সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় তিন মাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন সাংবাদিক ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট আনিস আলমগীর—যিনি টেলিভিশনের টকশোতে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার, জামায়াত ও এনসিপির নানা কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে আলোচিত ছিলেন। শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার-২ থেকে তিনি ছাড়া পান। গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল গত ১৪ ডিসেম্বর রাত ৮টার পর সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যায়। এরপর মধ্যরাতে ‘জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স’ নামে একটি সংগঠনের সদস্য আরিয়ান আহমেদ ‘রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্টের ষড়যন্ত্র এবং নিষিদ্ধ সংগঠনকে উসকে দেওয়ার’ অভিযোগে আনিস আলমগীরসহ চারজনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে এ মামলা করেন। এ মামলায় রিমান্ড শেষে ২০ ডিসেম্বর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। গত ৫ মার্চ উত্তরা পশ্চিম থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পেলেও গত ১৫ জানুয়ারি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আনিস আলমগীরের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। ২৮ জানুয়ারি দুদকের আবেদনে আদালত তাকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখায়। এই মামলায়ও গত ১১ মার্চ আনিস আলমগীর জামি পেলে তিনি কারামুক্ত হন। কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পরে তিনি বলেছেন, ‘শুধু অন্যায় নয়, আমার সঙ্গে জুলুম করা হয়েছে। আপনি আমাকে বলতেছেন যে আমার সমালোচনা করেন, তারপর সমালোচনা করার ফলে আমাকে জেলে দিয়ে দিলেন। এটা তো বড় বাটপারি। এর থেকে তো বড় বাটপারি গত এক হাজার বছরে কেউ দেখেনি। সমালোচনা করলে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে জেলে দিচ্ছেন। সমালোচনা কী কখনো সন্ত্রাস হতে পারে। আমি কি কোনো সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত আছি?’ (প্রথম আলো, ১৪ মার্চ ২০২৬)। আনিস আলমগীরের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছিল না। কিন্তু তাকে কেন গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেটি মোটমুটি সবাই আন্দাজ করতে পারেন। তিনি টেলিভিশনের টকশো এবং নিজের ফেসবুক ওয়ালে অন্তর্বর্তী সরকার এবং এই সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কড়া সমালোচনা করতেন। এনসিপি ও জামায়াতেরও সমালোচনা করতেন। প্রশ্ন হলো, টেলিভিশনে বা ফেসবুকে সরকার বা সরকার প্রধান কিংবা সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট কোনো দলের সমালোচনার অধিকার কি একজন সাংবাদিক বা সাধারণ নাগরিকের থাকবে না? সরকারের সমালোচনা মানেই সেটি সন্ত্রাসী কাজ? সমালোচনার ভাষা যত তীর্যক বা আক্রমণাত্মকই হোক না কেন, সেটি প্রতিরোধ করার জন্য সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার করে একজন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষককে মাসের পর মাস কারাগারে রাখতে হবে? তার বিরুদ্ধে যে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হলো, সেটি কি প্রমাণিত হয়েছে বা পুলিশ যদি সঠিক ও নিরপেক্ষ প্রতিবেদন দেয়, সেখানে কোনোভাবেই তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ প্রমাণ করা যাবে? আদালত তথা বিচার বিভাগ যদি স্বাধীন হয়, যদি তার ওপর কোনো চাপ না থাকে, তাহলে দেশের কোনো আদালত কি একজন নাগরিককে শুধু সরকারের সমালোচনা করার কারণে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় কারাগারে পাঠাতে পারে? যদি পুলিশ অতি উৎসাহী হয়ে কিংবা রাষ্ট্রীয় চাপে কারো বিরুদ্ধে এইধরনের মামলা দেয়ও, তারপরও সেই মামলায় কাউকে কারাগারে পাঠানো বা মাসের পর মাস জামিন না দেয়ার আগে আদালত কি মামলার মেরিট বিবেচনা করেন না? পুলিশ যত দুর্নীতিগ্রস্তই হোক না কেন, মানুষের শেষ ভরসার জায়গা যে আদালত, সেখানে গিয়েও কি মানুষ ন্যায়বিচার পাবে না? এতদিন বলা হতো, বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় না থাকার কারণে বিচার বিভাগ পুরোপুরি স্বাধীন হতে পারছে না। কিন্তু বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের যত সমালোচনাই থাকুক, তারা অন্তত সুপ্রিম কোর্টের জন্য যে আলাদা সচিবালয় করেছে, সেজন্য তারা ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। প্রশ্ন হলো, আলাদা সচিবালয় হওয়ার পরেও কি বিচার বিভাগ যথেষ্ট স্বাধীন হয়েছে বা বিচারকরা কি কোনো ধরনের চাপমুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে বিচার করতে পারছেন? যদি না পারেন তাহলে আজ আনিস আলমগীর জামিন পেয়েছেন, কিন্তু কাল আরেকজন নাগরিক সরকারের সমালোচনার জন্য সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হবেন এবং আদালত তাকে জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠাবেন। মাসের পর মাস তিনি জেল খাটবেন। অথচ দিন শেষে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করা যাবে না। ধরা যাক কোনো একটি আইনের কিছু ধারা নিয়ে নাগরিক, সিভিল সোসাইটি এমনকি রাজনৈতিক পরিসরেও দারুণ সমালোচনা আছে। কিন্তু ওই নাগরিক বা সিভিল সোসাইটির লোকেরাই যখন ক্ষমতায় যান, তারাও তখন আইনের ওই বিতর্কিত ধারা তাদের বিরোধীদের ওপর প্রয়োগ করেন। যার বড় উদাহরণ বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিজেই একজন শান্তিতে নোবেলজয়ী এবং তার উপদেষ্টাদের মধ্যে একাধিক ব্যক্তি মানবাধিকারকর্মী হিসেবে খ্যাত। অথচ তাদের আমলেই বিরোধী মত দমনে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের যথেচ্ছ ব্যবহার হয়েছে, যার বড় উদাহরণ সাংবাদিক আনিস আলমগীর। বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো কিংবা সংবিধান রক্ষার দাবিতে আলোচনা সভায় বক্তৃতা দেয়াকেও কোনো অপরাধের পর্যায়ে ফেলা যাবে না এবং কোনো মামলায় গ্রেপ্তার করা যাবে না। কিন্তু রাষ্ট্র যেহেতু এসব কর্মকাণ্ড হতে দিতে চায় না, ফলে তাকে এমন একটি আইনি কাঠামো তৈরি করতে হয় যা বেশ কঠিন। আর এই চিন্তা থেকেই বিরোধী মত দমনে কঠোর পদক্ষেপ হিসেবে সন্ত্রাসবিরোধী আইন তৈরি করা হয়। অর্থাৎ আপাতদৃষ্টিতে অপরাধ নয় কিংবা লঘু অপরাধেও যাতে বিরোধী মতের লোকদের দীর্ঘদিন জেলে পুরে রাখা যায় এবং যাতে তারা সহজে জামিন না পান, সেই বিবেচনা থেকেই সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, গত বছরের ২৮ আগস্ট সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির অডিটরিয়ামে ‘মঞ্চ ৭১’ এর ব্যানারে একটি গোলটেবিল বৈঠক থেকে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জনসহ ১৬ জনকে আটকের পরে তাদেরকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো; গত ৭ মার্চ রাজধানীর শাহবাগ থানার সামনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ বাজানোর ঘটনায় গ্রেপ্তার ‘স্লোগান ৭১’-এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ তাসনিম আফরোজ ইমিসহ তিনজনকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো এবং এদিন বিকালে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষ্যে রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ফুল দিতে যাওয়ার পথে চারজনকে গ্রেপ্তার করে তাদের বিরুদ্ধেও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় বারবার এই আইনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনে পরে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এই আইনের যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। যেন গত বছরের অক্টোবরে নিউইয়র্ক-ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বা এইচআরডব্লিউ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছিল, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কারাগারে পাঠানো হোক অথবা শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশে বাধা দেওয়া হোক, অন্তর্বর্তী সরকারের এমন কোনো পক্ষপাতমূলক আচরণ করা উচিত নয়, যা শেখ হাসিনার সরকারের সময় বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের অনেকের বিরুদ্ধেই শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। অসংখ্য মানুষকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আটক রাখা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বেশ কয়েকজন অভিযোগ করেছেন, চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত করাসহ পুলিশ হেফাজতে তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে। এ ধরনের অভিযোগ শেখ হাসিনার শাসনামলের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। (বিবিসি বাংলা, ৯ অক্টোবর ২০২৫)। ওই সময় বাংলাদেশ সম্পাদক পরিষদও বিবৃতি দিয়ে সরকারকে সতর্ক করেছিল এই বলে যে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনগুলো মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করবে এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করবে, যা উদ্বেগজনক। এটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। প্রশ্ন হলো, সমালোচনা বা ভিন্নমত দমনে রাষ্ট্র কেন বরাবরই সন্ত্রাসীবিরোধী আইনের মতো একটি বিপজ্জনক এবং মানবাধিকারপরিপন্থি আইনের আশ্রয় নেয়? এর সহজ উত্তর হলো, সরকার যাদের কণ্ঠরোধ করতে চায় বা যেসব কাজ করতে দিতে চায় না, সেসবের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা কঠিন। যেমন বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ প্রচারকে আইনত অপরাধ বলার সুযোগ নেই। টেলিভিশনের টকশোতে সরকার বা সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তি বা দলের সমালোচনাকেও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলার সুযোগ নেই এবং সমালোচনার অভিযোগে শক্ত কোনো মামলাও দেয়া যাবে না। বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো কিংবা সংবিধান রক্ষার দাবিতে আলোচনা সভায় বক্তৃতা দেয়াকেও কোনো অপরাধের পর্যায়ে ফেলা যাবে না এবং কোনো মামলায় গ্রেপ্তার করা যাবে না। কিন্তু রাষ্ট্র যেহেতু এসব কর্মকাণ্ড হতে দিতে চায় না, ফলে তাকে এমন একটি আইনি কাঠামো তৈরি করতে হয় যা বেশ কঠিন। আর এই চিন্তা থেকেই বিরোধী মত দমনে কঠোর পদক্ষেপ হিসেবে সন্ত্রাসবিরোধী আইন তৈরি করা হয়। অর্থাৎ আপাতদৃষ্টিতে অপরাধ নয় কিংবা লঘু অপরাধেও যাতে বিরোধী মতের লোকদের দীর্ঘদিন জেলে পুরে রাখা যায় এবং যাতে তারা সহজে জামিন না পান, সেই বিবেচনা থেকেই সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। রাষ্ট্রকে যেখানে নাগরিকের বাক্স্বাধীনতা এবং ভিন্নমত পোষণ ও প্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা দেয়ার কথা, সেখানে উল্টো ভিন্নমত দমনে রাষ্ট্র এমন একটি আইনি ব্যবস্থার আশ্রয় নেয়, যা স্পষ্টত মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের পরিপন্থি। লেখক: সাংবাদিক ও লেখক। এইচআর/জেআইএম