এক সময় দেশের দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলকে ভূমিকম্পের তুলনামূলক কম ঝুঁকির এলাকা হিসেবে ধরা হতো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে খুলনাসহ আশপাশের জেলাগুলোতে একের পর এক ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভৌগোলিক বাস্তবতার পাশাপাশি দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।গত ২৭ ফেব্রুয়ারি দুপুর ২টার কিছু আগে ৫ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে দেশের দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চল। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরার আশাশুনি। কয়েক সেকেন্ডের এই কম্পনে খুলনা, যশোর, ঝিনাইদহসহ আশপাশের জেলাগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক মানুষ নিরাপত্তার জন্য ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তায় অবস্থান নেন। পরিসংখ্যান বলছে, গত এক মাসেই সাতক্ষীরায় দুটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে। এছাড়া স্বল্পমাত্রার আরও দুটি ভূমিকম্পের উৎস ছিল যশোরের মনিরামপুর ও ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ এলাকা। ফলে আগে তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলে ভূমিকম্পের প্রবণতা বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূ-তাত্ত্বিক বাস্তবতার কারণেই এই অঞ্চলে নতুন করে ভূমিকম্পের প্রবণতা দেখা দিতে পারে। খুলনা আবহাওয়া অফিসের সাবেক সহকারী আবহাওয়াবিদ আমিরুল আজাদ বলেন, ‘বাংলাদেশের পূর্ব প্রান্তে ভারতীয় প্লেট এবং পশ্চিম প্রান্তে থাকা অন্যান্য ভূতাত্ত্বিক প্লেটের পারস্পরিক চাপের প্রভাব পড়ছে দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলে। এই বিপরীতমুখী চাপের কারণে ভূগর্ভে শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে এবং তা সময়ে সময়ে ভূমিকম্পের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভূমিকম্পের উৎপত্তি সব সময় বড় কোনো ফাটলের ওপর নির্ভর করে না। অনেক সময় নতুন ক্ষুদ্র ফাটল তৈরি হতে পারে কিংবা আগে নিষ্ক্রিয় থাকা ফাটল পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। ফলে দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলে ভূমিকম্পের সংখ্যা বাড়ার বিষয়টি ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক সংকেত হিসেবেই দেখা উচিত।’আরও পড়ুন: স্বপ্নের উড়াল সড়কে পা দিচ্ছে খুলনাঝুঁকি বাড়ানোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ দ্রুত নগরায়ন। বিশেষ করে খুলনা শহরে গত দুই দশকে দ্রুত বেড়েছে বহুতল ভবনের সংখ্যা। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, গত ২৬ বছরে খুলনা শহরের জলাভূমি কমেছে প্রায় ১৭ শতাংশ এবং সবুজায়ন কমেছে প্রায় ১১ শতাংশ। একই সময়ে বসতি ও স্থাপনা বেড়েছে প্রায় ২৮ শতাংশ।খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. আশিকুর রহমান বলেন, ‘পরিকল্পিত নগরায়ন না হলে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ভবন নির্মাণের সময় ভূমিকম্প সহনশীল নকশা ও বিল্ডিং কোড যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। তদারকির ঘাটতির কারণে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার বা অননুমোদিত ভবন নির্মাণের ঘটনাও ঘটে।’ তার মতে, ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলায় এখনই সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। এজন্য বিস্তৃত ভূতাত্ত্বিক গবেষণা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানচিত্র প্রণয়ন, কঠোরভাবে বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন এবং নগর পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যদিকে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ) বলছে, তারা বিল্ডিং কোড মেনেই ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিচ্ছে। কেডিএ’র পরিকল্পনা কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ জানান, অনেক সময় ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা অনুসরণ না করার প্রবণতা দেখা যায়। তাই শুধু কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ নয়, নগরবাসীর সচেতন অংশগ্রহণও জরুরি। তিনি বলেন, ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় নির্মাণের শুরু থেকেই নিয়ম মেনে ভবন নির্মাণ করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত তদারকি জোরদার করা এবং নগরবাসীকে সচেতন করার উদ্যোগও বাড়ানো হচ্ছে। এদিকে আবহাওয়া অফিসের তথ্য বলছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে অনুভূত হওয়া স্বল্প ও মাঝারি মাত্রার মোট ৯টি ভূমিকম্পের মধ্যে ৪টির উৎপত্তিস্থল ছিল খুলনা অঞ্চলে। যা দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলে ভূমিকম্পের প্রবণতা বাড়ার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই যথাযথ গবেষণা, পরিকল্পিত নগরায়ন এবং কঠোরভাবে নির্মাণ বিধিমালা বাস্তবায়নের উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্প এ অঞ্চলের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।