টানা লোকসান আর অনিশ্চয়তার পর অবশেষে আশার আলো দেখছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের আখচাষিরা। কয়েক বছর আগেও উৎপাদন খরচ বেশি, ন্যায্য দাম না পাওয়া এবং বাজার সংকটের কারণে জেলার অনেক কৃষক আখচাষ থেকে সরে যেতে বাধ্য হন। সেই অবস্থার এখন পরিবর্তন এসেছে। আখ থেকে উৎপাদিত গুড় এখন শুধু ঐতিহ্যবাহী খাদ্যপণ্য নয়, বরং চিনির বিকল্প হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে জেলার আখশিল্প। উদ্যোক্তাদের মতে, স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের সংখ্যা বাড়ায় অনেকেই সাদা চিনির পরিবর্তে প্রাকৃতিক গুড়ের দিকে ঝুঁকছেন। চা, শরবত, পায়েস, মিষ্টান্নসহ নানা খাদ্যপণ্যে গুড়ের ব্যবহার বাড়ছে। এতে স্থানীয় উৎপাদনের পাশাপাশি বাড়ছে কর্মসংস্থানও। আখের রস জ্বালিয়ে ঝোলা গুড়, গুড়ের পাউডার ও পাটালি গুড় হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামের কৃষক নেফাউর রহমান গত ১৫ বছর ধরে আখচাষ করছেন। তিনি জানান, মাঝখানে কয়েক বছর টানা লোকসান হওয়ায় আখচাষ ছেড়ে দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন। তবে এ বছর দুই বিঘা জমিতে আখচাষ করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন। তার হিসাবে, সবকিছু ঠিক থাকলে এবার প্রায় ৫০ হাজার টাকা লাভ হবে। তিনি বলেন, ‘এবার ফলন ভালো হয়েছে, দামও ভালো। যদি এমন অবস্থা থাকে, তাহলে আবার আগের মতো আখচাষ বাড়াবো।’ শুধু নেফাউর রহমান নন, জেলার আরও অনেক কৃষকই একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, চলতি মৌসুমে প্রকৃতি যেন আখচাষিদের পক্ষেই ছিল। সময়মতো বৃষ্টি, অনুকূল আবহাওয়া এবং রোগবালাই তুলনামূলক কম থাকায় ফলন হয়েছে সন্তোষজনক। মাঠজুড়ে সবুজ আখের সমারোহ এখন গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন প্রাণসঞ্চার করছে। অনেক কৃষক নতুন করে আখচাষে আগ্রহী হচ্ছেন। স্থানীয় গুড় প্রস্তুতকারক আশিক আলী বলেন, ‘বাজার ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসায় গুড়ের চাহিদা বেড়েছে। আগে মূলত খোলা গুড়ই বেশি বিক্রি হতো। এখন মান নিয়ন্ত্রণ এবং আকর্ষণীয় প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে গুড় বাজারজাত করা হচ্ছে। বিশেষ করে পাউডার গুড় ও ঝোলা গুড় শহরের বাজারে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।’ বর্তমানে স্থানীয় বাজারে খোলা গুড় প্রতিকেজি ৮০-১০০ টাকায় বিক্রি হলেও প্রক্রিয়াজাত পাউডার বা ঝোলা গুড় বিক্রি হচ্ছে ৩০০-৪০০ টাকায়। মান, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিংয়ের কারণে দামের পার্থক্য হলেও ক্রেতাদের আগ্রহ কমছে না। বরং শহরকেন্দ্রিক বাজারে চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুনজের আলম মানিক জাগো নিউজকে বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, বাজার সম্প্রসারণ এবং উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ আখ ও গুড় শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। দেশের বিভিন্ন স্থানেই প্রক্রিয়াজাত গুড় বিক্রি হচ্ছে। দামও ভালো। এতে চাষিরা লাভবান হচ্ছেন।’ এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. ইয়াছিন আলী বলেন, আখচাষিদের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ, উন্নত জাতের আখ এবং প্রণোদনা সহায়তা দেওয়া হবে। এতে আগামী মৌসুমগুলোতে আখচাষ আরও বাড়বে। এসআর/এএসএম