস,‘মাকায়িসুল লুগাহ’, পৃষ্ঠা: ৩৭০। প্রকাশনী: দারুল হাদীস, মিশর। প্রকাশকাল: ২০০৮ঈ.। তো এই অতিরিক্তটা ঋণের ক্ষেত্রে যেমন হতে পারে, ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রেও হতে পারে, তেমনি দ্রব্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রেও হতে পারে। যেমন: কেউ ১ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়ে ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছে। এটা সবার কাছেই সুদ বা ইন্টারেস্ট বলে পরিচিত।  কিন্তু এক কেজি খেজুর দিয়ে দুই কেজি খেজুর কেনা বা গুলিস্তানে নতুন ১০০ টাকার বিনিময়ে পুরাতন ১২০ টাকা দেয়া ইন্টারেস্টের অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। আবার বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে দেরি হলে যে বিলম্ব মাশুল আসে তা ইন্টারেস্ট বা সুদের সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করতে না পারলেও শরীয়তের দৃষ্টিতে এটি রিবার অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং বোঝা গেল, সকল সুদই রিবা; কিন্তু সকল রিবা সুদ নয়। শরীয়তের দৃষ্টিতে রিবা বলা হয়- عبارة عن فضل مال لا يقابله عوض في معاوضة مال بمال অর্থাৎ, সম্পদের লেনদেনের মধ্যে বিনিময়হীন কোন অংশ থাকাকেই রিবা বলা হয়।‘ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া’। খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ১২৫। প্রকাশনী: দারুল কুতুবিল ইলমিয়া, বৈরুত। প্রকাশকাল: ১৪২১হি./২০০০ঈ.। সুতরাং, শরীয়তের দৃষ্টিতে রিবার পরিধি অনেক বিস্তৃত। এবার দেখি এই বহুমুখী রিবা বা ইন্টারেস্ট বিশ্ব অর্থব্যবস্থা এবং সাধারণ জনগণকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? রিবা আমাদেরকে ধ্বংস করছে তিনভাবে:১. দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করে ২. সম্পদ বন্টনে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে ৩. ইকোনমি ক্রাইসিস সৃষ্টি করে।একটা গল্প বলিআলী আকবর একজন শিল্পপতি। সে বোতলের ব্যবসা করে। একদিন সে চিন্তা করলো, আর কতদিন পুরাতন বোতলের ব্যবসা করবো? এখন থেকে নিজেই বোতল বানাবো। এই আশায় আলী আকবর চলে গেল ব্যাংকের কাছে। ব্যাংক থেকে আলী আকবর এক লক্ষ টাকা লোন নিলেন ৮% সুদের উপর ভিত্তি করে। আলী আকবর এই টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করল।  প্রতিটা বোতলের দাম ১০০ টাকা নির্ধারণ করে দ্বিগুণ লাভে সেগুলো বিক্রি করল। ধরে নিলাম, আলী আকবর এক লক্ষ টাকায় এক লক্ষই লাভ করেছে। অর্থাৎ তার পকেটে এখন রয়েছে ২ লক্ষ টাকা। এক লক্ষ হলো মূলধন, আর এক লক্ষ হলো তার লাভের।  এখন ব্যাংক তো তাকে এই শর্তে ঋণ দিয়েছে যে, সে ব্যাংককে ৮% সুদ দিবে। তাহলে সেই ৮% টাকা সে কোথায় পাবে? নিজের পকেট বা লাভ থেকে দিবে? কখনোই না। সে বোতলের উৎপাদন খরচ হিসেবে ১০০ টাকার বোতলটা ১০৮ টাকা করে দিবে। আর এদিকে সাজিদ ব্যাংকে কিছু দিন আগে ১০০ টাকা জমা রেখেছিল। এই আশায় যে সে ব্যাংক থেকে ১০৬ টাকা পাবে অর্থাৎ ছয় পার্সেন্ট সুদ পাবে। অটোমেটিক তার ১০০ টাকা ১০৬ টাকায় পরিণত হয়ে যাবে। তো আলী আকবর ব্যাংকে ১০৮ টাকা দেওয়ার পর ব্যাংক কোনো পুঁজি ছাড়াই শুধু লেনদেন করে দুই টাকা লাভ করে নিয়েছে। সেখান থেকে ১০৬ টাকা সে দিয়ে দিল সাজিদকে।  সাজিদ সেই টাকা নিয়ে দোকানে চলে গেল বোতল কিনতে। গিয়ে দেখে ১০০ টাকার বোতল এখন ১০৮ টাকা। তো ডিপোজিটর লাভের ৬ টাকা দিয়েও নিজের পকেট থেকে আরও অতিরিক্ত দুই টাকা দিয়েছে বোতলটি কেনার জন্য। আর আলী আকবর এই অভিশপ্ত সুদের বোঝাটা জনগণের উপর দিয়ে চালিয়েই ফুলে-ফেঁপে মোটা হচ্ছে ধন-সম্পদে। এবার আমরা উক্ত ব্যবসায় সকল পক্ষের লাভ-ক্ষতির হিসাব দেখি:ক্ষতি-লাভের সারসংক্ষেপ, পক্ষ: সাজিদ (জমাকারী) কী পেল: নামমাত্র ৬ টাকা সুদ (১০৬ টাকা) কী হারাল/ক্ষতি: ১. প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস ২. মূলধন ক্ষয় ৩. বোতল কিনতে নিজের পকেট থেকে অতিরিক্ত ২ টাকা দিতে বাধ্য মন্তব্য: আসলেই ক্ষতিগ্রস্ত – সুদের আয় ধরে রাখতেও পারল না পক্ষ: আলী আকবর (ঋণগ্রহীতা) কী পেল: ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় টাকা কী হারাল/ক্ষতি: সুদের বোঝা (৮%) পণ্যের দামে চাপাতে বাধ্য হলেন; শরীয়তের দৃষ্টিতে নৈতিক দায় মন্তব্য: মধ্যবর্তী শিকার – ব্যবসা করতে গিয়ে হারামে জড়িয়ে পড়লেন। আরও পড়ুন: রমজান তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার সুবর্ণ সুযোগ পক্ষ: ব্যাংক কী পেল: ঝুঁকিহীন ২% লাভ (৮% - ৬%) কী হারাল/ক্ষতি: কিছুই না মন্তব্য: আসল লাভভোগী – কোনো উৎপাদন বা মূলধন খরচ ছাড়াই পক্ষ: সাধারণ ক্রেতা কী পেল: কিছুই না কী হারাল/ক্ষতি: দাম বৃদ্ধির পুরো বোঝা বহন করতে হচ্ছে। মন্তব্য: সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত–বাড়তি দাম গুনতে হচ্ছে, আয় অপরিবর্তিত সুদের এই চক্রে ব্যাংক নির্দিষ্ট ও ঝুঁকিহীন লাভ করে, আর সাধারণ মানুষ ও ক্রেতারা দ্বিগুণ ক্ষতির শিকার হয়। এতে একদিকে সঞ্চয়ে কম সুদ, অন্যদিকে পণ্যের বাড়তি দাম। আর ঠিক এভাবেই দিন দিন দ্রব্যমূল্যের দাম বেড়েই চলেছে।  সাধারণ জনগণের পকেট থেকে অদৃশ্যভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে শিল্পপতি ব্যবসায়ীরা। অধিকাংশ সম্পদ কুক্ষিগত হয়ে পড়ছে গুটিকতক মানুষের কাছে। আর সমাজে তৈরি হচ্ছে সম্পদের ভারসাম্যহীনতা।  ২০২৫ সালের কৃত এক জরিপ অনুযায়ী বিশ্বের মোট সম্পত্তির ৭৫% কুক্ষিগত করে রেখেছে মাত্র ১০% মানুষ। আর ২৩% সম্পদ রয়েছে ৪০% মানুষের কাছে। অর্থাৎ, পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ অর্থাৎ ৫০% লোকের ভাগে মাত্র ২% সম্পদ। এই চরম বৈষম্যের প্রধান কারণ সুদ ভিত্তিক অর্থব্যবস্থা। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন- احل الله البيع وحرم الربا আল্লাহ তায়ালা ক্রয়-বিক্রয়কে করেছেন হালাল এবং রিবা কে করেছেন হারাম। (সsরা বাকারা: ২৭৫)তাই তাই ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মুক্তির জন্য সুদ বর্জন করা আমাদের অপরিহার্য কর্তব্য। সুদমুক্ত সমাজ গঠনই আমাদের অর্থনৈতিক সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমা বিশেষজ্ঞগণও সুদের কুফল অনুধাবন করে এর বিকল্প খুঁজছেন। তাই সামগ্রিক অর্থনৈতিক কল্যাণ ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সুদভিত্তিক কার্যক্রম পরিহার করা এখন সময়ের দাবি।