মিলছে না লবণের ন্যায্য দাম, দিশেহারা কক্সবাজারের চাষিরা

চলতি মৌসুমের চার মাস পার হলেও কক্সবাজার উপকূলের লবণ চাষিদের জন্য এখনও নিশ্চিত হয়নি লবণের ন্যায্যমূল্য। সময় এখন মাত্র দুই থেকে আড়াই মাস বাকি থাকায় চাষিরা দিশেহারা। তাদের অভিযোগ, প্রতি মণ লবণে ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের চাষিরা আশা করছেন, নতুন সরকার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করবে।সরেজমিনে দেখা যায়, মাঠে বর্তমানে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় লবণ উৎপাদন চলছে, কিন্তু চাষিরা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। চৌফলদণ্ডী উপকূলের বাজারপাড়ার লবণ চাষি জিয়ার খান জানান, গত বছর তিন কানি জমিতে লবণ চাষ করে প্রায় দেড় লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। চলতি বছরও তিন কানি জমিতে লবণ মাঠ করলেও ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চরম হতাশায় দিন কাটছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা লবণের ন্যায্যমূল্য চাই। উৎপাদনে প্রতি মণ লবণের খরচ প্রায় ৪০০ টাকা, কিন্তু বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ২০০ টাকায়। এভাবে চলতে থাকলে লবণ চাষ টিকিয়ে রাখা খুবই কঠিন হবে।’ আরও পড়ুন: কাফনের কাপড় পরে রাস্তায় কেন লবণ চাষিরা? অন্য চাষি সিরাজুল ইসলাম বলেন, উৎপাদনে খরচ ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা হলেও বাজারে প্রতি মণ লবণ বিক্রি হচ্ছে ১৮০-২০০ টাকায়। খরচও ওঠে না, ফলে বড় ধরনের লোকসানে পড়ছি। চাষি সৈয়দ আলম বলেন, লবণের মাঠ করে এখন কোনো লাভ হচ্ছে না। টানা দুই বছর লোকসান। শুধু লবণ চাষ করে সংসার চালানো কঠিন। লবণের দামটা যদি একটু বাড়ত, তাহলে আমাদের মতো চাষিদের জন্য কিছুটা স্বস্তি হতো।   আরেক লবণ চাষি রিয়াদুল হক জানান, গত বছর এক বান্ডিল তেরপালের দাম ছিল প্রায় ৩ হাজার টাকা, এখন তা বেড়ে হয়েছে ৫ হাজার টাকা। শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে, তেলও এখন সহজে পাওয়া যায় না। টাকা দিয়েও অনেক সময় পাওয়া কঠিন হচ্ছে। এত খরচের পরও বর্তমানে প্রতি মণ লবণ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০০ টাকায়। এই দামে আমাদের খরচই ওঠে না। অন্তত ৪০০ টাকা মণ হলে আমরা কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারতাম। এদিকে নির্বাচনের আগে জনপ্রতিনিধিরা ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছিলেন। চাষিরা এখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছেন। চাষি নুরুল আলম বলেন, ‘আমরা বর্তমান সরকারের কাছে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন সাহেবের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি, যেন লবণ চাষিরা তাদের উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য পায়। আমাদের একটাই দাবি, লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হোক।’ আরেক চাষি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা অতি দ্রুত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন সাহেবের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, যাতে লবণ চাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হয়। কারণ বর্তমান অবস্থায় আমরা চাষিরা বাঁচতে পারছি না। বাজারে যেখানে এক প্যাকেট লবণের দাম প্রায় ৪০ টাকা, সেখানে আমাদের মাঠের লবণ কিনে নেয়া হচ্ছে মাত্র ৩ টাকায়। এভাবে চলতে থাকলে আমরা কীভাবে বাঁচব?’ আরও পড়ুন: লবণ শ্রমিকদের সঙ্গে সেলফিতে মেতেছেন সালাহউদ্দিন আহমদ তবে মাঠ পর্যায়ে লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন লবণ চাষি কল্যাণ সমিতির নেতারা। কক্সবাজার চেম্বারের সভাপতি ও লবণ চাষি কল্যাণ সমিতির উপদেষ্টা আবদুল শুক্কুর বলেন, কিছু ব্যবসায়ী বিদেশ থেকে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল সল্ট’ নামে লবণ আমদানি করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করছেন। অথচ এখন কক্সবাজারেই ধবধবে সাদা ও মানসম্মত লবণ উৎপাদন হচ্ছে। তবুও আমদানির কারণে স্থানীয় চাষিরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। এছাড়া ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির অপব্যবহারও বাজারকে প্রভাবিত করছে। অতি দ্রুত লবণ আমদানি বন্ধ করে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে চাষিদের রক্ষায় সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। লবণ শিল্পের উন্নয়ন কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক জাফর ইকবাল ভূঁইয়া বলেন, মৌসুমে চাষ কিছুটা দেরি হলেও এখন আবহাওয়া অনুকূলে। আশা করি উৎপাদন বাড়বে এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে। তবে এখনও সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। বিসিক জানিয়েছে, গত মৌসুমে ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে ২৫ লাখ ২৮ হাজার মেট্রিক টন লবণ উৎপাদন হয়েছিল। চলতি মৌসুমে ২৭ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও চার মাসে উৎপাদিত হয়েছে মাত্র ৪ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন।