বিয়ে হয়ে গেলে স্বামী-স্ত্রী থেকে বাবা-মা হওয়ার পরিবর্তন আসে। সন্তান জন্মের পর দায়িত্ব বেড়ে যায়, দৈনন্দিন জীবন বদলে যায়। অফিসের চাপ, কাজের দায়িত্ব, ঘরের খুঁটিনাটি, সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্ব ,সব মিলিয়ে দম্পতির নিজের সম্পর্ক প্রায় পিছনে চলে আসে। ভালোবাসা হারিয়ে যেতে শুরু করে, অথচ সন্তানকে ঘিরেই জীবন এগোয়। কয়েক বছরের পর সন্তান বড় হয়ে পড়াশোনা, চাকরি বা অন্য কারণে বাড়ি ছাড়তে শুরু করলে দম্পতির সম্পর্কের আসল চেহারা সামনে আসে। অনেক বাবা-মা হঠাৎ এক ধরনের শূন্যতা বা একাকীত্ব অনুভব করেন। দীর্ঘদিন সন্তানকে কেন্দ্র করে তৈরি সংসার হঠাৎ ফাঁকা হয়ে যাওয়ায় সম্পর্কের দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই অবস্থার ফলে কিছু দম্পতি বিবাহ-বিচ্ছেদের পথ বেছে নেন। সাম্প্রতিক সময়ে এই ধরনের বিচ্ছেদকে ‘এম্পটি নেস্ট ডিভোর্স’ বলা হচ্ছে। এম্পটি নেস্ট সিনড্রোম ‘এম্পটি নেস্ট’ শব্দের অর্থ হলো সেই সময়, যখন সন্তানরা বড় হয়ে নিজেদের জীবন গড়ার জন্য বাড়ি ছাড়ে এবং বাবা-মা একা হয়ে যান। প্রায় ২০ বছর ধরে সন্তানকে ঘিরে তৈরি পরিবারিক জীবন হঠাৎ বদলে গেলে বাবা-মায়ের মধ্যে এক ধরনের শূন্যতা বা একাকীত্ব তৈরি হয়। এই মানসিক পরিবর্তনকে ‘এম্পটি নেস্ট সিনড্রোম’ বলা হয়। কেন ঘটে এম্পটি নেস্ট ডিভোর্স?বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সন্তানরা বাড়িতে থাকলে দম্পতির মধ্যে থাকা সম্পর্কের সমস্যা অনেক সময় চাপা থাকে। সন্তানরা চলে গেলে সেই সমস্যাগুলো স্পষ্ট হয়ে আসে। দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকা সত্ত্বেও অনেক দম্পতির মধ্যে কথাবার্তা কমে যেতে পারে, ফলে যোগাযোগের অভাব তৈরি হয়। বছরের পর বছর কথাবার্তা না থাকায় দূরত্ব বেড়ে যায় এবং সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা কমে আসে। আবেগগত দূরত্বও একটি বড় কারণ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও অনুভূতির সম্পর্ক ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে পারে। এই দূরত্ব সন্তানরা থাকাকালীন চোখে ধরা না পড়লেও, তারা বাড়ি ছাড়ার পর স্পষ্ট হয়ে আসে। সে সময় অনেক দম্পতি অনুভব করেন যে তাদের সম্পর্ক আর আগের মতো শক্ত নেই। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ইচ্ছা। বিশেষ করে পঞ্চাশ বছরের বেশি বয়সে অনেক মানুষ নতুনভাবে নিজের জীবন শুরু করতে চান। জীবনের শেষ বয়সে সব দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদের সময় ও স্বাধীনতা চাইতে শুরু করেন। এই ইচ্ছা অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তান বাড়ি ছাড়ার পর দম্পতিদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৫% বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে তখন, যখন সন্তানরা ইতিমধ্যেই বড় হয়ে আলাদা হয়ে গেছে। মানসিক প্রভাবএম্পটি নেস্ট ডিভোর্স শুধু দাম্পত্য সম্পর্ক ভাঙনের বিষয় নয়, এটি মানসিকভাবেও চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। অনেকের মধ্যে একাকীত্ব, উদ্বেগ, পরিচয়ের সঙ্কট দেখা দিতে পারে। তবে যারা ইতিবাচক মনোভাব রাখেন, তারা এই সময়কে নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ হিসেবেও দেখেন। সমাধান ও প্রতিরোধের উপায়মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, সন্তানরা বড় হওয়ার আগে দম্পতিদের নিজেদের সম্পর্কের দিকে মন দেওয়া জরুরি। একসঙ্গে সময় কাটানো, নতুন শখ তৈরি করা বা একসঙ্গে ভ্রমণে যাওয়া সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। সমস্যা থাকলে খোলামেলা আলোচনা করা প্রয়োজন। একে অপরের অনুভূতি বোঝা, পারস্পরিক সমঝোতা এবং ছোট ছোট মুহূর্তগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা বাড়ায়। প্রয়োজনে দম্পতি কাউন্সেলিং বা থেরাপিও গ্রহণ করতে পারেন। সন্তানদের কেন্দ্র করে জীবন গড়ার পাশাপাশি নিজের সম্পর্কের দিকেও মন দিলে, সন্তান বাড়ি ছাড়ার সময় দম্পতির মধ্যে দূরত্ব কম থাকে। সম্পর্কের তিক্ততা কমে যায় এবং এম্পটি নেস্ট ডিভোর্সের ঝুঁকিও অনেকাংশে হ্রাস পায়। মূল বিষয় হলো একে অপরকে বোঝা, সময় দেওয়া এবং সচেতনভাবে সম্পর্কের যত্ন নেওয়া।সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, ও অন্যান্য আরও পড়ুন:নতুন ট্রেন্ডে কেন জেন জিরা পুরোনো প্রেমের রীতিতে ফিরছে‘সব পুরুষ একরকম না’, তবু কেন সব পুরুষের দোষ হয় এসএকেওয়াই