মাত্র ৬২ বর্গমাইলের ছবির মতো এক দেশ, জানেন কোথায়?

অন্যরকম কোনো গন্তব্য, চোখ জুড়ানো কোনো জায়গা খুঁজলে আপনার খোঁজ শেষ হতে পারে এখানেই। এই অনন্য দেশের নাম লিশটেনস্টাইন। আল্পস পর্বতমালার কোলে অবস্থিত একটি ক্ষুদ্র ইউরোপীয় প্রিন্সিপ্যালিটি। বিমানবন্দর নেই, নিজস্ব মুদ্রা নেই তবুও অর্থনৈতিক শক্তি, সামাজিক স্থিতি ও সাংস্কৃতিক গৌরবে সমৃদ্ধ এই দেশ। ইউরোপের মানচিত্রে বুড়ো আঙুলের মতো ছোট এই দেশটি সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রিয়ার মাঝখানে অবস্থিত। আয়তন মাত্র ৬২ বর্গমাইল। বিশ্বের অন্যতম ক্ষুদ্র দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও বৈশিষ্ট্যে অনন্য। আয়তনে ছোট হলেও ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রায় এই দেশটি অনন্য। সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রিয়ার মাঝখানে অবস্থিত এই প্রিন্সিপ্যালিটি যেন আল্পসের কোলে লুকিয়ে থাকা এক রত্ন। নিজস্ব মুদ্রা না থাকলেও দেশটি অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী। এই দেশে যেতে হলে পর্যটকদের আগে সুইজারল্যান্ড বা অস্ট্রিয়ায় অবতরণ করতে হয়, তারপর সড়ক বা রেলপথে সীমান্ত পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় লিশটেনস্টাইনে। আয়তন অত্যন্ত ছোট হওয়ায় এখানে বিমানবন্দর নির্মাণ বাস্তবসম্মত নয়। তবে উন্নত সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী বড় শহরগুলোর সঙ্গে সরাসরি সংযোগ রয়েছে। ফলে বিমানবন্দর না থাকলেও যাতায়াতে বিশেষ অসুবিধা হয় না। আরও বিস্ময়ের বিষয়, দেশটি নিজস্ব মুদ্রা চালু করেনি। পরিবর্তে তারা সুইস ফ্রাঁ ব্যবহার করে। বিশ্বের অন্যতম স্থিতিশীল মুদ্রা ব্যবহারের ফলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সহজ হয়েছে। আলাদা মুদ্রানীতি বা মুদ্রাস্ফীতির চাপ সামলানোর প্রয়োজন পড়ে না। নিজস্ব বিমানবন্দর বা মুদ্রা না থাকলেও লিশটেনস্টাইন বিশ্বের ধনী দেশগুলোর অন্যতম। উৎপাদনশিল্প, ব্যাংকিং ও আর্থিক পরিষেবা খাত এখানে অত্যন্ত উন্নত। মাথাপিছু জিডিপি বহু বড় অর্থনীতিকেও ছাপিয়ে যায়। নিখুঁত যন্ত্রাংশ, ডেন্টাল পণ্য এবং উচ্চপ্রযুক্তির ধাতব সামগ্রী বিশ্বজুড়ে রপ্তানি হয়। পাশাপাশি আর্থিক খাত আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের আকর্ষণ করে। এখানে অপরাধের হার এতই কম যে অনেক সময় কারাগারের সেল খালি পড়ে থাকে। কখনো কখনো অন্য দেশ থেকে বন্দিদের আনা হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিকাঠামো বিশ্বমানের। জীবনযাত্রা অত্যন্ত নিরাপদ ও আরামদায়ক। সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রিয়ার মাঝখানে অবস্থিত এই দেশটি স্থলবেষ্টিত। সমুদ্র পর্যন্ত পৌঁছতে হলে অন্তত দু’টি দেশ পেরোতে হয় তাদের। তবুও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আপার রাইন উপত্যকায় অবস্থানের সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে শক্ত অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে লিশটেনস্টাইন। লিশটেনস্টাইনের খাবারে প্রতিবেশী সুইজারল্যান্ড বা অস্ট্রিয়ার প্রভাব স্পষ্ট। সবচেয়ে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোর একটি হলো কাস্কনোফ্লে, চিজ মিশ্রিত নরম পাস্তার মতো পদ, যার সঙ্গে সাধারণত ভাজা পেঁয়াজ পরিবেশন করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের সসেজ, ধীরে রান্না করা গরুর মাংস, আলুভিত্তিক পদ এবং স্থানীয় চিজ বেশ জনপ্রিয়। ডেজার্টে আপেল স্ট্রুডেল, পেস্ট্রি ও চকোলেটজাত খাবারের প্রাধান্য রয়েছে। স্থানীয় ওয়াইনও বিশেষভাবে পরিচিত, বিশেষ করে ভাডুজ অঞ্চলের আঙ্গুরক্ষেত থেকে উৎপাদিত সাদা ওয়াইন। লিশটেনস্টাইনের সবচেয়ে বড় জাতীয় উৎসব হলো ন্যাশনাল ডে, যা প্রতিবছর ১৫ আগস্ট উদযাপিত হয়। রাজধানী ভাডুজে রাজপ্রাসাদের সামনে সাধারণ মানুষ ও রাজপরিবার একত্রিত হয়ে উদ্‌যাপনে অংশ নেন। আতশবাজি, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত এই আয়োজনের মূল আকর্ষণ। শীতকালে বড়দিনের বাজার দেশটিকে এক স্বপ্নময় আবহে রূপ দেয়। কাঠের স্টল, হাতে তৈরি সামগ্রী, গরম পানীয় ও স্থানীয় খাবারে ভরে ওঠে শহর। এছাড়া আল্পাইন অঞ্চলের ঐতিহ্য অনুযায়ী লোকসংগীত, নৃত্য ও পোশাকের প্রদর্শনীও বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। লিশটেনস্টাইনের সংস্কৃতিতে জার্মানভাষী ইউরোপের প্রভাব প্রবল। সরকারি ভাষা জার্মান হলেও স্থানীয় উপভাষা প্রচলিত। রাজধানী ভাডুজে রয়েছে জাদুঘর, আর্ট গ্যালারি ও ঐতিহাসিক স্থাপনা। ছোট দেশ হলেও শিল্প ও ইতিহাস সংরক্ষণে তাদের যত্ন চোখে পড়ার মতো। আধুনিক শিল্পকর্মের পাশাপাশি মধ্যযুগীয় ঐতিহ্যও সমান গুরুত্ব পায়। দেশটির রাজনৈতিক কাঠামো সাংবিধানিক রাজতন্ত্র, যেখানে রাজপরিবার এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভাডুজ দুর্গ পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে দেশের ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে আছে। জনসংখ্যা কম হওয়ায় সামাজিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। অপরাধের হার অত্যন্ত কম, জীবনযাত্রা নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নত মানের। প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য শীতকালে স্কিইং এবং গ্রীষ্মে হাইকিং জনপ্রিয়। আল্পসের ঢালে ছোট ছোট গ্রামগুলোতে জীবনধারা শান্ত ও স্বস্তিদায়ক। আরও পড়ুনদেউলিয়ার পর বন্ধ হয়ে গেল ব্রিটিশদের সেই ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’জমাট বরফে রক্তধারা, ৫০ লাখ বছরের গোপন রহস্য কেএসকে