তিন গম্বুজ নিয়ে প্রায় সাড়ে ৪০০ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে পাবনার চাটমোহরের শাহী মসজিদ। মোগল স্থাপত্যশৈলীর দৃষ্টিনন্দন ও ঐতিহাসিক হওয়ায় প্রতি ওয়াক্তে মুসল্লিরা ছুটে আসেন দূর-দূরান্ত থেকে। তথ্য বলছে, সম্রাট আকবরের শাসনামলে সৈয়দ আবুল ফতে মোহাম্মদ মাসুম খাঁর উদ্যোগ ও অর্থায়নে তারই সহোদর খাঁন মুহাম্মদ তকি খান ১৫৮১ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদটি নির্মাণ করেন। এর আগে মোগল সাম্রাজ্যের রাজা সুলতান হুসেন শাহের রাজত্বকালে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল থেকে স্থানান্তর হয়ে পাবনার চাটমোহরে আসেন মাসুম খাঁর বংশধরেরা। ১৫৫৫ খ্রিষ্টাব্দে এখানেই সৈয়দ আবুল ফতে মোহাম্মদ মাসুম খাঁ জন্মগ্রহণ করেন। এরপর দক্ষতা গুণে তিনি দিল্লির সম্রাট আকবরের অধীনে ৫ হাজার সৈন্যের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। পরে মাসুম খাঁ নিজেকে সুলতান ঘোষণা করেন। কিছুকালের জন্য পাবনা অঞ্চলে স্বাধীন সালতানাত প্রতিষ্ঠা করে চাটমোহরে রাজধানী স্থাপন করেন। একপর্যায়ে সম্রাট আকবর ইসলাম ধর্মের ওপর তেমন নিষ্ঠাবান ছিলেন না বলে অভিযোগ ওঠে। এ সময় কাকশাল গোত্র ও বাংলার বারো ভূঁইয়ারা সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় ধর্মভীরু মাসুম খাঁ ১৫৭৯ সালে বারো ভূঁইয়াদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে সম্রাট আকবরের থেকে বিচ্ছিন্ন হন। এ সময় থেকে ১৫৯৯ সালে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মারা যাওয়ার মধ্যকার সময় ১৫৮১ খ্রিষ্টাব্দে মাসুম খাঁ নিজ উদ্যোগ ও অর্থায়নে চাটমোহর পৌর এলাকার কাজিপাড়ায় মোগল স্থাপত্যশৈলীতে শাহী মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদটি মোগল সম্রাট আকবরেরও স্মৃতিধন্য। মসজিদ এলাকা ঘুরে দেখে মন জুড়িয়ে যায়। পাবনা-ভাঙ্গুড়া মহাসড়কের ভাদুনগর মোড় থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার উত্তরে চাটমোহর পৌর এলাকার উপজেলা পরিষদের পশ্চিমে অবস্থিত মসিজদটি। স্থানীয়ভাবে এটি কাজিপাড়া হিসেবে পরিচিত। ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদ এলাকায় যেতেই নজরে আসবে মসজিদের ঐতিহ্যখচিত নান্দনিক প্রধান ফটক। কারুকার্য করা গেটের পুরো অংশ লাল রঙের। আছে কিছু সাদা রঙের বর্ডার। গেটের সৌন্দর্য দূর-দূরান্ত থেকে আগতদের বেশি আকৃষ্ট করে। স্মৃতি ধরে রাখতে মসজিদে এসে গেট পেছনে রেখে ছবি তোলেননি, এমন দর্শনার্থী কমই আছে। মসজিদের গেটটি সারাদিনই খোলা থাকা। গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই নজরে আসবে তিন গম্বুজ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শাহী মসজিদে। ৬২ ফুট দৈর্ঘ ও ৩০ ফুট প্রস্থের মৃদু লাল রঙের মসজিদটি আজও ঐতিহ্য ও পবিত্রতার বার্তা ছড়াচ্ছে। ৬ ফুট ৯ ইঞ্চি চওড়া দেওয়াল ও লাল গম্বুজসহ পাতলা জাফরি ইটে নির্মিত মসজিদটির উচ্চতা প্রায় ৬২ ফুট। মূল মসজিদে প্রবেশপথ তিনটি। মসজিদে ঢুকে পশ্চিম দেওয়ালে দেখা মিলবে তিনটি মেহরাব। কেন্দ্রীয় মেহরাবের থেকে দুপাশের মেহরাবে আছে বড় সুরঙ্গের মতো অপূর্ব নিদর্শন। মসিজদের দেওয়ালজুড়ে আছে প্রাচীন ভাস্কর্য শিল্পের নিদর্শন। এসব নান্দনিকতায় আকৃষ্ট হন দর্শনার্থীরা। দর্শনার্থী হাবিব জাগো নিউজকে বলেন, ‘এটি শুধু একটি মসজিদ নয়। এটি পবিত্রতা ও ঐতিহ্যের স্মৃতিকথায় মোড়ানো নান্দনিক স্থাপনা। প্রধান ফটকের যে নান্দকিতা, তা দূর থেকেই আকৃষ্ট হওয়ার মতো। এ ছাড়া পুরো মসজিদই এক ধরনের মোগল সৌন্দর্যের স্মারক হয়ে আছে। এখানে এক ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা অনেকের কাছেই আকাঙ্ক্ষার।’ আরও পড়ুন৩৬৮ বছরের মোগল স্থাপত্যের নিদর্শন শাহ সুজা মসজিদ নির্মাণ ও সংশ্লিষ্ট ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা দিতে মসজিদের বাইরে স্থাপন করা হয়েছে চাটমোহর শাহী মসজিদের ইতিকথা ফলক। এতে বলা হয়েছে, আশির দশকের আগে মসজিদের গম্বুজ ও ছাদসহ বিভিন্ন অংশের ইট খসে পড়ায় জরুরি মেরামতের প্রয়োজন হয়। এরপর আশির দশকে মসজিদটিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতাধীন হিসেবে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে বিভিন্ন সময় সরকারিভাবে এর সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করা হয় বলেও ফলকে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে শাহী মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা কাজী আব্দুস সালাম বলেন, ‘সেসময় তিনটি গম্বুজসহ মসজিদের পুরো ছাদ ভেঙে পড়ে। তৎক্ষণাৎ দেখভাল বা মেরামতের কেউ না থাকায় স্থানীয়রা ওপরে টিন দিয়ে কোনোমতে নামাজ আদায় করতেন। পরে এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সেই পূর্বের আদলে সংস্কার করে। এরপর আর তেমন বড় সংস্কারের প্রয়োজন হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘মসজিদের সামনে একটি বড় কূপ আছে। বর্তমানে এটি বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে কালেমা খচিত একটি পাথর ছিল। পূর্বে অনেকেই কুসংস্কারবশত সেখানে ডিম, দুধ ও ডাবসহ বিভিন্ন কিছু মানত করতো। পরে সেটিকে সরিয়ে প্রধান ফটকের ওপরে স্থাপন করা হয়। কূপে আরেকটি কালো পাথর ছিল, সেটিকে রাজশাহীর বরেন্দ্র মিউজিয়ামে নেওয়া হয়েছে।’ মসজিদ এলাকা কাজিপাড়ায় আরও দুটি মসজিদ থাকলেও এখানেই বেশি ভিড় জমান মুসল্লিরা। এ ছাড়া প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মসজিদ দেখতে আসেন অনেকে, আদায় করেন নামাজও। মসজিদের মুয়াজ্জিন মো. ইফতেখারুর জিহাদ বলেন, ‘তিনটি কাতারে ৭০-৮০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। খোলা বারান্দায়ও দাঁড়ানোর সুযোগ আছে। নিয়মিত ভেতরে তিনটি পূর্ণ কাতার মুসল্লি হয়। এর মধ্যে পৌনে দুই কাতার স্থানীয়। কিছু লোক পাশেই উপজেলা পরিষদে কাজে আসা। বাকিরা ঐতিহ্যবাহী হিসেবে নামাজের জন্য বাইরে থেকে আসেন। উপজেলা পরিষদে মসজিদ থাকলেও এখানেই বেশি মানুষ আসে।’ আরও পড়ুন৫০০ বছরের নীরব সাক্ষী বাঘা শাহী জামে মসজিদ মামুন হোসেন নামের দর্শনার্থী জানান, এ রকম ঐতিহ্যবাহী একটি মসজিদে নামাজ আদায় করতে অবশ্যই যে কারোর অধিক ইচ্ছা কাজ করবে। তরুণ লেখক ও চাটমোহরের বাসিন্দা সুমন নুর বলেন, ‘মোগল আমলের এ মসজিদে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আছে। এ জনপদে মোগল শাসন বা কার্যক্রমের যে ইতিহাস আছে; সেটি জানার প্রতি মানুষের আগ্রহ আছে। এ ক্ষেত্রে প্রত্নতাত্ত্বিক এ নিদর্শন সংরক্ষণের পাশাপাশি একটি জাদুঘর স্থাপনে সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তাতে দর্শনার্থীরা বিমোহিত হওয়ার পাশাপাশি জ্ঞানেও সমৃদ্ধ হতে পারবেন।’ মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা কাজী আব্দুস সালাম বলেন, ‘২০০৮ সাল থেকে এ মসজিদে রমজানে খতম তারাবির নামাজ পড়াই। ২০১৬ সালের দিক থেকে পূর্ণাঙ্গ ইমামের দায়িত্ব পালন করছি। এখানে নামাজ পড়িয়ে একধরনের ভিন্ন প্রশান্তি বা শুকরিয়া অনুভব হয়। প্রতিদিন দূর-দূরান্তের মুসল্লিরাও আমার পেছনে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন।’ শাহী মসজিদের দায়িত্বে থাকা পুঠিয়া রাজবাড়ী জাদুঘরের অ্যাসিস্ট্যান্ট কাস্টোডিয়ান মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ‘চাটমোহরের শাহী মসজিদের বেশকিছু জায়গা দখল হয়ে আছে। এ নিয়ে আমাদের দপ্তর কাজ করছে। যেহেতু মসজিদটির সাথে মোগল সাম্রাজের ইতিহাস জড়িয়ে আছে; সেহেতু সেখানে একটি জাদুঘর স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। দখল ও অন্যান্য জটিলতা নিরসনের পর এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে।’ এএইচআইএন/এসইউ