ঘুমের ঘাটতি কি গ্যাস্ট্রিক সমস্যা বাড়ায়?

আজকের ব্যস্ত জীবনে পর্যাপ্ত ঘুম যেন বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। রাত জেগে কাজ, মোবাইল স্ক্রিনে দীর্ঘ সময় কাটানো কিংবা অনিয়মিত জীবনযাপন আজকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু অনেকেই খেয়াল করেন না, ঘুমের অভাব শুধু ক্লান্তি নয়, পেটের সমস্যাও বাড়িয়ে দিতে পারে। অম্বল, বুকজ্বালা, গ্যাস, পেট ফাঁপা এসব সমস্যার সঙ্গে ঘুমের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ঘুম ও হজমের সম্পর্ক কি? আমাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ নির্দিষ্ট ছন্দে কাজ করে, যাকে বলা হয় বায়োলজিক্যাল ক্লক। রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে এই ছন্দে ব্যাঘাত ঘটে। ফলে হজম প্রক্রিয়া, অ্যাসিড নিঃসরণ ও অন্ত্রের চলাচল সবকিছুই প্রভাবিত হয়। ঘুমের ঘাটতিতে শরীরে স্ট্রেস হরমোন (কর্টিসল) বেড়ে যায়। এই হরমোন পাকস্থলীতে অ্যাসিডের পরিমাণ বাড়াতে পারে, যার ফল হিসেবে দেখা দেয় বুকজ্বালা ও অম্বল। ছবি: ন্যাশনাল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এ.কে.এম. যোবায়ের বিশেষজ্ঞ কী বলছেন? ন্যাশনাল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এ.কে.এম. যোবায়ের বলেন, অনেক রোগীই শুধু খাবারকে দায়ী করেন, কিন্তু ঘুমের অভাবও গ্যাস্ট্রিক সমস্যার একটি বড় কারণ। নিয়মিত কম ঘুম হলে পাকস্থলীর অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হয়। তিনি আরও জানান, যাদের আগে থেকেই গ্যাস্ট্রিক, আলসার বা রিফ্লেক্সের সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে অনিদ্রা উপসর্গ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। অনিদ্রা ও রিফ্লেক্সের সম্পর্ক রাতে দেরিতে খাওয়া এবং খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়া এই অভ্যাস অনেকেরই আছে। এর সঙ্গে যদি ঘুমের ঘাটতি যুক্ত হয়, তাহলে রিফ্লেক্স বা অ্যাসিড উপরে উঠে আসার সমস্যা তীব্র হতে পারে। ডা. যোবায়ের বলেন, ঘুমের অভাবে শরীরের পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক সমন্বয় ব্যাহত হয়। খাদ্যনালীর নিচের ভালভ দুর্বল হলে অ্যাসিড উপরে উঠে এসে বুকজ্বালা তৈরি করে। আরও পড়ুন: রোজায় নারীর শরীর ও মাতৃত্ব, যা বলছেন বিশেষজ্ঞ টানা ভাজাপোড়া খেলে শরীরে যেসব পরিবর্তন হতে পারে গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মায়েদের গ্যাস্ট্রিক সমস্যা হলে করণীয় ঘুম কম হলে শুধু অম্বল নয়, পেট ফাঁপা, কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোমের (আইবিএস) উপসর্গও বাড়তে পারে। কারণ অন্ত্রের চলাচল অনেকটাই নির্ভর করে স্নায়ুতন্ত্র ও হরমোনের ওপর, যা ঘুমের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। কীভাবে ঘুম ঠিক রাখবেন? প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া শোবার আগে ভারী বা ঝাল খাবার এড়িয়ে চলা রাতের খাবার ঘুমের অন্তত ২-৩ ঘণ্টা আগে শেষ করা শোবার আগে মোবাইল ও স্ক্রিন ব্যবহার কমানো ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় সন্ধ্যার পর না খাওয়া ডা. যোবায়ের পরামর্শ দেন, প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে অন্তত ৭–৮ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। ঘুম ঠিক না থাকলে শুধু ওষুধে গ্যাস্ট্রিক পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন? যদি দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা ও তীব্র গ্যাস্ট্রিক উপসর্গ একসঙ্গে থাকে, যেমন- বারবার বুকজ্বালা, বমি, ওজন কমে যাওয়া বা গিলতে কষ্ট তাহলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। ঘুমের ঘাটতি শুধু মন-মেজাজ বা কর্মক্ষমতাকে নয়, হজম ও পাকস্থলীর স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। তাই গ্যাস্ট্রিক সমস্যাকে শুধুই খাবারের দোষ দিয়ে এড়িয়ে না গিয়ে জীবনযাপনের অভ্যাস, বিশেষ করে ঘুমের মান, গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি। জেএস/