৫৫ বছরেও উপেক্ষিত রংপুরের প্রথম শহীদ শংকুর পরিবার!

১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে ডাকা হরতালের মিছিলে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন কিশোর শংকু সমজদার। স্বাধীনতা সংগ্রামে রংপুর অঞ্চলের প্রথম এই শহীদের আত্মত্যাগ আজও মানুষের স্মৃতিতে অমলিন থাকলেও, ৫৫ বছর পরও তার পরিবারের আক্ষেপ ঘোচেনি।মঙ্গলবার (৩ মার্চ) ঐতিহাসিক এই দিনটি প্রতি বছর অনেকটা নীরবেই কেটে যায়, থাকে না তেমন কোনো বিশেষ আয়োজন। স্বজনদের দাবি, শংকুর মৃত্যুর দিনটি সরকারি উদ্যোগে পালন করা হোক। একইসঙ্গে তার স্মরণে একটি ম্যুরাল বা স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন তারা। শংকুজননী দীপালী সমজদারের তিন সন্তানের মধ্যে একমাত্র কন্যা ঝর্না ব্যানার্জি বর্তমানে বেঁচে আছেন। তিনি রংপুর নগরীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করছেন। তার অসুস্থ স্বামী, দুই ছেলেমেয়ে এবং প্রয়াত বড় ভাই কুমারেশ সমজদারের স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়েই এখন তাদের পরিবার। সেদিনের দুঃসহ স্মৃতি  ঝর্না ব্যানার্জি বলেন, ‘একাত্তরের ৩ মার্চ আমার ভাই শংকু সমজদার বড় ভাইয়ের হাত ধরে মিছিলে গিয়েছিল। তখন আমার বয়স চার-পাঁচ হবে। সেদিন ওই মিছিলে গিয়ে চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে শংকুর মৃত্যু হয়। আমরা তার মরদেহটাও দেখতে পারিনি। যে ভাইয়ের হাত ধরে শংকু মিছিলে গিয়েছিল, সেই বড় ভাই কুমারেশ সমজদার ২০২১ সালে আর মা মারা গেছেন ২০২৩ সালে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার মা মৃত্যুর আগপর্যন্ত চেয়েছিলেন ৩ মার্চ শংকুর স্মরণে দিনটি সরকারি বা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পালন করা হোক। তার দাবি ছিল একটি ম্যুরাল বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের।’ ভাইয়ের জন্য গর্ববোধ করে ঝর্না ব্যানার্জি বলেন, ‘আমার ভাই দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে শহীদ হয়েছেন, এটি আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। সরকার আমার ভাইকে শহীদের মর্যাদা দিয়েছে, কিন্তু সরকারি ভাতা দেয়নি। তবে জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশনসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা আমাদের বিভিন্ন সময়ে সহযোগিতা করেছে।’ তিনি জানান, ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের এক অনুষ্ঠানে সরকারি নির্দেশে ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় রংপুর জেলা প্রশাসন শংকুর স্মৃতি রক্ষায় নগরীর কামাল কাছনা এলাকায় ১০ শতক জমির দলিলপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে। ওই বাড়ির দেয়ালসহ দৃষ্টিনন্দন গেটে শংকুর স্মৃতিফলক করে দেয়া হয়েছে। আরও পড়ুন: রংপুরে জামায়াত জোটের ছক্কায় জাপার দুর্গ তছনছ প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় ৩ মার্চ  সেদিনের মিছিলে অংশ নেয়া প্রত্যক্ষদর্শী কবি ও সাংবাদিক নজরুল মৃধা বলেন, ‘আমিও ওই মিছিলে অংশ নিয়েছিলাম। আমাদের কিশোরদের কাজ ছিল রাস্তার পাশে বিভিন্ন বাসা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে উর্দু ও ইংরেজিতে লেখা সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলা। অবাঙালি সরফরাজ খানের বাসায় উর্দু লেখা সাইনবোর্ড ছিল। সেটি ভাঙার সময়েই সরফরাজ খানের বাসা থেকে গুলি করা হলে শংকুর মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়। এ সময় মুসলিম উদ্দিন (মুসলিম কমিশনার) লুটিয়ে পড়া শংকুকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়ার চেষ্টা করেন।’ একাত্তরের ৩ মার্চের উত্তাল দিনের স্মৃতিচারণ করে বীর মুক্তিযোদ্ধা সদরুল আলম দুলু বলেন, ‘৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ জয়ের পর সারাদেশের মতো রংপুরের মানুষও উদ্বেলিত হয়েছিল। ইয়াহিয়া খান একাত্তরের ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করলেও ১ মার্চ তা স্থগিতের ঘোষণায় বিক্ষোভে ফেটে পড়ে পূর্ব বাংলা। সারাদেশের মতো রংপুরেও বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। পাকিস্তানি দখলদারদের ষড়যন্ত্রের খপ্পর থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে ঐক্যবদ্ধ হয় রংপুরের মানুষ।’ মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক এই কমান্ডার আরও বলেন, ‘৩ মার্চ সকালে হরতালের সমর্থনে কাচারী বাজার এলাকা থেকে মিছিল বের হয়। সেই মিছিলে বড় ভাইয়ের হাত ধরে যোগ দেয় কৈলাশ রঞ্জন স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র শংকু সমজদার। মিছিলটি শহরের তেঁতুলতলা (বর্তমান শাপলা চত্বর) এলাকায় আসতেই কলেজ রোড থেকে কারমাইকেল কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি শহীদ মুখতার ইলাহি, জায়েদুল আলম, জিয়াউল হক সেবুসহ অন্যদের নেতৃত্বে আরেকটি মিছিল এসে যোগ দেয় মূল মিছিলের সঙ্গে।’ তিনি জানান, মিছিলটি আলমনগর এলাকার অবাঙালি ব্যবসায়ী সরফরাজ খানের বাসার সামনে যেতেই এক কিশোর ওই বাসার দেয়ালে একটি উর্দুতে লেখা সাইনবোর্ড দেখে তা নামিয়ে ফেলতে উদ্যত হয়। আর তখনই বাসার ভেতর থেকে মিছিলটি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। সেখানে গুলিবিদ্ধ হয় কিশোর শংকু। গুলিবিদ্ধ শংকুকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে মুসলিম উদ্দিন কমিশনার হাসপাতালের দিকে দৌড়ান। কিন্তু পথেই কিশোর শংকু মারা যায়। আরও পড়ুন: মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ নগরবাসী, পদক্ষেপ নেই রসিকের ক্ষোভের আগুনে উত্তাল রংপুর  সদরুল আলম দুলু বলেন, ‘কিশোর শংকুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষোভের আগুনে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে পুরো রংপুর। তার রক্তাক্ত নিথর দেহ দেখে জনতা উত্তেজিত হয়ে অবাঙালিদের দোকান ভাঙচুর ও রাস্তায় এনে অগ্নিসংযোগ করতে থাকে। যে বাড়ি থেকে গুলি ছোড়া হয়েছিল, সেখানে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করে উত্তেজিত জনতা। কিন্তু ইপিআর বাহিনী এসে বাধা দেয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘৩ মার্চের ওই ঘটনায় অবাঙালিদের হাতে আবুল কালাম আজাদ ও ওমর আলী নামে আরও দুজন শহীদ হন। সেদিন শরিফুল ইসলাম মকবুল ও মোহাম্মদ আলী নামে আরও দুজন গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। শরিফুল এক মাস হাসপাতালে থেকে মারা যান এবং মোহাম্মদ আলী বেঁচে যান। একই দিন বিকেলে ঢাকার মৌচাক মোড়ে শহীদ হন কলেজছাত্র ফারুক ইকবাল।’ স্বাধীনতা আন্দোলনে রংপুরের প্রথম শহীদ কিশোর শংকু সমজদারের মায়ের ইচ্ছা আজও পূরণ হয়নি; গড়ে ওঠেনি ম্যুরাল কিংবা স্মৃতিস্তম্ভ। তবে তার নামে রংপুরে একটি বেসরকারি বিদ্যাপীঠ রয়েছে। এদিকে, ঐতিহাসিক এই দিনটি পালনে মঙ্গলবার (৩ মার্চ) রংপুরে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন স্মরণসভার আয়োজন করেছে।