নিজেদের সুরক্ষার দায়িত্ব নারীরও আছে, পুরুষের ওপর সব চাপালে হবে না

বাংলাদেশের টেবিল টেনিসের রানি বলা হয় জোবেরা রহমান লিনুকে। টানা দুই যুগ দেশের টেবিল টেনিসে রাজত্ব করেছেন তিনি। নিজেকে অনেক উচ্চতায় নিয়েছিলেন ১৬ বার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়ে। জোবেরা রহমান লিনুর এই কীর্তি কেবল দেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না, নিজেকে নিয়েছেন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও। নাম লিখিয়েছেন গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে। ক্রীড়াক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য এ বছর লিনু স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন। দেশের অনেক নারী ক্রীড়াবিদের রোলমডেল তিনি। আজ ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়া এই তারকা ক্রীড়াবিদ ব্যক্তিগত কাজে এখন নিউজিল্যান্ড অবস্থান করছেন। বাংলাদেশে মেয়েদের খেলাধুলার সুযোগ, সম্ভাবনা এবং প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জোবেরা রহমান লিনু নারী দিবস উপলক্ষে সুদূর নিউজিল্যান্ড থেকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন জাগো নিউজকে। জাগো নিউজ: আপনি এবার স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন। অভিনন্দন।জোবেরা রহমান লিনু: আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। জাগো নিউজ: আপনি দেশের নারী ক্রীড়াবিদদের অন্যতম রোলমডেল। অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণা। নারী দিবস উপলক্ষে আপনার বার্তা কী থাকবে?জোবেরা রহমান লিনু: প্রথমেই আমি সবাইকে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শুভেচ্ছা জানাই। সবার কাছে আমার বার্তা হলো, ক্রীড়াঙ্গনের নারীরা যেমন আপন মর্যাদা নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেন; সেভাবেই নিজেদের তৈরি করতে হবে। জাগো নিউজ: নিজেদের সেভাবে তৈরি করতে গেলে তো আমাদের দেশে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে ক্রীড়াঙ্গনের মেয়েরা সেভাবে নিরাপদও বোধ করেন না। সেখানে তারা কিভাবে নিজেদের তৈরি করবেন?জোবেরা রহমান লিনু: চলার পথে প্রতিবন্ধকতা থাকবেই। আর নিরাপত্তার প্রশ্নে আমি বলবো, বিশ্বে এমন কোনো দেশ নেই যেখানে শতভাগ নিরাপত্তা থাকে। আর নিরাপত্তার জন্য নিজেদেরও সচেতন থাকতে হবে। আমি বলবো নিজেদের সুরক্ষা নিজেদেরই করতে হবে। শুধু পুরুষদের ওপর দোষ চাপিয়ে দিলেই হবে না। জাগো নিউজ: কিছুদিন আগেও দেশের নারীদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জিং সময় গেছে। আপনি কি মনে করেন গণতান্ত্রিক সরকার আসার পর নারীদেরও একটা স্বস্তির জায়গা তৈরি হয়েছে?জোবেরা রহমান লিনু: আমরা একটা কঠিন সময় অতিক্রম করে এসেছি। এখন আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে। যুব সমাজকে বুঝতে হবে, তারা দেশের ভবিষ্যত। মানে তারা যেটা বোঝেন, সেটাই ঠিক তা নয়। এমন কিছু করা যাবে না, যাতে দেশের ক্ষতি হয়। জাগো নিউজ: এ সময়ে নারীদের হেনস্থা হতেও দেখা গেছে। এ বিষয়ে কী বলবেন?জোবেরা রহমান লিনু: কেউ যদি অন্যায় করেন, কোনো ব্যক্তির আইনগত অধিকার নেই তাকে শাস্তি দেওয়ার। সমাজ ও আইন ব্যবস্থা নেবে। আর মেয়েদের পোষাক-আশাক তার ব্যক্তিগত বিষয়। কারো পছন্দ না হলে এড়িয়ে যেতে পারেন। নিজের চোখকে সুরক্ষা দিয়ে রাখতে পারেন। তাই বলে কিছু বলার অধিকার নেই। জাগো নিউজ: অনেকে সমঅধিকারের কথা বলেন। নারী ও পুরুষের কতটা সমতা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?জোবেরা রহমান লিনু: সমঅধিকার মানে কিন্তু বিশৃঙ্খলা নয়। কোনো নারী যদি মনে করেন, পুরুষরা রাত ২ টা পর্যন্ত ঘরের বাইরে থাকলে তিনি পারবেন না কেন? তা কিন্তু হবে না। কারণ তাহলে ওই নারী নিজের ভুলেই বিপদে পড়তে পারেন। তাই নিজের সুরক্ষার প্রতি নিজেরও দায়িত্ব আছে। অনেক নারী বিপদে পড়ার পেছনে নিজেরাই দায়ী থাকেন। অন্যকে শুধু দোষ দিয়ে লাভ নেই। জাগো নিউজ: বিএনপি সরকারের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক ঘোষণা দিয়েছেন, জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের বেতনের ব্যবস্থা করবেন। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে আপনি কিভাবে দেখছেন?জোবেরা রহমান লিনু: দেখেন, আমাদের অনেক মেয়ে ক্রীড়াবিদ আছেন যাদের জন্য ৫-১০ হাজার টাকা অনেক কিছু। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী যে ঘোষণা দিয়েছেন সেটা বাস্তবায়ন করতে পারলে ভালো। এতে মেয়েরা খেলাধুলায় আরো বেশি আগ্রহী হবে। আমি মনে করি, এই বেতন দেওয়ার পাশাপাশি ক্রীড়াবিদদের যোগ্যতা অনুসারে চাকরির ব্যবস্থা করতে পারলে আরো ভালো হবে। জাগো নিউজ: দীর্ঘদিন খেলেছেন। এখন সংগঠক। খুব কাছ থেকে দেশে নারীদের খেলাধুলা পর্যবেক্ষণ করেন। দেশে নারীদের খেলাধুলার সম্ভাবনা নিয়ে কিছু বলুন। জোবেরা রহমান লিনু: প্রথমই বলবো, গত কয়েক বছর ধরে খেলাধুলায় আমাদের মেয়েরাই ভালো করছে ছেলেদের চেয়ে। তার অর্থ মেয়েরা এগিয়ে যাচ্ছেন খেলাধুলায়। তবে সবকিছুতেই ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। আরেকটি বিষয় হলো, কেউ একটু ভালো করলে তাকে এমনভাবে মাথায় তোলা হয় যে অর্জনটা আর ধরে রাখতে পারেন না। দেখতে হবে তার পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা কেমন। জাগো নিউজ: আপনি কি মনে করেন, খেলাধুলায় ছেলে-মেয়েরা সমান সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন?জোবেরা রহমান লিনু: না। সেটা পাচ্ছে না। এত বছর পরও ক্রীড়াঙ্গনে নারীরা অবহেলিত, বৈষম্যের শিকার। একটু খেয়াল করলে দেখবেন ছেলেদের খেলায় যে পরিমাণ প্রাইজমানি দেয়া হয়, মেয়েদের খেলায় তার চেয়ে অনেক কম। জাগো নিউজ: মেয়েদের খেলাধুলায় আর কী সমস্যা দেখছেন?জোবেরা রহমান লিনু: বৈষম্য দূর করতে হবে। সব খেলাতেই পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে। তাহলে অনেক মেয়েরা আসবেন। আগেই বলেছি, মেয়েদের খেলাধুলায় টানতে হলে তাদের একটা চাকরির নিশ্চয়তাও দিতে হবে। খেললে ভালো চাকরি পাওয়া যাবে-মেয়েদের মধ্যে যখন এ বিশ্বাস জন্ম নেবে তখন সব শ্রেণি থেকেই খেলাধুলায় আসতে থাকবে। জাগো নিউজ: আপনি বলছেন এখন বেশিরভাগ মেয়েই আসছে গ্রাম আর মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে। কিন্তু এখনতো এটাও দেখা যায় অনেক উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়েরা গাড়িতে করে খেলতে আসে।জোবেরা রহমান লিনু: তা আসে। তবে সেটা নির্দিষ্ট একটা সময়ের জন্য। তারা কিন্তু খেলায় লেগে থাকে না। অনেকে শখে আসে, আবার চলে যায়। এ ধরনের মেয়েদেরও খেলায় আনতে হবে। জাগো নিউজ: এখন তো অনেক শিক্ষিত মেয়ে বিভিন্ন খেলায় আসছে। এটা তো অবশ্যই ভালো দিক।জোবেরা রহমান লিনু: শিক্ষিত মেয়েরা যতো বেশি খেলাধুলায় আসবে, ততই খেলার উন্নতি ঘটবে। বিদেশে আমাদের মেয়েদের নিয়ে ধারণাও বদলে যাবে। জাগো নিউজ: নতুন প্রজন্মের নারী খেলোয়াড়দের প্রতি আপনার উপদেশ কী থাকবে?জোবেরা রহমান লিনু: খুবই সহজেই কেউ যেন নিজেকে বড় তারকা ভাবতে শুরু না করে। তাহলে পারফরম্যান্স ধরে রাখতে পারবে না। অনেকে একটা অর্জনের পর মনে করে বিশাল কিছু করে ফেলেছি। এ মানসিকতা পরিহার করতে হবে। পা সব সময় মাটিতেই রাখতে হবে। সুনাম অর্জন করলে তা আপনা আপনিই চারিদিকে ছড়িয়ে পড়বে। নিজের গুণগান নিজের গাইতে হবে না। আমার কথা তারকা হও, তারকা সেজো না। জাগো নিউজ: সুদূর নিউজিল্যান্ড থেকে সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।জোবেরা রহমান লিনু: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। আরআই/এমএমআর/জেআইএম