দক্ষিণ আফ্রিকা না নিউজিল্যান্ড: ফাইনালের টিকিট কার হাতে?

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের রোমাঞ্চ এখন সেমিফাইনালের মঞ্চে। কলকাতার ঐতিহাসিক ইডেন গার্ডেন্সে আজ প্রথম সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ড। এমন দুটি দল, যারা গত দুই দশকে ধারাবাহিকভাবে আইসিসি টুর্নামেন্টের নকআউটে পৌঁছালেও সীমিত ওভারের শিরোপা এখনো জিততে পারেনি। তাই এবারও তাদের লড়াই কেবল ফাইনালে ওঠার জন্য নয়, বরং দীর্ঘদিনের ট্রফি-খরার অবসান ঘটানোর লক্ষ্যেও। দক্ষিণ আফ্রিকার আইসিসি টুর্নামেন্টে হৃদয়ভাঙা ইতিহাস নতুন কিছু নয়। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ড গত দুই দশকে সবচেয়ে ধারাবাহিক সেমিফাইনালিস্টদের একটি; কিন্তু শেষ দুই ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্ত সাফল্য ধরা দেয়নি তাদের হাতেও। নিরপেক্ষ দর্শকদের কাছে তাই এই লড়াই বাড়তি আবেগের- দুটি ‘ভদ্র’ দল, যে কোনো একটিকে অন্তত ফাইনালে দেখতে চাইবেন সবাই। তবে এবারের আসরে স্পষ্ট ফেভারিট হিসেবে এগিয়ে আছে দক্ষিণ আফ্রিকা। পুরো টুর্নামেন্টে অপরাজিত তারা, গ্রুপ পর্বে নিউজিল্যান্ডকে বড় ব্যবধানে হারিয়েছে। ভারতের কন্ডিশনে সব ম্যাচ খেলায় তাদের পেস আক্রমণ দারুণ কার্যকর হয়েছে; অতিরিক্ত স্পিনের প্রয়োজন পড়েনি, যা তাদের শক্তির জায়গাকে আরও উজ্জ্বল করেছে। অধিনায়ক এইডেন মার্করাম ২৬৮ রান করেছেন ১৭৫ স্ট্রাইক রেটে- টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা ওপেনার তিনি। মিডল ও লোয়ার অর্ডারে ডিওয়াল্ড ব্রেভিস, ডেভিড মিলার, ট্রিস্টান স্টাবস ও মার্কো ইয়ানসেন- যেকোনো দলের জন্য ঈর্ষণীয় লাইনআপ। ইয়ানসেন, করবিন বোশ, কাগিসো রাবাদা ও লুঙ্গি এনগিদির পেস ভ্যারিয়েশন, সঙ্গে কেশব মহারাজের নিয়ন্ত্রিত স্পিন- সব মিলিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ও ভয়ংকর এক একাদশ। নিউজিল্যান্ডের যাত্রা তুলনামূলক কঠিন ছিল। গ্রুপ পর্বে আফগানিস্তান, কানাডা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে হারালেও সুপার এইটে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ পরিত্যক্ত এবং ইংল্যান্ডের কাছে হারের পর অন্য ফলের ওপর নির্ভর করতে হয় তাদের। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয়ে শেষ চারে জায়গা নিশ্চিত করলেও পথে ছিল বেশ কিছু চড়াই-উতরাই। ভারত থেকে শ্রীলঙ্কা, আবার ভারত- ভেন্যু বদলের সঙ্গে কৌশলও বদলাতে হয়েছে কিউইদের। কলকাতার তুলনামূলক ফ্ল্যাট উইকেটে স্পিন কমিয়ে আবার পেসের ওপর জোর দিতে পারে তারা। ফিন অ্যালেন ও টিম সেইফার্টের বিস্ফোরক ওপেনিং এবং অলরাউন্ডার-সমৃদ্ধ বোলিং বিকল্প তাদের বড় শক্তি। এই ম্যাচে নজরে যারা রাচিন রাবিন্দ্রা: গত বছর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সেঞ্চুরি করে ম্যাচের গতিপথ ঘুরিয়েছিলেন। এই আসরে তার ব্যাট এখনো পুরোপুরি জ্বলে ওঠেনি, তবে আইসিসি টুর্নামেন্টে বড় মঞ্চে পারফর্ম করার ইতিহাস রয়েছে তার। ইডেনের ব্যাটিং-সহায়ক উইকেটে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এইডেন মার্করাম: টুর্নামেন্টে প্রায় সব ব্যাটারকে ছাপিয়ে গেছেন প্রোটিয়া অধিনায়ক ও ওপেনার। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে ৪৪ বলে অপরাজিত ৮৬ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলেন তিনি। পাওয়ারপ্লেতে তার আকাশছোঁয়া শট বোলারদের জন্য দুঃস্বপ্ন। বড় মঞ্চে পারফর্ম করার মানসিক দৃঢ়তাও রয়েছে- গত বছর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে চতুর্থ ইনিংসে সেঞ্চুরি তার প্রমাণ। নিউজিল্যান্ডের ম্যাট হেনরি দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম উপলক্ষে দেশে গিয়েছিলেন, সেমিফাইনালের আগে কলকাতায় যোগ দিয়েছেন। স্পিন-সহায়ক কন্ডিশন না হলে ইশ সোধির জায়গায় জিমি নিশাম একাদশে ফিরতে পারেন। দক্ষিণ আফ্রিকার শীর্ষ সাত প্রায় নির্ধারিত। কলকাতার ফ্ল্যাট উইকেটে একজনের বেশি স্পিনার খেলানোর সম্ভাবনা কম। নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনার বলেন, ‘পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা ম্যাচ দেখা খুবই স্নায়ুচাপের ছিল। কয়েকজন সতীর্থ আমার রুমে ছিল, পরে আমি বের হয়ে যাই- চাপটা সহ্য করা কঠিন হচ্ছিল।’ এইডেন মার্করাম বলেন, ‘টেস্ট সিরিজ জয় আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। সাদা বলের দলে যারা ছিল না, তারাও দেখেছে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট ভালো পথে এগোচ্ছে। বিশ্বকাপের মঞ্চে থাকা এখন দারুণ সময়।’ সম্ভাব্য একাদশ নিউজিল্যান্ড: টিম সেইফার্ট, ফিন অ্যালেন, রাচিন রাবিন্দ্রা, গ্লেন ফিলিপস, মার্ক চ্যাপম্যান, ড্যারিল মিচেল, মিচেল স্যান্টনার (অধিনায়ক), কোল ম্যাককনচি/জ্যাকব ডাফি, জিমি নিশাম, ম্যাট হেনরি, লকি ফার্গুসন। দক্ষিণ আফ্রিকা: কুইন্টন ডি কক, এইডেন মার্করাম (অধিনায়ক), রায়ান রিকেলটন, ডিওয়াল্ড ব্রেভিস, ডেভিড মিলার, ট্রিস্টান স্টাবস, মার্কো ইয়ানসেন, করবিন বোশ, কাগিসো রাবাদা, কেশব মহারাজ, লুঙ্গি এনগিডি। পিচ ও আবহাওয়া সেমিফাইনালের জন্য ব্যবহৃত উইকেট কিছুটা গাঢ় রঙের, তাত্ত্বিকভাবে স্পিনে সহায়ক হতে পারে। তবে সন্ধ্যায় শিশির পড়ার সম্ভাবনা থাকায় টসের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হতে পারে। বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই, উষ্ণ আবহাওয়া প্রত্যাশিত। পরিসংখ্যান ও তথ্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা কখনো নিউজিল্যান্ডের কাছে হারেনি (৫ ম্যাচে ৫ জয়)। তবে আইসিসির ৫০ ওভারের নকআউট ম্যাচে কিউইদেরই আধিপত্য- এক কোয়ার্টার ফাইনাল ও দুই সেমিফাইনাল জয়। মার্করাম ৩২ রান দূরে এক আসরে ৩০০ রান স্পর্শ করার কীর্তি থেকে। মিচেল স্যান্টনারের টি-টোয়েন্টিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ইকোনমি ৮.৫৭, প্রতি ৫৪.৩৩ রানে একটি উইকেট—ফুল মেম্বার দলগুলোর বিপক্ষে তার সবচেয়ে কম কার্যকর পরিসংখ্যান। আইএইচএস/