দিগন্তজোড়া সবুজের বর্ণিল আবহে, সমতল ভূমির মাঝখানে হঠাৎ করেই যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি সুউচ্চ টিলা। আর সেই টিলার চূড়ায় স্থির ও গম্ভীর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের পুরোনো মোগল স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন বরগুনার বিবিচিনি শাহী মসজিদ। বরগুনা শহর থেকে প্রায় ৪৩ কিলোমিটার দূরে বেতাগী উপজেলার বিবিচিনি গ্রামে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক মসজিদ ঘিরে আছে নানা কিংবদন্তি, অলৌকিক কাহিনি ও স্থাপত্যকলার অদ্ভুত নিদর্শন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি পারস্য থেকে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশে দিল্লিতে আসেন শাহ নেয়ামত উল্লাহ নামের এক সাধক। এ সময় তিনি মোগল সম্রাট শাহজাহানের ছেলে ও বাংলার সুবাদার শাহ সুজা তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। পরে ১৬৫৯ সালে শাহ সুজার আগ্রহে হজরত শাহ নেয়ামত উল্লাহ (রহ.) বরগুনার বেতাগীর এই এলাকায় আসেন। তাঁর মেয়ে চিনিবিবির নামানুসারে গ্রামের নাম রাখেন বিবিচিনি। এ ছাড়া এক গম্বুজবিশিষ্ট একটি মসজিদ নির্মাণ করে নামকরণ করেন ‘বিবিচিনি শাহী মসজিদ’। স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত আছে ভিন্নধর্মী অলৌকিক গল্পও। অনেকের দাবি, ১৯৯২ সালের আগ পর্যন্ত এটি ছিল ঘন জঙ্গলে ঘেরা পরিত্যক্ত একটি স্থাপনা। বাঘ, সাপসহ হিংস্র বন্যপ্রাণীর বিচরণভূমি হিসেবে পরিচিত এলাকাটিতে মানুষ খুব একটা যেত না। যে বা যারাই এটি প্রতিষ্ঠা করুক; সেটা হয়তো জিন বা পরীর মাধ্যমে করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ একে ‘গায়েবি মসজিদ’ বলেও অভিহিত করেন। এমনকি স্থানীয়দের অনেকে বিশ্বাস করেন, এটি রাতারাতি জেগে ওঠা অলৌকিক স্থাপনা। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯২ সালে বিবিচিনি এলাকার জনৈক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মসজিদটি সম্পর্কে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে জানান। এরপর এটির সংস্কারের উদ্যোগ নেয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ। সংস্কারের পর আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। সেই থেকে মসজিদটিকে গায়েবি মসজিদ বলে অনেকেই দেখতে আসেন। অনেকেই মোগল স্থাপনা হিসেবে জেনে এখানে নামাজ পড়ছেন আবার করছেন মানত। সরকারিভাবে কোনো পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় স্থানীয়দের সহযোগিতায় এবং দর্শনার্থীদের দানেই চলছে ইমাম ও মুয়াজ্জিনের বেতন। বিবিচিনি মসজিদ ঘুরে দেখা যায়, সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৪০ ফুট উঁচু টিলায় খারা সিঁড়ি বেয়ে উঠলেই চোখ জুড়িয়ে যাবে লালচে ইটের তৈরি প্রায় ২৫ ফুট উচ্চতার বর্গাকার মসজিদ দেখে। দেখতে ছোট হলেও দৈর্ঘ-প্রস্থ প্রায় ৩৩ থেকে ৪০ ফুট, দেওয়ালগুলো প্রায় ৬ ফুট চওড়া। এর উত্তর ও দক্ষিণ পাশে আছে খিলান আকৃতির প্রবেশপথ। বর্তমানের ইটের তুলনায় মসজিদের ইটের গঠন ও মাপ সম্পূর্ণ ভিন্ন, যা মোগল স্থাপত্যরীতির স্বাক্ষর বহন করে। আরও পড়ুনসুলতানি আমলের ঐতিহাসিক নিদর্শন মসজিদকুঁড় মসজিদের পেছনে আছে ব্যতিক্রমধর্মী ১৫-১৬ দৈর্ঘের একটি দীর্ঘ কবর। স্থানীয়রা জানান, সংস্কার কাজের সময় একটি প্রায় সাড়ে ৫ ফুট লম্বা পায়ের হাড় পাওয়ার কথাও শোনা যায়। যদিও এর সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। অনেকেই মনে করছেন, এটি হজরত শাহ নেয়ামত উল্লাহর (রহ.) মেয়ে চিনিবিবির কবর। সুউচ্চ টিলার বাইরে চারপাশে করা হয়েছে পাকা রাস্তা। মুসল্লিদের সুবিধার্থে করা হয়েছে অজুখানা ও বাথরুম। এ ছাড়া নারীদের জন্য করা হয়েছে আলাদা নামাজের ঘর। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে করা হয়েছে বিশ্রামাগার। তবে বিশ্রামাগারটি তালাবদ্ধ। স্থানীয়দের মতে, এটি শুধু প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জন্য ব্যবহার হয়। বিবিচিনি মসজিদকে গায়েবি মসজিদ বলে দাবি করে আব্দুল শুক্কুর মোল্লা নামের নিয়মিত মুসল্লি জাগো নিউজকে বলেন, ‘২০০ বছর আগের মুরুব্বিদের কাছে শুনেছি এখানে বাঘ-ভাল্লুক ছাড়া আর কিছুই ছিল না। হঠাৎ তারা জঙ্গলের মধ্যে এমন একটি মসজিদ দেখতে পান। এরপরে যারা ছিলেন; তারাও ভয়ে মসজিদের কাছে কখনো যেতেন না। আস্তে আস্তে মানুষ এটার ওপরে ওঠা শুরু করে। তখনো এটি জঙ্গল ছিল। মসজিদের ইটগুলো আমাদের অঞ্চলে দেখা যায় না। এমনকি একটি ইটের ওপরে কোনো নামও লেখা নেই। এই মসজিদ একটি গায়েবি মসজিদ, এটি জিন-পরী তৈরি করেছে।’ মির্জাগঞ্জ থেকে নামাজ পড়তে আসা রফিক মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘টিলার ওপরে উঠে মসজিদে ঢোকার পরেই একটি শীতল অনুভূতি হয়। আমি অনেক মসজিদে নামাজ পড়েছি কিন্তু এখানের মতো এমন অনুভূতি আর কোথাও পাইনি। এটি আল্লাহ তাআলার একটি নেয়ামত। এখানে এলে মনে হয়, যেন এখানেই থেকে যাই। এ ছাড়া এর যে নকশা এবং কারুকাজ এটিও আর কোথাও দেখিনি।’ সন্তানের সুস্থতার জন্য দোয়া চাইতে আসা বেতাগীর বাসিন্দা হালিমা জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখানে দোয়া চাইলে নাকি আল্লাহ তাআলা কবুল করেন। তাই আমিও দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে বলছিলাম, আল্লাহ যেন আমাকে একটি কন্যা সন্তান দেন। আল্লাহ আমার প্রতি মুখ তুলে তাকিয়েছেন। আমি আমার সন্তানকে নিয়ে এখানে আবারও এসেছি। দুই রাকাত নফল নামাজ পড়েছি। এ ছাড়া আমার অন্য সন্তানটি একটু অসুস্থ, ওর জন্য এখানে দোয়া চেয়ে গেছি।’ বরগুনা সদর উপজেলা থেকে আসা আল-আমিন হীরা অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘বরগুনার ঐতিহ্যবাহী বিবিচিনি শাহী মসজিদটি ইতিহাসের অংশ। রোজার দিনে জুমার নামাজ আদায় করার জন্য এসেছি। অনেক মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে নামাজ পড়তে আসেন। নামাজ পড়ে ভালোও লাগে। এখানে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব আছে বলে মনে হয়েছে। মসজিদটির পাশে দর্শনার্থীদের জন্য বিশ্রামাগার করা থাকলেও সেটি তালাবদ্ধ। এ ছাড়া খবর নিলাম, স্থাপনাটি রক্ষণাবেক্ষণে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কোনো দায়িত্বশীল নেই। মসজিদে অনেক জায়গায় ফাটল দেখেছি। যদি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এভাবে না থাকে, তবে এটিও কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাবে। আমাদের পরের প্রজন্ম কখনোই জানতে পারবে না।’ আরও পড়ুন৫০০ বছরের নীরব সাক্ষী বাঘা শাহী জামে মসজিদ বিবিচিনি শাহী মসজিদের ইমাম আবদুল মান্নান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি ২০ বছর ধরে এখানে ইমামতি করছি। বর্তমানে মসজিদের কিছু সংস্কার কাজ করা দরকার। সামনের মাঠটি পাকা করে নামাজের জন্য উপযোগী করা প্রয়োজন। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর থেকে মসজিদটি দেখভালের জন্য একজন ছিলেন; তিনিও এখন নেই।’ তিনি বলেন, ‘সভাপতি হিসেবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যতটুকু পারেন, করেন। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আইন অনুযায়ী কোনো কাজ তাদের অনুমতি ছাড়া করা সম্ভব নয়। তারাও মসজিদের মূল কাঠামো ছাড়া অন্য কোনো খোঁজখবর রাখেন না। আমরা এখনো বেতন ভাতা ও সরকারি কোনো পৃষ্ঠপোষকতা পাই না। সরকারের প্রতি অনুরোধ মসজিদের ভেতরে ও বাইরে সংস্কারের দিকে নজর দেওয়ার। যাতে মসজিদটি দর্শনার্থীদের কাছে আরও পরিচিত হয়ে ওঠে।’ এনএএ/এসইউ