নারী দিবস: প্রহসন নয়, ভারসাম্য চাই

কাজী মনজুর করিম, মিতুল এ বছরও নারী দিবসটা রমজানের মধ্যে পড়েছে। ফলে উদযাপনের ঘটা একটু কম হতে পারে। আমি মূলত নারী দিবস উদযাপনের পক্ষে নই, কারণ পুরুষ দিবস এখনো সেইভাবে উদযাপিত হয় না। কোনো করপোরেট অফিসে বা সরকারি পর্যায়ে আমি পুরুষের আত্মত্যাগের মহিমা বা দায়িত্বশীলতার গুরুত্ব নিয়ে কোনো আয়োজন অন্তত ১৯ নভেম্বর (আন্তর্জাতিক পুরুষ দিবস) হতে দেখিনি। গল্পের গরুকে গাছ থেকে এবার মাঠে নিয়ে আসা যাক। নারী দিবস মানেই চারদিকে লাল-নীল শাড়ি আর ফেসবুকে ‘নারী তুমি অনন্যা’ টাইপ স্ট্যাটাসের বন্যা। কিন্তু আসল চিত্রটা কী? চলুন একটু হাসতে হাসতে তেতো সত্যগুলো চিবিয়ে দেখা যাক। অদৃশ্য জাদুকর ও ঘরের কাজবাসার নারীরা হলো অনেকটা সেই ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’র মতো। তারা যখন কাজ করে, তখন কেউ তা দেখতে পায় না। কিন্তু যেই কাজটা করা বন্ধ করে দেয়, ওমনি পুরো পরিবার অন্ধ হয়ে যায়! সারাদিন ঘর মোছা, রান্না, কাপড় ধোয়া এগুলো যেন জাদুর মতো হয়ে যায়। বাড়ির পুরুষদের ভাবখানা এমন, ‘আরে, চা-টা তো এমনিতে নিজেই কাপে এসে জমা হলো, তাই না?’ সুপারওম্যান বনাম সোফা-ম্যানকর্মজীবী নারীদের অবস্থা আরও করুণ। তারা যেন মাল্টি-টাস্কিংয়ের অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন। অফিস সামলে বাসায় এসে যখন তারা দ্বিতীয় শিফটে ‘শেফ’ বা ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মী’র ভূমিকা নেয়, তখন পুরুষেরা সোফায় বসে রিমোট টিপতে টিপতে খুব গম্ভীর মুখে বলে, ‘আজকাল অফিসটা খুব প্রেশার দিচ্ছে, উফ!’ তারা জানে যে নারীরা বেশি খাটছে, কিন্তু এটা স্বীকার করলে যদি আবার চা-টা নিজেকেই বানিয়ে খেতে হয়! সেই ভয়ে তারা ডাহা মিথ্যাটা বেশ আয়েশ করেই চালিয়ে যায়। মেজাজ ও হরমোনের খেলানারীদের শারীরিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সমাজ যেন একটা ‘মিউজিয়াম’। সবাই জানে জিনিসটা আছে, কিন্তু কেউ ওটা নিয়ে কথা বলতে চায় না। বিশেষ করে পিরিয়ডের দিনগুলোতে যখন একজন নারীর মানসিক অবস্থা রোলারকোস্টারের মতো ওঠানামা করে, তখন পুরুষদের কমন ডায়ালগ- ‘শুধু শুধু কেন চিল্লাইতেছ?’ আরে ভাই, হরমোনের ঝড়ে যখন দুনিয়া ওলটপালট, তখন ওটাকে ‘ন্যাকামি’ বলে এড়িয়ে যাওয়াটা আমাদের জাতীয় স্বভাবে পরিণত হয়েছে। বাবার আদরের মেয়েযতই স্বামী, ভাই বা সন্তান থাকুক না কেন, দিনশেষে নারীর একমাত্র ‘সেফ এক্সিট’ বা আশ্রয় হলো তার বাবা। স্বামী হয়তো দাবি করে সে অনেক ভালোবাসে, কিন্তু বাবার মতো নিঃস্বার্থ মমতা? ওটা বোধহয় সোনার হরিণ। বাকি পুরুষরা যেখানে অধিকার আর দায়িত্বের হিসাব মেলায়, বাবা সেখানে শুধুই দুশ্চিন্তা আর অফুরন্ত প্রশ্রয়। ভোগবাদ বনাম মা-বোনআফসোস লাগে পৃথিবীর এই সিস্টেমটা দেখে। দেশ-কালের সীমানা পেরিয়ে সবখানে টাকাওয়ালা পুরুষদের কাছে নারী যেন লেটেস্ট মডেলের আইফোনের মতো কেনার বা ভোগ করার জিনিস। অথচ তারা ভুলে যায় ঘরে যে মা বা বোন আছে, তারাও এই নারী জাতিরই অংশ। অন্যের বোনকে ভোগ্যপণ্য ভাবার সময় নিজেদের মা-বোনের ‘মর্যাদা’ শব্দটা বোধহয় পকেটে লুকানো থাকে। কিছু নারী অবশ্য এ সমাজে বিরল নয়, যারা সুবিধা, প্রভাব আর ‘পজিশন’ পাওয়ার জন্য পুরুষকে প্রলুব্ধ করে। তারা পরস্পরকে ব্যবহার করে, একজন সিঁড়ি হিসেবে, অন্যজন খেলনা হিসেবে। মুদ্রার উল্টো পিঠ: পুরুষ নির্যাতন আইন কবে? ​তবে সব শেষে একটা ছোট টুইস্টও আছে। সব বাড়িতেই কিন্তু নারীরা নির্যাতিত নয়, কিছু কিছু বাড়িতে পুরুষেরা রীতিমতো পোষা বিড়ালটি হয়ে থাকে। বউয়ের শাসনে কাঁপাকাঁপা গলায় কথা বলা সেই সব পুরুষরা আবার বাইরে এসে বাঘ সাজে। সেই কৌতুকটা না বলে পারছি না: পুরুষেরা হলো স্প্লিট টাইপ এয়ার কুলারের মতো। আউটডোরে গর্জন, ইনডোরে গুঞ্জন। এর বিপরীত চিত্রটিও সত্য। অনেক পুরুষের উন্নতির পেছনে ভূমিকা রাখেন নারী। কখনো মা, কখনো বোন, কখনো প্রেমিকা, কখনো স্ত্রী, কখনো বা কন্যা। বিভিন্ন ভূমিকায় নারী এক অদৃশ্য শক্তি জোগায় পুরুষকে। পুরুষালী ‘ইগো’র কারণে অনেকে সেটা স্বীকার করতে কুণ্ঠাবোধ করেন। পরিশিষ্ট : প্রচেষ্টা ও প্রার্থনা ​নারী দিবস সার্থক হবে তখনই, যখন দায়িত্বের হবে সুষম বণ্টন আর পারস্পরিক সম্মান হবে অকৃত্রিম; যখন রাত-বিরাতের রাস্তায় নারী থাকবে নিরাপদ, বাসে বা পার্কে নারীর খোলা পিঠে হাত দেওয়ার আগে পুরুষের বুক কাঁপবে, হাত কাঁপবে। সেটা ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করে হতে পারে, হতে পারে সামাজিক ও পারিবারিক অবকাঠামোয় নারীর প্রতি সম্মান নিয়ে আরও বেশি বেশি আলোচনার মাধ্যমে। কিন্তু কেবল এক দিন নারীকে ফুল-চকলেট দিয়ে শিশু-ভোলানোর এই সংস্কৃতি আমাদের কিছুই দেবে না, এক প্রহসনের সান্ত্বনা ছাড়া। কাজী মনজুর করিম (মিতুল), প্রকৌশলী ও প্রাবন্ধিক। এমআরএম