‘ক্ষমতার দুর্গ নয়, জনগণই দেশের সত্যিকার শক্তির উৎস’—অগ্নিঝরা মার্চের উত্তাল দিনগুলো যেন এ কথাকেই বারবার সত্য প্রমাণ করেছে। ১৯৭১ সালের ৫ মার্চসহ মার্চের প্রতিটি দিনই পরিণত হয়েছিল সংগ্রাম, প্রতিবাদ ও শপথের দিনে। টঙ্গীতে সেনাবাহিনীর গুলি, ক্ষোভের সঞ্চার সে দিন টঙ্গীতে সেনাবাহিনীর গুলিতে চারজন শ্রমিক নিহত ও বহুজন আহত হন বলে ‘৭১ এর দশমাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের জনসংযোগ কর্মকর্তা (স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়) রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সেনা অভিযানে নিরস্ত্র মানুষ, শ্রমিক, কৃষক ও ছাত্রদের হতাহতের খবর ছড়িয়ে পড়লে সর্বত্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়। ঢাকাসহ সারাদেশে প্রতিবাদ সভা, শোভাযাত্রা সন্ধ্যায় সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়, ঢাকায় সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে পরিস্থিতি ছিল টানটান উত্তেজনাপূর্ণ। শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে হরতালের পর ব্যাংক খোলা থাকে, আর জুমার নামাজ শেষে মসজিদে মসজিদে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকাসহ সারাদেশে প্রতিবাদ সভা ও শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। কবি-সাহিত্যিক ও শিক্ষকরা রাজপথে রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী লিখেছেন, বিভিন্ন জেলায় ‘স্বাধীন বাংলা’র পতাকা উত্তোলন করা হয়। বিকেলে কবি-সাহিত্যিক ও শিক্ষকরা মিছিল নিয়ে রাজপথে নামেন। শহীদ মিনারে আহমদ শরীফের নেতৃত্বে এক সভায় স্বাধীনতার শপথ গ্রহণ করা হয়। ঢাকায় ছাত্রলীগের উদ্যোগে লাঠি মিছিল বের হয়, যা আন্দোলনের তীব্রতাকে নতুন মাত্রা দেয়। এদিকে লাহোরে পূর্বাঞ্চলের আন্দোলনে নিহতদের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং দেশের সংহতির জন্য বিভিন্ন মসজিদে বিশেষ মোনাজাতের আয়োজন করা হয়। একই সময়ে রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান ভুট্টোর দীর্ঘ বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে পার্টির মুখপাত্র আবদুল হাফিজ পীরজাদা আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়াকে ‘অবাঞ্ছিত’ ও ‘অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেন। প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে শেখ মুজিবের প্রতিক্রিয়া রাজনৈতিক অঙ্গনে জল্পনা-কল্পনারও অবসান ঘটান শেখ মুজিবুর রহমান। বিদেশি বেতারে প্রচারিত ‘ভুট্টোর সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগিতে রাজি’—এমন সংবাদকে তিনি ‘কল্পনার ফানুস’ আখ্যায়িত করেন। অন্যদিকে, তখনকার ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমদ ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দান থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সরাসরি রিলে করার জন্য ঢাকা বেতার কেন্দ্রের প্রতি আহ্বান জানান। রাতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ এক বিবৃতিতে বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষের ওপর নির্বিচার গুলিবর্ষণ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। একই দিন অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল আসগর খান করাচি থেকে ঢাকায় এসে ধানমন্ডিতে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরিস্থিতি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল—আলোচনার আড়ালে চলছিল দমন-পীড়নের প্রস্তুতি। কিন্তু বাঙালি তখন উপলব্ধি করে ফেলেছে, জুলুমের অবসান ঘটিয়ে অধিকার আদায়ের সংগ্রাম আর পিছু হটার নয়। আন্দোলন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছিল সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিতে। তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও ১৯৭১ সালে প্রকাশিত সংবাদপত্র এমএএস/এমএমকে/এএমএ