রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলায় অতি সাধারণ এক পরিবারে বেড়ে ওঠেন সুমাইয়া আক্তার রিয়া। বাবা অটোরিকশা চালিয়ে যা আয় করেন তা দিয়েই কোনোমতে সংসার চালান। প্রতিদিনের আয়েই চলে সংসারের নিত্য খরচ। এমন বাস্তবতায় মেয়ের পড়াশোনার খরচ বহন করা পরিবারের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। তবু দারিদ্র্য তার স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও সুমাইয়া এসএসসিতে জিপিএ ৪.৮৩ ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪ পেয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। পড়াশোনার প্রতি তার অদম্য আগ্রহ আর মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা তাকে একটাই স্বপ্ন দেখিয়েছে নার্স হয়ে মানুষের সেবা করা। তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় সুমাইয়া। ছোটবেলা থেকেই তার মনে ছিল একটাই ভাবনা কীভাবে দ্রুত পড়াশোনা শেষ করে পরিবারের হাল ধরতে পারবেন। সংসারের বাস্তবতা তাকে শিখিয়েছে, শুধু নিজের জন্য নয়, ছোট দুই ভাইয়ের ভবিষ্যতের কথাও তাকে ভাবতে হবে। প্রত্যন্ত গ্রামে বেড়ে ওঠা সুমাইয়ার পথচলায় সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ছিলেন তার মা। তিনি নিজেও এসএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। তাই শিক্ষা একজন মানুষের জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সে বিষয়ে তার উপলব্ধি ছিল গভীর। সবসময় তিনি সুমাইয়াকে উৎসাহ দিয়েছেন মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখতে। বাবাও সবসময় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা দিতেন। গত বছর এক শিক্ষকের কাছ থেকে সুমাইয়া জানতে পারেন, বাংলাদেশে নার্সিং পেশায় বর্তমানে ভালো আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই পেশায় রয়েছে মানুষের সেবা করার এক মহৎ সুযোগ এবং মেয়েদের জন্য সম্মানজনক ক্যারিয়ার গড়ে তোলার বিস্তৃত ক্ষেত্র। নার্সিং কোর্স সম্পন্ন করলে দেশে যেমন কাজের সুযোগ রয়েছে, তেমনি বিদেশেও দক্ষ নার্সদের জন্য রয়েছে সম্ভাবনার ক্ষেত্র। এই বাস্তবতা ও সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই সুমাইয়া নার্সিং পেশাকে নিজের ভবিষ্যৎ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তার বিশ্বাস, এই পথ তাকে শুধু নিজের স্বপ্ন পূরণেই সাহায্য করবে না, বরং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর শক্তিও দেবে। পরিবারের বড় মেয়ে হিসেবে সুমাইয়ার আরেকটি বড় স্বপ্ন ছোট দুই ভাইয়ের পাশে থাকা, তাদের সঠিক পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করা। নিজের অভিজ্ঞতা ও সংগ্রামের গল্প দিয়েই তিনি তাদের সবসময় পথ দেখাতে চান। এই স্বপ্নকে সামনে রেখে সুমাইয়া ভর্তি হন নাটোরের আমজাদ খান চৌধুরী নার্সিং কলেজে বিএসসি ইন নার্সিংয়ে। স্বাস্থ্য খাতে রাজশাহী ও নাটোর অঞ্চলে দক্ষ জনবল গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ২০২০ সালে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। এখানে রয়েছে অভিজ্ঞ শিক্ষকবৃন্দ, আধুনিক ল্যাব সুবিধা এবং নিজস্ব মানসম্মত হাসপাতালে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ। বিস্তৃত ক্যাম্পাস ও শিক্ষার্থীদের জন্য স্বল্প খরচে আবাসনের ব্যবস্থাও রয়েছে। বিএসসি ইন নার্সিং, ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি এবং ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি এই তিনটি কোর্সে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলের নির্ধারিত সিলেবাস অনুযায়ী এখানে পাঠদান করা হয় এবং এটি রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। তবে পড়াশোনার পথটা সুমাইয়ার জন্য সহজ ছিল না। পরিবারের সীমিত আয়, প্রতিদিনের হিসাব-নিকাশ আর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে নার্সিং এ উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠছিল সুমাইয়ার জন্য। ঠিক সেই সময় তার পাশে দাঁড়ায় সেফ ফাউন্ডেশন। মানবিক দায়বদ্ধতা এবং শিক্ষার প্রতি গভীর বিশ্বাস থেকেই সুমাইয়ার জন্য বিশেষ একটি বৃত্তির ব্যবস্থা করে প্রতিষ্ঠানটি। সেফ ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি মো. রাসেল শেখ বলেন, ‘আর্থিক প্রতিবন্ধকতা যেন কোনোভাবেই একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর পড়াশোনার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায় এই বিশ্বাস থেকেই আমরা তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি।’ নিজের স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে সুমাইয়ার কণ্ঠে ধরা পড়ে দৃঢ়তা আর আবেগের মিশেল। বলেন, ‘আমার সমবয়সী অনেক মেয়েরই বিয়ের পর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকেই মা হওয়ার পর আর ইচ্ছে থাকলেও পড়তে পারে না। আমি চাই, যত কষ্টই হোক নার্স হয়ে মানুষের সেবা করতে। আমার পরিবারের জন্য কিছু করতে চাই। আর আমি চাই আমার মতো অন্য মেয়েরাও যেন পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ-সহায়তা পায়।’ আসলে একজন মেয়ের শিক্ষাজীবন থেমে যাওয়া মানে শুধু একটি স্বপ্নের অবসান নয়। এর সঙ্গে থেমে যায় একটি পরিবারের সম্ভাবনা, একটি সমাজের অগ্রযাত্রা। আর যখন কোনো মেয়ের হাতে শিক্ষার সুযোগ তুলে দেওয়া হয়, তখন সে শুধু নিজের জীবনই বদলায় না, তার আলো ছড়িয়ে পড়ে চারপাশেও। ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামী ন্যায়বিচার: সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’। সেই বার্তার বাস্তব প্রতিফলন যেন সুমাইয়ার এই পথচলা। কারণ সুমাইয়ার গল্প কেবল একটি বৃত্তির গল্প নয়। এটি সংগ্রামের গল্প, মানবিকতার গল্প আর সবচেয়ে বড় কথা মেয়েদের শিক্ষার শক্তিতে অটল বিশ্বাসের প্রচেষ্টা। এমএমএআর