শৈশব থেকেই আঁকাআঁকির ঝোঁক। ছবির সঙ্গেই ভালোবাসা। এ ভালোবাসা কর্মের মধ্যে লালন করার প্রত্যাশা নিয়ে ভবিষ্যৎ পেশা নির্ধারণ করেছিলেন ফারজানা ইসলাম মৌরি। তার পাঁচ বছর বয়সী প্রতিষ্ঠান ‘ক্রাফটিমেশন’ এখন একটি সফলতার গল্প। স্বপ্ন-ভালোবাসাকে সফলতায় রূপ দিতে তাকে হাঁটতে হয়েছে কঠিন, সংগ্রামী পথ। জাগো নিউজকে নিজের সে গল্প শোনাচ্ছিলেন মৌরি। শুরুর গল্প পারিবারিকভাবে মৌরির পায়ের তলার মাটি তখন বেশ শক্তপোক্ত। পড়েছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ-এমবিএ। পড়াশোনা শেষের ঠিক বছরখানেক আগে মাথায় চেপে বসে উদ্যোক্তা হওয়ার নেশা। ওই কাজের মধ্যে আঁকাআঁকির ভালোবাসার মিশ্রণ রাখতে চান তিনি। শুরু করেন হস্তশিল্প। তবে বাধ সাধে পরিবার। এত পড়িয়ে এই হস্তশিল্পের কাজ! শুরুতে ভালোভাবে নেয়নি কেউ। কিন্তু মৌরিও নাছোড়বান্দা। রাতে যখন সবাই খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন, তিনি বসে যেতেন সাজ-সরঞ্জাম নিয়ে। নিজের বাসার ডাইনিং টেবিল তখন তার কারখানা। নিজের রুম হচ্ছে গোডাউন। সারারাত একা একা পণ্য বানিয়ে দিনভর ল্যাপটপে ফেসবুক পেজে সেটা বিপণন। এভাবেই চলছে। শুরুতে বানিয়েছিলেন গুনা দিয়ে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে একটি গাছের আকৃতির ল্যাম্প। সেটা যখন বিক্রির জন্য ফেসবুক পেজে পোস্ট দিয়েছিলেন, প্রথম দিনই ভালো সাড়া পান। ওই সময়ই বুঝেছেন- চেষ্টা করলে অবশ্যই এ খাতের সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে। যদিও পরে ভালো অবস্থায় আসার পেছনে এক দীর্ঘ সংগ্রাম আছে তার। লড়াইটা যেমন ছিল ২০২১ সালে যখন হস্তশিল্প শুরুর একবছর, তখন মৌরির এমবিএ শেষ। শুরু হয় পরিবার থেকে ভিন্ন কোনো চাকরিতে যাওয়ার তাগাদা। বাবা-মাসহ অভিভাবকরা বলতেন, এসব কেন করছ? এমবিএ করে হস্তশিল্প করবে, ব্যাংকে চেষ্টা করো ভালো চাকরি পাবে। তোমার জীবন নষ্ট হচ্ছে। কোনো কিছুতে কান না দিয়ে মৌরি তখন কাজগুলো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে শুরু করলো। যাত্রা শুরু করলো ‘ক্রাফটিমেশন’। কিছু পণ্যের সঙ্গে মগ নিয়ে দুই বছর কাজ করেছেন তিনি। থ্রিডি মগ, নিজস্ব ক্লে দিয়ে নকশা করা নানা ধরনের মগ। এমন হয়েছে যে, একটা মেলায় অংশ নিয়ে মৌরি পুরো স্টল মগ দিয়ে ভরিয়েছেন। কিন্তু সবকিছু একা করতে গিয়ে রাত-দিন প্রায় ২০ ঘণ্টা খাটতেন তিনি। আরও পড়ুন নারী উদ্যোক্তা তৈরির ‘উদ্যোক্তা’ ফাহমিদা নিজামযেভাবে সফল নারী উদ্যোক্তা হলেন মনিরানারী উদ্যোক্তা হওয়ার অনুকূল পরিবেশ অনুপস্থিত মৌরির ভাষ্য, তখন ইনকাম খুব কম, কিন্তু আত্মতৃপ্তি এটাই যে অন্য মানুষের কাজ করছি না, নিজের জন্য কিছু করছি। ভালোবাসার কাজ করছি। ছোটবেলার চিত্রশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন পূরণ না হলেও একই ধরনের সৃজনশীল কাজের মধ্যে আছি। কিন্তু কাজের এত চাপ, তারপরও শুরুতে কয়েক বছর কাউকে চাকরিতে রাখতে পারিনি। কারণ কাউকে দেওয়ার মতো টাকা আমার কাছে নেই। নিজে রাত-দিন এক করে পরিশ্রম করছি শুরুর দিকে। এটা ঠিক, আমার মতো সচ্ছল পরিবারের অন্য কোনো মেয়েকে হয়তো এত সংগ্রামের মধ্যে যেতে হয়নি। কিন্তু আমি নিজস্ব একটি পরিচিতির জন্য ওই লড়াই একাই লড়ে যাচ্ছি। ওই সময় যখন ঈদ বা অন্য কোনো বিক্রি মৌসুম আসতো, টানা দু-তিনদিন না ঘুমিয়ে অসুস্থ হয়ে গেছি। যেভাবে সফলতার শুরু ২০২২ সালের পরে একজন আত্মীয়, এরপর আরও কয়েকজন যোগ হলো ক্রাফটিমেশনের সঙ্গে। এরপর একে একে ২২ জন যুক্ত হলেন। বাড়তে শুরু করলো পণ্যের পসার। পরের বছর আগের পণ্যের সঙ্গে ‘রিকশা ও রিকশাচিত্র’ নিয়ে কাজ শুরু করে মৌরির প্রতিষ্ঠান। পুরান ঢাকা থেকে খুঁজে খুঁজে বেশকিছু অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্পী আনলেন প্রতিষ্ঠানে। পণ্য হিসেবে নির্বাচন করা হলো বাংলাদেশের কিছু যানবাহন রিকশা, ভ্যান, বাস ও ট্রাক। সেগুলোতে রিকশা আর্ট ফুটিয়ে তুলতেন শিল্পীরা। গ্রামীণ হস্তশিল্পেও নতুনভাবে রিকশা আর্ট করা হলো। সেসব পণ্যের চাহিদা তুঙ্গে উঠলো। তখন নানা চড়াই-উতরাই পার হয়ে যাচ্ছেন মৌরি। অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্পধারার সঙ্গে পণ্য নির্বাচনের নিজগুণে বিকশিত হয়েছে তার প্রতিষ্ঠান। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রদর্শনীতে তার পণ্য সম্মানজনক এই স্বীকৃতি লাভ করেছে, যা তাকে আরও নতুন নতুন পণ্য নিয়ে কাজ করার খোরাক জুগিয়েছে। এখন ক্রাফটিমেশনের প্রায় ৫শ পণ্য। একটি মিনিয়েচার, মগ ও রিকশা আর্টের ভিন্ন তিনটি করখানা। অফিস হয়েছে মালিবাগে। প্রতি মাসে প্রায় ২২ থেকে ২৪ লাখ টাকার অর্ডার আসছে এ প্রতিষ্ঠানের ই-কমার্স সাইটে। নিজস্ব পণ্যের সঙ্গে অন্য উদ্যোক্তার কিছু পণ্য আউটসোর্সিংও করে এ প্রতিষ্ঠান। পণ্য এখন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। চুক্তি রয়েছে দেশের কয়েকটি সুপ্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের আউটলেটে পণ্য বিক্রির। যার মধ্যে নকশী, ইউনিমার্ট, লারিভের মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। মৌরি বলেন, এখন পরোক্ষভাবেও অনেক উদ্যোক্তা আমার সঙ্গে আছেন। এমন অনেকে আছেন, যারা ভালো কিছু পণ্য তৈরি করেন কিন্তু বিক্রি করতে পারেন না। সেগুলো আমাদের সাইটে বিক্রি করে দিচ্ছি। আমি আসলে একা ওপরে উঠতে চাই না। বাকি যারা হস্তশিল্পে আছেন, তাদের নিয়ে একসঙ্গে ওপরে উঠতে চাই। ভবিষ্যতে এ প্রতিষ্ঠানকে আরও বড় করতে চান মৌরি। চান তার প্রতিষ্ঠানকে একটি বাংলাদেশি ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত করতে। এনএইচ/এএসএ/এমএফএ