সিয়াম সাধনার মাস রমজান। ধর্মীয় বিধান মেনে পবিত্র এই মাসে যখন সিয়াম সাধনা করছেন ইসলাম ধর্মাবলম্বী মুসলমানরা। তখন বেশি লাভের জন্য নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতার মাধ্যমে ভোক্তাদের জিম্মি করে মুনাফাখোর ব্যবসায়ীরা। এ দৃশ্য নতুন নয়। প্রায় প্রতি রমজানে বাজারে এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয় ভোক্তাদের।ব্যবসায়ীদের এমন আচরণ এক প্রকারের জুলুমের শামিল বলছেন ইসলামী চিন্তাবিদরা। তারা বলছেন- এমন জুলুমবাজদের জন্য কাল কেয়ামতে শাস্তি অপেক্ষা করছে। মানুষকে জিম্মি করে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফা কোনোভাবেই সমর্থন করে না ইসলাম।বৃহস্পতিবার (৩ মার্চ) দুপুর। গাইবান্ধা শহরের রেলগেট। রাস্তার পাশে সারিবদ্ধ দোকানগুলোতে থরে থরে সাজানো বাহারি ফলমূল। কমলা, মাল্টা, আঙুর, আপেলের পাশাপাশি ইফতারের অন্যতম অনুসঙ্গ খেজুরের ক্ষেত্রেও যে সরবরাহের ঘাটতি নেই, দোকানগুলোর চিত্র দেখলেই তা স্পষ্ট হওয়া যায়।অথচ রমজান শুরুর পরপরই বদলে যায় খেজুরসহ ফলমূলের বাজার দর। আগের মাসের তুলনায় পাইকারি পর্যায়ে প্রকারভেদে বেড়ে যায় দাম। সুরুজ মিয়া ৩৫ বছর ধরে ফলের ব্যবসা করছেন। বললেন, প্রতি রমজানে দাম বাড়ে। এবারও বেড়েছে। আরও পড়ুন: রংপুরে সারের সংকট দেখিয়ে কৃষকের পকেট কাটছে ব্যবসায়ীরাসুরুজ জানালেন, রমজানের আগে তারা সাফারি খেজুর পাইকারি কিনেছেন ৫শ’ টাকা কেজি। রমজান শুরুর পর কেজিতে সেই খেজুরের দাম বেড়েছে ১শ’ টাকা। এখন তাদের খুচরা বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে সাড়ে ৬শ’ টাকা। একইভাবে ৬শ’ টাকার জায়গায় মাশরুম কেজুর পাইকারিতে কিনতে হচ্ছে সাড়ে ৬শ’ একইভাবে সমপরিমাণ দাম বেড়েছে কালমী খেজুরেও। হালি প্রতি ৫ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে কলার দামও। সুরুজ বলছেন, প্রতি কেজি আপেলে ২০ থেকে ২৫, মালটায় ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে। সুরুজ বলছেন, পাইকারি পর্যায়ে বেশি দামে কিনতে হয় বলে, খুচরা বাজারেও তাদের বেশি দামে বিক্রি করতে হয়।ভোক্তারা বলছেন- চাহিদা অনুযায়ী বাজারে প্রায় সব জিনিসের যোগান স্বাভাবিক আছে। চাহিদা আর যোগান স্বাভাবিক থাকলে জিনিসপত্রের দামও স্বাভাবিক থাকার কথা। কিন্তু বাজারের এই সূত্র ভেঙে পবিত্র রমজান ঘিরে মূল্যস্ফীতির এই চাপ এখন নিয়তি বলেই মানতে হয়- জানালেন ভোক্তারা।শহরের হকার্স মার্কেটে কেনাকাটা করছিলেন, সদরের ভাটপাড়া গোপালপুর গ্রামের সোহেল রানা মণ্ডল মিথুন। বলছিলেন- রমজানে শরীরের জন্য পুষ্টিকর খাবার প্রয়োজন। কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষের সেই সাধ্য থাকে না। রমজান মানে ব্যবসায়ীদের উৎসব শুরু হয়। ব্যবসায়ীরা যেন, অপেক্ষায় থাকেন- কখন রমজান আসে আর কখন দাম বৃদ্ধি করা যায়। বিশ্বের অনেক দেশে রমজানে ভোক্তাদের বিভিন্ন পণ্যে ছাড় দেয়া হয়। আর এখানে পণ্য মজুত করে সিন্ডিকেট করা হয়। এটি এক প্রকার রেওয়াজে পরিণত হয়েছে যোগ করেন মিথুন।আরও পড়ুন: গাইবান্ধায় মসলা জাতীয় ফসল চাষে নতুন সম্ভাবনা, আগ্রহ বাড়ছে চাষিদেরএকই মার্কেটে দেখা হয়, প্রফেসর কলোনির বাসিন্দা মারুফ হোসেনের সঙ্গে। বিস্ময়ের সুরে বললেন, গত পরশু ১০ টাকায় লেবু কিনেছেন- আজ একই লেবুর দাম চাচ্ছে ১৫ টাকা। মারুফ জানালেন, রমজান এলে সবাই সাধারণ মানুষের পকেট কাটতে চায়। শুধু নিত্যপণ্য নয়- রাস্তায় রিকশা চালকও ভাড়া বেশি চায়। মানুষের পকেট কাটার দীর্ঘদিনের এই রেওয়াজ বন্ধ হওয়া দরকার।রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে কী বলছে ইসলাম। প্রশ্ন ছিল- শহরের হাফিজিয়া ফোরকানীয়া কওমি মাদ্রাসা ও এতিম খানার মুহ্তামীম, হাফেজ মাওলানা মানসুরুর রহমান খাঁনের কাছে। এই ইসলামী চিন্তাবিদ সময় সংবাদকে বলেন, ইসলাম মানবতার ধর্ম। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাইকে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে ইসলাম ধর্মে সুবিচার করতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, রমজান রহমত ও বরকতের মাস। এদেশে রমজান এলে বেশি মুনাফার আশায় ব্যবসায়ীরা সাধারণ জনগণকে জিম্মি করতে চায়। তারা অধিক হারে লাভ করতে চায়। এটা কোনোভাবেই শরিয়ত সমর্থন করে না, বলছিলেন মানসুরুর রহমান। তিনি বলেন, রমজানকে কেন্দ্র করে আরব দেশগুলোতে সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য অর্জনের জন্য তারা ভোক্তাদের জন্য ছাড় দেয় এবং মূল্যহ্রাস করে। যাতে সাধারণ মানুষ কষ্ট না পায়। মানসুরুর রহমান বলেন, পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ব্যবসায়ীদের ইনসাফ করতে বলেছেন। যে ব্যবসায়ীরা ভোক্তাদের সঙ্গে এই ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন, তারা কাল হাশরের মাঠে আরশের ছায়া পাবেন। আর যারা এর বিপরীতে মানুষকে জিম্মি করে অতিরিক্ত মুনাফা করবেন, ইসলামে তাদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান আছে- পুরষ্কারের বদলে তাদের তিরষ্কৃত হবেন। সাধারণ মানুষ যেন কোনোভাবেই বাজারে কষ্ট না পায় অবশ্যই সে বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সজাগ থাকতে হবে।হকার্স মার্কেটের টোটাল বাজারের মালিক ব্যবসায়ী তিতাস মণ্ডল সময় সংবাদকে বলেন, ‘এক মাসের ব্যবধানে গাইবান্ধায় পাইকারি পর্যায়ে কেজি প্রতি ছোলার দাম বেড়েছে ৫ থেকে ৬ টাকা, চিনিতে ২ টাকা, সোয়াবিন তেলের লিটার প্রতি ৬ টাকা, চিনি গুঁড়া চালের প্যাকেটে কেজি প্রতি বেড়েছে ২৩ টাকা পর্যন্ত। সরাসরি যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে।