জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসহ নানা কারণে দেশে কিডনি রোগের ঝুঁকি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে কিডনি বিকল হওয়া অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিশ্ব কিডনি দিবস-২০২৬ উপলক্ষে ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও কিডনি রোগ: ঝুঁকি ও করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন বক্তারা। শনিবার (৭ মার্চ) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে কিডনি এওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটি (ক্যাম্পস)। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ক্যাম্পসের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ। তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী কিডনি রোগ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে। বিশ্বে প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত, যা ডায়াবেটিস রোগীর তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ১৯৯০ সালে মৃত্যুর কারণ হিসেবে কিডনি রোগের অবস্থান ছিল ১৯তম, বর্তমানে তা সপ্তম স্থানে উঠে এসেছে এবং এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সালের মধ্যে এটি পঞ্চম স্থানে পৌঁছাতে পারে। ডা. এম এ সামাদ বলেন, বাংলাদেশেও কিডনি রোগ দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের কিডনি রোগে আক্রান্ত। প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার রোগী ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। শহর ও গ্রাম উভয় এলাকাতেই এই রোগ বিস্তার লাভ করছে। দারিদ্র্য, অসচেতনতা, চিকিৎসা সেবার সীমাবদ্ধতা এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এই সমস্যাকে আরও তীব্র করছে। অধ্যাপক সামাদ বলেন, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, সংক্রমণ, ভেজাল খাদ্য, কীটনাশকের ব্যবহার, তাপপ্রবাহ, লবণাক্ততা এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় তাপজনিত পানিশূন্যতা ও আকস্মিক কিডনি বিকলতার ঘটনাও বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১৪ থেকে ২২ শতাংশ কোনো না কোনো পর্যায়ের দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত। তবে সময়মতো রোগ শনাক্ত করা গেলে এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন করলে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে কিডনি বিকল হওয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব। বাংলাদেশ কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন-উর-রশিদ বলেন, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে কিডনি রোগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। অনেক মানুষ ঝুঁকি সম্পর্কে জানলেও নিয়মিত পরীক্ষা করান না। বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি এবং ডায়ালাইসিস সুবিধার প্রায় ৬৫ শতাংশ ঢাকাকেন্দ্রিক। তিনি জেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান নির্বাচক ও জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু বলেন, একটি পরিবারের একজন সদস্য কিডনি রোগে আক্রান্ত হলে পুরো পরিবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই প্রতিরোধ ও সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। গোলটেবিল বৈঠকে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব জোবায়দা বেগম, কবি ও সম্পাদক হাসান হাফিজ, এনসিডিসি লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন, পেডিয়াট্রিক নেফ্রোলজি সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. আফরোজা বেগমসহ বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন। বক্তারা বলেন, কিডনি রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া এবং এ বিষয়ে গণসচেতনতা বাড়ানোই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এসইউজে/এমএমকে