মার্চের শুরু থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে চরম অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ঘনীভূত হওয়া ভূ-রাজনৈতিক সংকট, বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা তেলের সরবরাহ ব্যবস্থাকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা তেল সরবরাহ নিয়ে শঙ্কিত। বিশেষ করে বিশ্বের তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ বা নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা তেলের দামে উল্লম্ফন ঘটিয়েছে। যুদ্ধের কারণে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন এবং পরিবহন ব্যবস্থা বিঘ্নিত হতে পারে এমন উদ্বেগ থেকেই ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলার ছাড়িয়েছে । অস্থিরতার প্রভাবে কেবল তেলের বাজারই নয়, বরং জাপানের নিক্কেইসহ বিশ্বের বড় বড় শেয়ারবাজারেও ধস নেমেছে। বৈশ্বিক এই পরিস্থিতির প্রভাব বাংলাদেশের বাজারেও অনুভূত হচ্ছে। দেশে তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ নিয়ে নানামুখী গুজব ছড়িয়ে পড়ায় জ্বালানি তেলের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে । পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার বেশকিছু কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে: দেশে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট এড়াতে সরকার ৮ মার্চ ২০২৬ থেকে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যানবাহনে তেল বিক্রির সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দিয়েছে বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন), যাতে পাম্পগুলোতে অহেতুক ভিড় ও মজুত কমানো যায়। জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে যে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই এবং গুজব বা আতঙ্কিত হয়ে বাড়তি তেল মজুত না করার জন্য জনসাধারণের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হয়, তবে জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পাবে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়াবে। তবে কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেমন জেপি মরগান এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ দিকে সরবরাহ স্বাভাবিক হলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম গড়ে ৬০ ডলারের আশপাশে নেমে আসতে পারে। তেলের বাজারের এই অস্থিরতা কেবল কোনো নির্দিষ্ট দেশের সমস্যা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। অভ্যন্তরীণ বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকারের কঠোর তদারকি এবং সঠিক সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের দাবি। দুই. বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে ঘনীভূত হওয়া ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন আর মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজার টালমাটাল হয়ে পড়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় মার্চের শুরু থেকেই ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম লাফিয়ে বাড়ছে। আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এ সংকটের সরাসরি শিকার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং জনসাধারণের আতঙ্কিত হয়ে তেল মজুতের প্রবণতা কমাতে সরকার ৬ মার্চ ২০২৬ থেকে সারা দেশে তেলের ‘রেশনিং’ ব্যবস্থা চালু করেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সীমার বেশি তেল কোনো যানবাহন নিতে পারবে না। নির্ধারিত এই পরিসংখ্যান হলো: মোটরসাইকেল: প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২ লিটার। ব্যক্তিগত গাড়ি (কার): সর্বোচ্চ ১০ লিটার। লোকাল বাস ও পিকআপ: ৭০ থেকে ৮০ লিটার (ডিজেল)। দূরপাল্লার বাস ও ভারী ট্রাক: ২০০ থেকে ২২০ লিটার। প্রতিটি বিক্রির বিপরীতে এখন ক্যাশ মেমো সংগ্রহ করা এবং পরবর্তীবার তেল নেওয়ার সময় আগের রসিদ প্রদর্শন করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তেল বিক্রির এই সীমা নির্ধারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন পরিবহন শ্রমিকরা। রাজধানীর একটি লোকাল বাসের কন্ডাক্টর রহমত আলীর কণ্ঠে ঝরল সেই অসহায়ত্ব। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘ভাই, তেলের লিমিট করে দেওয়ায় দিন শেষে আমরাই মার খাচ্ছি। পাম্পে ২ ঘণ্টা সিরিয়াল দিয়ে ৮০ লিটার তেল পাই, যা দিয়ে তিন ট্রিপও ঠিকমতো চলে না। মালিক বলছে ট্রিপ কমলে আমাদের বেতন আর জমার টাকাও কমবে। আবার তেলের দাম বাড়ার কথা শুনে যাত্রীরাও আগের ভাড়া দিতে চাচ্ছে না। পেটের দায়ে গাড়ি নিয়ে নামি, কিন্তু দিন শেষে পকেটে টাকা থাকে না।’ তিন. রাস্তায় বের হলেই এখন দৃশ্যমান তেলের পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইন। বিশেষ করে রাইড শেয়ারিং অ্যাপের মোটরসাইকেল চালকদের জন্য দৈনিক ২ লিটার তেল কোনোভাবেই পর্যাপ্ত নয়। ফলে যেমন চালকদের আয় কমছে, তেমনি যাত্রীদের যাতায়াত ব্যয় ও ভোগান্তি কয়েকগুণ বেড়েছে। জীবনযাত্রার এই বাড়তি খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা। তেল বিক্রির এই সীমা নির্ধারণের ফলে রাস্তায় গণপরিবহনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অনেক বাস মালিক তেলের কোটা শেষ হওয়ার অজুহাতে গাড়ি বসিয়ে রাখছেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের পকেটে। তেলের সরবরাহ কম থাকায় অনেক রুটে অঘোষিতভাবে ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু যাতায়াত নয়, পণ্যবাহী ট্রাকের ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় কাঁচাবাজারের নিত্যপণ্যের দামও ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখন নাগালের বাইরে যাওয়ার উপক্রম। তেল বিক্রির এই সীমা নির্ধারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন পরিবহন শ্রমিকরা। রাজধানীর একটি লোকাল বাসের কন্ডাক্টর রহমত আলীর কণ্ঠে ঝরল সেই অসহায়ত্ব। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘ভাই, তেলের লিমিট করে দেওয়ায় দিন শেষে আমরাই মার খাচ্ছি। পাম্পে ২ ঘণ্টা সিরিয়াল দিয়ে ৮০ লিটার তেল পাই, যা দিয়ে তিন ট্রিপও ঠিকমতো চলে না। মালিক বলছে ট্রিপ কমলে আমাদের বেতন আর জমার টাকাও কমবে। আবার তেলের দাম বাড়ার কথা শুনে যাত্রীরাও আগের ভাড়া দিতে চাচ্ছে না। পেটের দায়ে গাড়ি নিয়ে নামি, কিন্তু দিন শেষে পকেটে টাকা থাকে না।’ জ্বালানির এই সংকটের ঢেউ ইতিমধ্যে আছড়ে পড়েছে কাঁচাবাজারেও। তেলের রেশনিং আর ট্রাক ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় সরাসরি এর প্রভাব পড়ছে নিত্যপণ্যের দামে। পাইকারি বাজারগুলোতে ট্রাকের সংখ্যা কম থাকায় সরবরাহ কমছে। ফলে সবজি থেকে শুরু করে চাল-ডাল— সবকিছুর দাম গড়ে ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখন নাগালের বাইরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ গতকাল শনিবার (৭ মার্চ) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। ৯ মার্চ দেশে আরও দুটি তেলবাহী জাহাজ আসছে। ফলে সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই।’ মন্ত্রী আরও বলেন, ‘পৃথিবীতে আজ যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে, তার প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই জ্বালানি খাতে উদ্বেগ তৈরি করেছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি ব্রিফ করেছি। তবে আগেও বলেছি, গতকালও বলেছি- তেল নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।’ জ্বালানি তেলের এই অস্থিরতা কেবল প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। রেশনিং ব্যবস্থা সাময়িক মজুত নিশ্চিত করতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে তা পরিবহন খাত ও বাজার ব্যবস্থা পঙ্গু করে দিতে পারে। সরকারের কাছে এখন সাধারণ মানুষের প্রাণের দাবি—পরিবহন ভাড়া ও নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করা। একই সাথে জ্বালানি আমদানির বিকল্প উৎস এবং সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক করার পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এ সংকট সাধারণ মানুষের জীবনে আরও ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।drharun.press@gmail.com এইচআর/এমএফএ/জেআইএম