আন্তর্জাতিক নারী দিবস এলেই নারী অধিকার, নিরাপত্তা ও সমতার প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় আসে। কিন্তু এই আলোচনার মাঝেই একটি পরিচিত বাক্য প্রায়ই শোনা যায় - সব পুরুষ তো এমন না। কথাটি আংশিক সত্য হলেও অনেক নারী কেন তবু বলেন ‘সব পুরুষ একই’? প্রশ্নটি আসলে ব্যক্তিগত চরিত্রের নয়, বরং সামাজিক আচরণের। ধরা যাক একটি সাধারণ দৃশ্য। দশজন পুরুষের একটি আড্ডা। একজন নারীকে নিয়ে অশালীন বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ রসিকতা করল একজন। দুজন হেসে উঠল, তারা এটিতে ‘মজা’ পেয়েছে। তিনজন অস্বস্তি পেলেও পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে মৃদু হাসি দিল। চারজন চুপ রইল - কেউ ঝামেলা এড়াতে, কেউ আবার কী বলবে বুঝতে না পেরে। কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করল না। পরে এই দশজনের নয়জনই নিজেদের ভালো মানুষ বলে মনে করতে পারেন। তারা হয়তো মনে করেন, ‘আমি তো কিছু করিনি।’ কিন্তু যে নারীকে নিয়ে এই মন্তব্য করা হয়েছিল, তার দৃষ্টিতে দৃশ্যটা ভিন্ন। তার কাছে প্রতিটি হাসি, প্রতিটি নীরবতা, এমনকি মুখ ফিরিয়ে নেওয়াটাও একই বার্তা দেয় - তার প্রতি অসম্মানকে কেউ থামায়নি। গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্র বা সামাজিক পরিবেশে ছোট ছোট অবজ্ঞাজনক আচরণও নারীদের জন্য মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইউনাইটেড নেশনস্ ইউমেন-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, লিঙ্গবৈষম্য শুধু বড় ধরনের সহিংসতা নয়; মন্তব্য, রসিকতা, উপেক্ষা বা অবজ্ঞাও নারীর জন্য নিরাপত্তাহীন পরিবেশ তৈরি করতে পারে। মনোবিজ্ঞানীরা এই অবস্থাকে অনেক সময় ‘বাইস্ট্যান্ডার সাইলেন্স’ বলে ব্যাখ্যা করেন - যেখানে অন্যায় দেখেও মানুষ নীরব থাকে। এই নীরবতা সামাজিকভাবে অন্যায় আচরণকে স্বাভাবিক করে তুলতে পারে। তাই যখন অনেক নারী বলেন ‘সব পুরুষ একই’, তখন তারা আসলে এটা বলেন না যে - সব পুরুষ হয়রানি করে। বরং তারা বোঝাতে চান, অধিকাংশ পুরুষ কোনো না কোনোভাবে এমন একটি সংস্কৃতির অংশ হয়ে যান, যেখানে নারীর প্রতি অবমাননাকর আচরণকে থামানো হয় না। এই সংস্কৃতি একদিনে তৈরি হয়নি, আবার একদিনে ভাঙবেও না। তবে পরিবর্তনের শুরু হতে পারে খুব ছোট একটি কাজ দিয়েই - অসঙ্গত মন্তব্যে হাসি না দেওয়া, আপত্তি জানানো বা অন্তত স্পষ্টভাবে বলা, ‘এটা ঠিক না।’ আন্তর্জাতিক নারী দিবস তাই শুধু নারীর অর্জন উদযাপনের দিন নয়। এটি এমন একটি সমাজ গড়ার প্রতিশ্রুতির দিন, যেখানে সম্মান ও নিরাপত্তা কোনো আলোচনার বিষয় নয়, বরং স্বাভাবিক বাস্তবতা। সূত্র: ইউনাইটেড নেশনস উইমেন জেন্ডার ইক্যুইটি রিপোর্ট, আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জেন্ডার স্টাডিজ গবেষণা এএমপি/জেআইএম