প্রিমিয়ার লিগ বন্ধ, সিসিডিএম কর্তারা অসহায়, বিকার নেই বিসিবি সভাপতির!

শুনতে কানে লাগতে পারে। লাগবেও। একটা টেস্ট খেলুড়ে দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রধান আসর বলে বিবেচিত হবার কথা জাতীয় লিগের। কিন্তু কঠিন সত্য হলো, জাতীয় লিগ, বিসিএল এখনো বাংলাদেশের প্রধান ক্রিকেট আসর নয়। অনেকে বিপিএলের কথা বলবেন। কিন্তু একটা টেস্ট খেলুড়ে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামো তো আর বিপিএলের মত দ্বিতীয় শ্রেণীর টুর্নামেন্ট দিয়ে মাপা যায় না। কেউ কেউ হয়ত ভারতের আইপিএল আর অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশের উপমা টানবেন। তাদের জন্য বলা, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট স্ট্রাকচার অনেক সমৃদ্ধ, শক্তিশালী। রঞ্জি ট্রফি, দুলীপ ট্রফি, দেওধর ট্রফি খেলে ক্রিকেটাররা প্রচুর ম্যাচ ফি পান, যা বাংলাদেশের অনেক ক্রিকেটার বিপিএল খেলেও পান না। বাহ্যিক চাকচিক্য, জমকালো রূপ, বর্ণাঢ্য আয়োজনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বিপিএল দিনকে দিন একটা সাব-স্ট্যান্ডার্ড আসরে পরিণত হয়েছে। পার্থক্য একটাই, ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে কোনো বিদেশি ক্রিকেটার খেলেন না। আর বিপিএলে কিছু মাঝারি মানের বিদেশি খেলেন। আসলে গুরুত্ব, কার্যকারিতা, আকর্ষণ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর উৎসাহ-উদ্দীপনাকে মানদণ্ড ধরলে বাংলাদেশের প্রধান ক্রিকেট আসর হলো ঢাকা প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগ। এর মূল কারণ, এখনো বাংলাদেশের ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটের সেই কাঠামো গড়ে ওঠেনি। এই আসর শুধুই আকর্ষণের দিক থেকেই পেছনে নয়। বিসিএল আর এনসিএল খেলে এ দেশের ক্রিকেটাররা যে অর্থ পান, তার চেয়ে বহুগুণে অর্থ মেলে প্রিমিয়ার লিগে। তাই বাংলাদেশের শীর্ষ পর্যায়ের ২ শতাধিক ক্রিকেটার ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ খেলতে মুখিয়ে থাকেন। এর মধ্যে প্রায় ২৫-৩০ জন কিংবা তারও বেশি জাতীয় দলে খেলেন। কেউ কেউ আবার বিসিবি থেকে মাসিক বেতন পান। বিসিবির বেতন, জাতীয় দলে খেলে ম্যাচ ফি আর বোনাস মিলে একটা ভালো অর্থই পান। এর সঙ্গে অন্তত ৩০-৪০ জন ক্রিকেটার আছেন যারা জাতীয় লিগ খেলেও মাসোহারা পান, তার সাথে বিপিএলেও মোটামুটি চড়া মূল্যে বিক্রি হয়ে অর্থনৈতিকভাবে মোটামুটি স্বচ্ছল। কিন্তু অন্তত দেড় শতাধিক ক্রিকেটার আছেন যাদের রুটি-রুজিই হলো ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের প্রধান আসর প্রিমিয়ার লিগ। প্রায় শতাধিক ক্রিকেটারের সারা বছরের আয় এই প্রিমিয়ার লিগ। তাই বছরের এই সময়টায় মানে মার্চ-এপ্রিল সর্বোচ্চ মে মাসে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ মাঠে গড়ায়। ক্রিকেটাররা পছন্দের দল বেছে খেলেন। লিগ শেষে ষোল আনা না হলেও গড়পড়তা ৭৫ থেকে ৮০ ভাগ পেমেন্ট পেয়েও যান। আর তা দিয়েই প্রায় ১০০ ক্রিকেটারের সংসার চলে। কিন্তু হায়! মার্চ মাসের আজ ৭ তারিখ, কিন্তু প্রিমিয়ার লিগের কোনই খবর নেই। ক্রিকেটাররা জানেন না, এ বছর বিশেষ করে এই বোর্ডের অধীনে প্রিমিয়ার লিগ হবে কি, হবে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় রোজার মাসেই প্রিমিয়ার লিগ শুরু হয়। গত বছরও তাই হয়েছিল। এবার ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের আয়োজক সংস্থা সিসিডিএমের ক্যালেন্ডারে ছিল ফেব্রুয়ারির ১৫ ও ১৬ তারিখ—২ দিনব্যাপী দলবদল। আর মার্চ থেকে প্রিমিয়ার লিগ শুরু। কিন্তু বাস্তবে তার দেখা নেই। সেই নন্দিত ও দেশবরেণ্য সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের ভাষায়-কোথাও কেউ নেই। যাদের ওপর প্রিমিয়ার লিগ আয়োজনের দায়িত্ব, সেই সিসিডিএম কর্তারা নিশ্চুপ। কারণ বল তাদের কোর্টে নেই। কারণ বিসিবির নির্বাচনে অস্বচ্ছতা, বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল, সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূইয়া ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপরের মহলের হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে ঢাকার ৮০ ভাগ ক্লাব ওই নির্বাচন বয়কট করেছে। যে কারণে এবার তৃতীয় বিভাগ লিগ হয়নি। বিসিবি গাঁটের পয়সা খরচ করে দ্বিতীয় ও প্রথম বিভাগ লিগ অর্ধেকেরও কম দল নিয়ে কোনরকমে আয়োজন করলেও ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ আয়োজন করতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে। কারণ ২ থেকে ৩টি ক্লাব ছাড়া আর কোন ক্লাব আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বে বর্তমান বোর্ডের অধীনে লিগ খেলতে নারাজ। তারা বারংবার নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করেছে। ক্রিকেটের ১২ দলের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩টি দল হয়ত এই বোর্ডের অধীনে প্রিমিয়ার লিগ খেলতে রাজি হবে। কয়েক মাস আগে সিসিডিএম কর্তারা চেষ্টা করেও ক্লাবগুলোর কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া পায়নি। মোহামেডান, আবাহনীসহ বড় বড় ক্লাবগুলো সবাই এই বোর্ডের অধীনে লিগ খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্লাবগুলো আগের অবস্থানেই আছে। কাজেই ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের কোনো খবর নেই। এবং ধরেই নেয়া যায় এই বোর্ডের অধীনে এবার লিগ হবার সম্ভাবনা শূন্যের কোটায়। মাঝখানে বিসিবি নিজেদের অর্থায়নে জোড়াতালি দিয়ে ৩ দলের এক অদম্য টুর্নামেন্টের আয়োজন করেছে। তাতে ৪৫ জন ক্রিকেটার একটা মোটামুটি অর্থ পেয়েছেন। কিন্তু তাদের সবাই গড়পড়তা এর ঢের বেশি পেতেন প্রিমিয়ার লিগ খেলে। আর তার চেয়ে বড় কথা, ওই অদম্য টুর্নামেন্টে যারা ডাক পাননি, তারাই কিন্তু প্রিমিয়ার লিগের মূল অংশ। সেই শতাধিক ক্রিকেটারের ভাগ্যে কিন্তু প্রিমিয়ার লিগ না হলে একটি টাকাও জুটবে না। প্রশ্ন হচ্ছে, যে আসর খেলে শতাধিক ক্রিকেটারের সারা বছরের সংসার খরচ মেলে, সেই প্রিমিয়ার লিগ আয়োজন নিয়ে কি আদৌ বিসিবির কোনো উৎসাহ আছে? খোঁজ নিয়ে এবং সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে—না, নেই। যেহেতু ঢাকার সিংহভাগ ক্লাব নির্বাচন বয়কট করেছে। তাদের প্রতিনিধিরা ভোট দেননি। বোর্ড পরিচালক হতে পারেননি। তাদের কাছ থেকে কোনরকম সহযোগিতা এমনিতেও পাবার কথা না সিসিডিএমের। তাই তারা এখন ‘ঠুঁটো জগন্নাথ।’ কিন্তু বোর্ড সভাপতির তো একটা তাড়া থাকবে। তিনি নিজেও এই ঢাকা প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগের ফসল। এই আসর খেলে খেলেই নিজেকে মেলে ধরে জাতীয় দলে জায়গা পেয়ে তারকা হয়েছেন। অথচ নির্মম সত্য হলো, বিসিবির বর্তমান সভাপতি ঢাকা লিগ নিয়ে কোনই মাথাব্যথা নেই। কিংবা থাকলেও প্রিমিয়ার লিগ মাঠে গড়ানোর কোন কার্যকর উদ্যোগ তিনি নেননি। ক্লাবগুলো আসুক না আসুক, বিসিবি থেকে একটি চিঠি দিয়ে প্রিমিয়ার লিগ চালুর কোন উদ্যোগই নেয়া হয়নি। সিসিডিএম কর্তা ফায়েজুর রহমান মিতুর কণ্ঠে তাই অসহায় সুর—ভাই, কি করবো বলুন? তিন সপ্তাহ যাবৎ বিসিবি প্রেসিডেন্ট দেশে নেই। আমাকে এবং সিসিডিএম চেয়ারম্যান আদনান রহমান দীপনকে প্রিমিয়ার লিগ শুরুর উদ্যোগ নেয়ার কোন নির্দেশও তিনি দেননি। তাই আমরা কিছুই করতে পারছি না। করার মত অবস্থাও নেই। সিসিডিএমের দ্বিতীয় শীর্ষ কর্তার এই অসহায়ত্বই বলে দিচ্ছে, বিসিবির ভেতরের অবস্থা কী! এখন যে প্রিমিয়ার লিগ খেলা চলার কথা ছিল, তা মাঠে গড়ায়নি। ক্লাবগুলো রাজি না খেলতে। তাদের রাজি করানোর একটা চেষ্টা অন্তত করা দরকার, সেই অনুভবটুকু বোধ করছেন না বিসিবি প্রধান। দেশের ২ শতাধিক সেরা ক্রিকেটার যে এই রোজার মাসে প্রিমিয়ার লিগ খেলবেন—শেরে বাংলা আর বিকেএসপি মিলে তিন-চার মাঠে খেলা হতো। দেশের ক্রিকেট অনুরাগীরা বছরের এই সময় মেতে থাকেন ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ নিয়েই। তা বোধকরি মাথায়ই নেই বোর্ড সভাপতির। থাকলে তিনি অন্তত একটা শেষ চেষ্টা করতেন। হয়ত ক্লাবগুলোকে একটা আবেদন করতে পারতেন যে, বিসিবি নির্বাচন নিয়ে মতপার্থক্য, মতদ্বন্দ্ব থাকলেও ক্রিকেটারদের রুটি-রুজির কথা চিন্তা করেও ক্লাবগুলোকে প্রিমিয়ার লিগ খেলার আবেদন জানানো যেত। কিন্তু তার ধারে কাছে না গিয়ে তিনি দেশের বাইরে অস্ট্রেলিয়ায় পরিবারের সাথে সময় কাটাচ্ছেন। ক্লাবগুলোর বিপক্ষ অবস্থান থাকলেও বিসিবি প্রধান হিসেবে তারও একটা দায় আছে। সেটা থেকেই যাবে। বলেই দেয়া যায়, আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন এই বোর্ডের অধীনে আর এবার প্রিমিয়ার লিগ হচ্ছে না। ইতিহাসে কিন্তু সেটা অনেক বড় ব্যর্থতা হিসেবেই পরিগণিত হবে। যতই নারী বিভাগীয় ক্রিকেট হোক আর শীর্ষ ক্রিকেটারদের দিয়ে অদম্য টুর্নামেন্ট হোক না কেন, প্রিমিয়ার লিগ করতে না পারা হবে ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় দলিল। এআরবি/এমএমআর