বাংলাদেশে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পথে প্রধান অন্তরায় কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নের জন্য পারিবারিক সহায়তা বাড়ানো, সহজ শর্তে অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো দরকার। এটা করতে পারলেই নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পথ আরও সুগম হবে বলে মন্তব্য করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে জাগো নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি ইব্রাহীম হুসাইন অভি। বাংলাদেশে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রধান অন্তরায় কী? বাংলাদেশে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের অন্তরায় একাধিক। প্রথমত, শিক্ষা ও দক্ষতার ঘাটতি। যদিও আমরা দেখি শহরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেয়েরা ভালো করছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে শিক্ষার উচ্চ স্তরে যেতে যেতে মেয়েদের ঝরে পড়ার হার বেড়ে যায়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে তাদের উপস্থিতি এবং ফলাফল ভালো থাকে। কিন্তু পরবর্তীসময়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণে অনেকেই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। অনেক পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য থাকে না মেয়েদের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করার। আবার সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনেক সময় মনে করা হয়—মেয়েকে বেশি দিন ঘরে বসিয়ে রাখার চেয়ে বিয়ে দেওয়াই ভালো। ফলে শিক্ষায় বিনিয়োগ কমে যায়। দ্বিতীয়ত, শ্রমবাজারে নারীর অবস্থান। বর্তমানে প্রায় ৪০ শতাংশ নারী শ্রমবাজারে যুক্ত থাকলেও তাদের প্রায় ৯০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন—যেখানে মজুরি কম, চাকরির নিশ্চয়তা নেই এবং সামাজিক সুরক্ষা নেই। নারীরা যদি মূলধারার অর্থনীতিতে, বিশেষ করে হোয়াইট-কলার ও সিদ্ধান্তগ্রহণমূলক পদে কাজ করতে না পারেন, তবে পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারীর অনুপস্থিতি একটি বড় সমস্যা। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কী? প্রথমত, মেয়েদের শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে—বিশেষ করে নিম্নআয় ও দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে। অনেক পরিবারে সীমিত আয়ের কারণে ছেলে ও মেয়ের মধ্যে বেছে নিতে হলে ছেলের পেছনে বেশি ব্যয় করা হয়। তাই সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষায় আরও বেশি বিনিয়োগ জরুরি। আরও পড়ুন নারী উদ্যোক্তা হওয়ার অনুকূল পরিবেশ অনুপস্থিতপ্রতিটি বাধাই উদ্যোক্তার বিকাশের একটি সুযোগনারীর ওপর কোনো হস্তক্ষেপই কাম্য নয় দেশের শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ পর্যাপ্ত নয়। শিক্ষার গুণগত মানও সন্তোষজনক নয়। তবে বর্তমান সরকার এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এটি একটি ভালো দিক। কিন্তু দেখার বিষয় সেটা কতটুকু বাস্তবায়ন হয়। শুধু সার্টিফিকেটভিত্তিক শিক্ষা নয়, কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা বাড়াতে হবে। অনেক শিক্ষার্থী সনদ নিয়ে বের হলেও কাজ পায় না বা তাদের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চাকরি পায় না। এ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। শিক্ষাখাতে বাজেট বৃদ্ধি, গুণগত মানোন্নয়ন ও কারিগরি প্রশিক্ষণ জোরদার করা জরুরি। উচ্চবিত্তরা সাধারণত ব্যয়বহুল বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে, যেখানে মান ভালো। সরকারি ভালো স্কুল-কলেজের সংখ্যা সীমিত এবং সেখানে প্রচণ্ড প্রতিযোগিতা। তাই ভালো মানের সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়াতে হবে। যাদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বা আর্থিক সক্ষমতা নেই, তাদের জন্য শ্রমবাজার-উপযোগী কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যা নারীদের জন্য আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ‘উইমেন, বিজনেস অ্যান্ড দ্য ল’ ২০২৬ রিপোর্টে বলা হয়েছে, জেন্ডার গ্যাপ কমাতে পারলে জিডিপি ১০–২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। বাংলাদেশে কীভাবে জেন্ডার গ্যাপ কমানো ও ওয়ার্কফোর্স পার্টিসিপেশন বাড়ানো সম্ভব? প্রথমত, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ নারী কর্মী তৈরি করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে চাকরি থাকলেও উপযুক্ত নারী প্রার্থী পাওয়া যায় না। তাই দক্ষতা উন্নয়ন অপরিহার্য। দ্বিতীয়ত, সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে। অনেক শিক্ষিত নারী পারিবারিক দায়িত্বের কারণে শ্রমবাজার থেকে সরে যান। তাদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার, শিশু পরিচর্যা সুবিধা ও পুনরায় শ্রমবাজারে ফিরে আসার জন্য স্কিল আপডেট কর্মসূচি প্রয়োজন। বেশিরভাগ ভালো চাকরি বড় শহরকেন্দ্রিক। সেখানে নারীদের নিরাপত্তা, নিরাপদ যাতায়াত ও আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দেশে নারীদের জন্য আলাদা বা নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থা নেই। আবার বড় শহরে নিরাপদ আবাসনের অভাবও বড় বাধা। নারীর প্রতি সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি প্রয়োগ করতে হবে। এটি শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়, অর্থ, পরিকল্পনা, নারী ও শিশু বিষয়ক, আইন—সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কর্মক্ষেত্রে নারীরা বৈষম্যের শিকার হন। এর প্রতিকার কী? হ্যাঁ, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য রয়েছে—পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উভয় পর্যায়েই। এখনো অনেক পরিবারে মনে করা হয়, ছেলে-মেয়ে দুজনই ভালো শিক্ষার্থী হলেও ছেলেকে ব্যয়বহুল উচ্চশিক্ষায় পাঠানো হবে, মেয়েকে নয়। কর্মক্ষেত্রে ‘গ্লাস সিলিং’—অদৃশ্য বাধা—এখনো বিদ্যমান। দৃশ্যমান বাধা কিছুটা কমলেও সিদ্ধান্তগ্রহণের উচ্চ পর্যায়ে নারীরা নানা অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। সামাজিক মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন জরুরি। আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সব ক্ষেত্রে অতি জরুরি। পাশাপাশি আইনের আধুনিকায়ন দরকার উন্নত দেশের সঙ্গে তাল মেলাতে। দেশে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা এখনো কম। এর কারণ ও সমাধান কী? প্রধান সমস্যা সহযোগিতা ও মূলধনের অভাব। পরিবার থেকে অনেক সময় মানসিক ও আর্থিক সমর্থন মেলে না। ব্যবসা শুরু করতে পুঁজি দরকার—কিন্তু সেই মূলধন জোগাড় করা কঠিন হয়। ব্যাংকগুলোতে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ক্রেডিট সুবিধা থাকলেও বাস্তবে তা পাওয়া সহজ নয়। কাগজপত্রের জটিলতা, ব্যাংকের সঙ্গে পূর্ব লেনদেন না থাকা—এসব কারণে নতুন উদ্যোক্তারা সমস্যায় পড়েন। পুরুষ উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রেও সমস্যা থাকে, তবে নারীদের ক্ষেত্রে তা আরও বেশি। এখানেও সাংস্কৃতিক মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি বাধা হিসেবে কাজ করে। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নারীর অবস্থান কতটা উন্নত হবে বলে মনে করেন? শুধু নারী প্রধানমন্ত্রী থাকলেই নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয় না। বিষয়টি নির্ভর করে নীতিমালা ও দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। যে কোনো সরকার নারী বা পুরুষ নেতৃত্বাধীন—যদি নারীবান্ধব নীতি গ্রহণ করে এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করে, তবে নারীর উন্নয়ন সম্ভব। বিশ্বের অনেক দেশে নারী রাষ্ট্রপ্রধান নেই, কিন্তু তাদের নারীরা উন্নত অবস্থানে আছেন। তাই মূল বিষয় হলো—নীতিগত অঙ্গীকার ও বাস্তবায়ন। তবে সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব কমে যাওয়া একটি দুঃখজনক বিষয়। আইএইচও/এএসএ/এমএফএ