খ্যাতনামা মার্কিন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার টাকার কার্লসন দাবি করেছেন, সৌদি আরব ও কাতারের কর্তৃপক্ষ তাদের ভূখণ্ডে সক্রিয় কয়েকজন মোসাদ এজেন্টকে আটক করেছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ওই এজেন্টরা সংশ্লিষ্ট দেশটির সীমান্তের ভেতরে ‘ফলস ফ্লাগ’ হামলার পরিকল্পনা করছিল। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক আগ্রাসনের চতুর্থদিন আজ মঙ্গলবার (৩ মার্চ) নিজের ইউটিউব চ্যানেল টাকার কার্লসন নেটওয়ার্কে প্রচারিত এক ভিডিওতে এই বিস্ফোরক দাবি করেন তিনি।টাকার কার্লসনের মতে, এসব হামলা ছিল ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ তথা ছদ্মবেশী ধরনের, যার উদ্দেশ্য ছিল উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে প্ররোচিত করা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানের বিরুদ্ধে চলমান বিমান অভিযানের প্রেক্ষাপটে এই পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন। কার্লসনের ভাষ্য অনুযায়ী, রিয়াদ ও দোহারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে ওই ইসরাইলি এজেন্টদের আটক করেছে। তিনি এটিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন ইসরাইলি গোয়েন্দা তৎপরতার বিরুদ্ধে আরও দৃঢ় অবস্থান নিচ্ছে। তবে তার এ দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত সৌদি আরব, কাতার বা ইসরাইলের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ‘ইসরাইলকে নিয়ন্ত্রণ করুন’ ভিডিওতে ওয়াশিংটনকে উদ্দেশ্য করে কার্লসন বলেন, ইসরাইল সরকারকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়া উচিত যে তারা মার্কিন সিদ্ধান্তের ওপর খবরদারি করতে পারে না। তিনি মনে করেন, নেতানিয়াহুর নেয়া বিভিন্ন সামরিক সিদ্ধান্ত বর্তমানে আমেরিকানদের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এটি বৈশ্বিক ইতিহাসের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের সাবেক এই উপস্থাপক তার বক্তব্যে কোনো রাখঢাক না রেখেই বলেন, ‘দুঃখিত, এটি কোনো ইহুদিবিদ্বেষ নয়। এটি একজন রাষ্ট্রপ্রধানের বিষয় যার নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর কারণে আমেরিকানরা প্রাণ হারাচ্ছে এবং যা আমাদের দেশের ভাগ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে।’ আরও পড়ুন: কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের বিলিয়ন ডলারের রাডার ধ্বংসের দাবি ইরানের কার্লসন দাবি করেন, বর্তমান মার্কিন প্রশাসন ইসরায়েলের সব সিদ্ধান্তে সায় দিতে গিয়ে সবচেয়ে বড় মাশুল গুনছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ইসরায়েলি সরকারকে মুখের ওপর বলে দেওয়া যে, ‘আপনারা এখানে ক্ষমতায় নেই বা আপনারা আমাদের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করছেন না।’ নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত টাকার কার্লসন শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপের ঘোর বিরোধী। এমনকি ইরানে সম্ভাব্য হামলা থেকে ট্রাম্পকে বিরত রাখতে তিনি হোয়াইট হাউসে একাধিকবার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরমাণু ইস্যুতে ওয়াশিংটন-তেহরান পরোক্ষ আলোচনার মধ্যেই গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ইরানে যৌথ সামরিক আগ্রাসন শুরু করে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র। তেল আবিব এই অভিযানের নাম দিয়েছে ‘অপারেশন লায়নস রোর’। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নাম দিয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি।’ ইরানের রাজধানী তেহরানে চালানো হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা নিহত হন। ইরানি রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) থেকে ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা শুরুর পর থেকে দেশব্যাপী ৭৮০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আরও পড়ুন: ইরাকের কুর্দি নেতাদের সঙ্গে ফোনালাপ ট্রাম্পের, উদ্দেশ্য কী? জবাবে ‘অপারেশন ট্রু প্রোমিস ৪’ নামে পাল্টা হামলা শুরু করে ইরান। ইসরাইলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটিসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও ইরান উভয় পক্ষই ইঙ্গিত দিয়েছে, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। মার্কিন হাউস তথা প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসনসহ বেশ কয়েকজন মার্কিন নেতা ওয়াশিংটনের বর্তমান সামরিক পদক্ষেপকে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ হিসেবে সমর্থন দিয়েছেন। অন্যদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত সোমবার রাতে ফক্স নিউজকে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের নেতৃত্বের প্রশংসা করে বলেন, ‘ডনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতা। আমেরিকার জন্য যা সঠিক বলে তিনি মনে করেন, তিনি সেটাই করেন।’ নেতানিয়াহুর এই মন্তব্য কার্লসনের বক্তব্যের ঠিক বিপরীত মেরুর প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। কার্লসন মনে করেন, নেতানিয়াহু মূলত ট্রাম্পের নেতৃত্বকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুভ হবে না। তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর, বিবিসি ও তুর্কিয়ে টুডে