‘কাজের মাধ্যমে বৈষম্যটা নারীকেই ঘোঁচাতে হবে’

চট্টগ্রাম জেলার একমাত্র নারী ওসি হিসেবে মিরসরাই থানায় দায়িত্ব পালন করছেন ফরিদা ইয়াসমিন। গত বছরের ৭ ডিসেম্বর তিনি এই থানায় যোগদান করেন। যোগদান করার পর থেকে আগের তুলনায় এই থানায় চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক কারবার কমে এসেছে। এর আগে তিনি কক্সবাজার জেলার ঈদগাও থানায় ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৩ সালে তিনি পুলিশে যোগদান করেন। সারদা পুলিশ একাডেমিতে ১ বছরের ট্রেনিং শেষ করে আইন বিষয়ে শ্রেষ্ঠ মহিলা ক্যাডেট হিসেবে মেডেল প্রাপ্ত হন ফরিদা ইয়াসমিন। ২০০৪ সালে ট্রেনিং শেষে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে যোগদান করেন। এরপর তিনি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ, বরিশাল রেঞ্জ এবং চট্টগ্রাম রেঞ্জের বিভিন্ন ইউনিটে পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২২ ও ২০২৫ সালে দুই দফায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালি এবং মধ্য আফ্রিকার দেশ কঙ্গোতে সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন শেষে মেডেল প্রাপ্ত হন। ফরিদা ইয়াসমিন ফরিদপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার স্বামী মো. মোহাম্মদ মজিবুর রহমান পুলিশ ইন্সপেক্টর। বর্তমানে সিএমপি ডিবিতে কর্মরত। তাদের এক ছেলে এবং এক মেয়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন এই নারী পুলিশ কর্মকর্তা। ওসি ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ২০০৩ সালে আমি পুলিশ বাহিনীতে যোগদান করি। চাকরিতে বিভিন্ন সময় আমি বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত ছিলাম। মিরসরাই থানায় আসার আগে কক্সবাজার জেলার ঈদগাহ থানায় ওসি হিসেবে কর্মরত ছিলাম। ওই উপজেলায় কাজ করাকালীন বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ডাকাতি-অপহরণসহ বেশ কিছু অপরাধ দমন ছিল আমার জন্য চ্যালেঞ্জের। সেখানে পাহাড়িরা প্রতিনিয়ত অপহরণের সঙ্গে জড়িত ছিল। এর আগে ওই থানায় কোনো ওসি এসব অপরাধীদের আইনের আওতায় না আনতে পারলেও আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করেছি। প্রতিনিয়ত অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের ধরতে সক্ষম হয়েছি। সাহসিকতার সঙ্গে যে আমি অভিযান পরিচালনা করলাম তারপর থেকে সেখানে আর কোনো ধরনের অপহরণের ঘটনা ঘটেনি। তিনি বলেন, একজন নারী ওসি হিসেবে আমি দেখিয়ে দিতে চাই পুরুষের চাইতে নারী কোনো অংশে কম না। আমি নারী পুলিশ অফিসার হয়েও কিন্তু বসে থাকিনি। একজন পুরুষ অফিসার যেভাবে কাজ করে, আমিও সেভাবে কাজ করেছি। আমি যদি মনে করি যে আমি নারী বসে থাকবো, তাহলে নিজেই বৈষম্যের শিকার হয়ে গেলাম। বৈষম্যটা আমাকেই ঘোঁচাতে হবে। অন্যান্য পুরুষ অফিসার যেভাবে দিনরাত কাজ করে, আমাকেও সেভাবে মানুষের জানমাল রক্ষায় কাজ করতে হবে। আমি এটাও জানি পুলিশ বাহিনীতে কাজ করলে চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করতে হবে, এবং সেই চ্যালেঞ্জ নিয়ে কিন্তু আমি পুলিশ বাহিনীতে যোগদান করেছি। আমি মনে করি এই পেশায় আমাকে দেখে অনেক নারী অনুপ্রেরণা পাবে। উৎসাহ পাবে এই বাহিনীতে যোগ দিতে। ওসি বলেন, আমি যেটা মনে করি, নারীদের যদি কোনো কর্মসংস্থান থাকে তাহলে অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীনতা লাভ করবে এবং সামাজিক মর্যাদা লাভ করে। পাশাপাশি তারা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে। তবে আমি এটাও বলবো যে নারীদের কাজ করার ক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আমাদের অনেক নারীরা তৈরি পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন সেক্টরে অনেক বেশি অবদান রাখছে। এছাড়া আমাদের দেশে অনেক নারী উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে, তাদের কারণে ক্ষুদ্র শিল্প অনেক বেশি অগ্রগতি পেয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীতে যোগদানের পর আমি কোনো ধরনের বৈষম্যের শিকার হইনি। পুলিশ ডিপার্টমেন্টে অনেক সাহসী নারী রয়েছে যারা নিজের সততা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছে। সারাদেশে হাতেগোনা কয়েকজন নারী অফিসার রয়েছেন। আমি মনে করি যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের অগ্রঅধিকার দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, ছোট বেলা থেকে আমার একটা ইচ্ছে ছিলো যে আমি একটি চ্যালেঞ্জিং পেশায় কাজ করবো। পুলিশ ডিপার্টমেন্টে আমরা যারা চাকরি করি পাবলিকের সঙ্গে আমাদের ইন্টার‍্যাকশন বেশি। অনেক নারী আছে তারা আইনি সহায়তার জন্য নারী অফিসারের কাছে তারা ভেতরের কথাগুলো বলতে পারে। পুরুষ অফিসারের কাছে তারা সেভাবে তুলে ধরতে পারেন না। ফলে তারা কিছু কিছু ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি এবং আমার স্বামী দুজনই কর্মজীবী। তিনিও পুলিশে চাকরি করেন। আমরা যারা কর্মজীবী নারী, পরিবারের একটা দায়বদ্ধতা থাকে। এটা আমাদের পরিবারের সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হয়। চাকরির সুবাদে পরিবারে কিংবা সন্তনদের তেমন একটা সময় দেওয়া হয়ে ওঠে না। আমি একজন নারী পুলিশ অফিসার হলেও আমি আমার সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করছি। তারাও আমাকে স্বাচ্ছন্দ্যে গ্রহণ করেছেন। আমি তাদের কাজ করার স্বাধীনতা দিয়েছি। তাদের সঙ্গে আমিও মাঠে গিয়ে কাজ করছি। তাদের কাজগুলো ভাগ করে দিয়েছি। একজন পুরুষ অফিসারকে তারা যেভাবে মেনে চলেন, আমাকেও সেভাবে মেনে নিয়েছেন। এটা আসলে নেতৃত্বের গুণাবলি। নারী-পুরুষ বলে কোনো কথা নেই। অনেক রাত পর্যন্ত আমিও তাদের সঙ্গে মাঠে থাকি। তাদের সঙ্গে কাজ করি, তাদের কাজের তদারকি করি। তারা যখন দেখে আমি তাদের সঙ্গে বসে কাজ করছি, আমি মাঠে তাদের সঙ্গে ঘুরছি, তাদের ভালোমন্দ শুনছি, তারাও আমাকে শেয়ার করছেন। সে হিসেবে বলতে পারি একজন পুরুষ অফিসারকে যেভাবে তারা মেনে চলেন ঠিক তেমনি আমাকেও তারা সেভাবে গ্রহণ করেছেন। এফএ/জেআইএম