শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব তীরে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার সোনাপুরা মৌজা এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী বন্দর শাহী মসজিদ। বিশাল আকৃতির এক গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদটি দূর থেকেই সবার নজর কাড়ে। গম্বুজের ঠিক মাঝখানে পদ্মফুলের মতো গোলাকৃতি একটি চূড়া, আর চার কোণে নকশাখচিত অষ্টভুজ আকৃতির দৃষ্টিনন্দন চারটি বুরুজ; যা মসজিদটির স্থাপত্যে এনে দিয়েছে অনন্য মহিমা।নিখুঁত কারুকাজের চারটি স্তম্ভের ওপর নির্মিত বুরুজগুলোর ওপরে রয়েছে চারটি ছত্রী। ইটের ওপর চুন-সুড়কির আস্তরণে নির্মিত এই মসজিদের ভেতর ও বাইরের খোদাই করা নকশাগুলো এখনও সুলতানি আমলের ইতিহাস বহন করছে। বিশেষ ধরনের ইট ও চুন-সুড়কি দিয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে নির্মাণ করা হয়েছিল মসজিদটি। ফলে শীতকালে ভেতরে গরম আর গ্রীষ্মকালে শীতল অনুভূত হতো।স্থাপত্য ও বর্তমান অবস্থাবর্গাকৃতির মসজিদটির ভেতরে প্রবেশের জন্য সামনে ও দু’পাশে মোট পাঁচটি দরজা রয়েছে। তবে কালের বিবর্তনে দরজার পাল্লাগুলো বিলীন হয়ে গেছে। সামনের স্তম্ভের মাঝখানে বেশ কিছু ইট খসে পড়ে গর্ত সৃষ্টি হয়েছে, যা যেকোনো সময় ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। এছাড়া সামনের দুপাশের দেয়ালের বিভিন্ন অংশে চুন-সুড়কি ও পলেস্তরা খসে পড়েছে।একসময় ইমাম ও মুয়াজ্জিনের স্থানের উপরে এবং পেছনের দিকে মুসুল্লিদের জন্য বড় আকারের দুটি ফ্যান স্থাপন করা ছিল। গম্বুজের মাঝখানে ঝুলতো বিশাল ঝাড়বাতি, আর মিম্বরের পাশে ছিল একটি দেয়াল ঘড়ি। আজ সেগুলোর কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। তবে রঙিন পাথরখচিত মিম্বর, সিঁড়ি এবং চারপাশে কোরআন শরীফ রাখার স্থানগুলো এখনও প্রায় ছয় শতাব্দীর ঐতিহ্য বহন করছে।আরও পড়ুন: ইতিহাস ও ঐতিহ্যের টানে মাদারীপুরের বড় মসজিদে মুসল্লিদের ভিড়মসজিদটির সামনের দেয়ালে কালো রঙের ব্যাসেল্ট পাথরের একটি শিলালিপি রয়েছে। আরবি হরফে নকশাখচিত ক্যালিগ্রাফিতে সেখানে নির্মাতা ও নির্মাণকাল সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য খোদাই করা আছে।ঐতিহ্যবাহী মসজিদের পাশেই নতুন কমপ্লেক্স। ছবি: সময় সংবাদইতিহাসের পাতা থেকেনতুন নির্মিত বন্দর কেন্দ্রীয় শাহী জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব হাফেজ মাওলানা মুফতি সালমান রফিকী জানান, শিলালিপির তথ্য অনুযায়ী সুলতান জালালউদ্দিন ফতেহ শাহ ইসলাম ধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে ১৪২৫ খ্রিষ্টাব্দে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। সে অনুযায়ী বর্তমানে এর বয়স ৬০১ বছর।মসজিদটি ৮২ শতাংশ জমির মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত হয়েছিল। সামনে অবশিষ্ট জায়গায় মুসুল্লিদের ওজু ও গোসলের জন্য খনন করা হয়েছিল বিশাল একটি পুকুর, যাতে রয়েছে শানবাঁধানো দুটি ঘাট। মসজিদটি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকলেও পুকুরটিতে এখনও স্থানীয়রা ওজু, গোসল ও গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করছেন।মসজিদের ভেতরে চার কাতারে একসঙ্গে অন্তত ৬০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারতেন।অবহেলা, দখল ও পুনর্জাগরণের স্বপ্ন১৯২০ সালের ২৬ নভেম্বর প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর মসজিদটিকে পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণ ঘোষণা করে। তবে দীর্ঘদিন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে এর পুরনো ঐতিহ্য ক্ষয়ে যেতে থাকে।স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ৩০ বছর আগেও এখানে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় হতো। পরবর্তীতে ভূমিদস্যুরা মাটি ফেলে অবৈধ স্থাপনা গড়ে তুললে মসজিদটি লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায়। মেঝে নিচু হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে কয়েক ফুট পানি জমে নামাজ আদায়ের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ফলে পাশেই নতুন একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয় এবং সেখানেই নামাজ আদায় শুরু হয়।মসজিদের ভেতরের কারুকাজ। ছবি: সময় সংবাদসম্প্রতি এলাকাবাসীর উদ্যোগে অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করা হয়েছে। শাহী মসজিদের সামনে সিঁড়ি নির্মাণসহ সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ শুরু হয়েছে। এতে পুরনো মসজিদে আবারও নামাজ আদায়ের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে অনেকের মধ্যে।আরও পড়ুন: মোগল স্থাপত্যের নিদর্শন মুড়াপাড়ার শাহী মসজিদবন্দর শাহী মসজিদ পঞ্চায়েত বিচার কমিটির প্রধান বিচারক মো. নুর হোসেন বলেন, ‘৬০০ বছরের প্রাচীন এই ঐতিহাসিক মসজিদ দেখতে এখনও দেশি-বিদেশি পর্যটকরা আসেন। এর নির্মাণশৈলী দেখে দর্শনার্থীরা মুগ্ধ হন। তাই মসজিদটিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুললে প্রচার-প্রসার বাড়ার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ের নতুন পথ সৃষ্টি হবে।’স্থানীয়দের দাবি, ঐতিহ্যের এই অনন্য নিদর্শন সংরক্ষণ ও পূর্ণাঙ্গ সংস্কারে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের কার্যকর উদ্যোগ জরুরি। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিকল্পিত উন্নয়ন হলে বন্দর শাহী মসজিদ হয়ে উঠতে পারে দেশের ঐতিহাসিক পর্যটন মানচিত্রের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।