পাহাড়-নদী ঘেঁষা সবুজঘেরা মসজিদটি চোখ জুড়ায় সবার

নীল জলরাশির কর্ণফুলী নদী আর তার কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা সুউচ্চ সবুজ পাহাড়, প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্যের মাঝে এক বিষণ্ণ মহিমা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি স্থাপত্য। নাম তার ‘কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ’। তবে স্থানীয়দের কাছে এটি ‘এক গম্বুজ মসজিদ’ বা ‘বড় মসজিদ’ নামেই অধিক পরিচিত। ১৯৫৩ সালে নির্মিত এই স্থাপনাটি আধুনিক স্থাপত্যশৈলী আর প্রাকৃতিক প্রকৌশলের এক অনন্য মেলবন্ধন হওয়া সত্ত্বেও আজ সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ অবস্থায় দিন গুনছে।পঞ্চাশের দশকে নির্মিত এই মসজিদের নির্মাণ কৌশলে রয়েছে অভাবনীয় পাণ্ডিত্য। সচরাচর মসজিদে একটি বারান্দা দেখা গেলেও এখানে রয়েছে প্রশস্ত দুটি বারান্দা। উত্তর ও দক্ষিণ পাশে রাখা হয়েছে আলাদা নামাজ আদায়ের সুবিধা। তবে মসজিদটির সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এর দেয়াল। বিশাল এই মসজিদে প্রবেশের জন্য পাঁচটি দরজা থাকলেও নেই কোনো প্রথাগত জানালা।জানালার পরিবর্তে দেয়ালের নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর দরজার সমান উচ্চতায় ব্যবহার করা হয়েছে বিশেষ ‘নেটিং’ ব্যবস্থা। এই কৌশলের ফলে নদীর শীতল বাতাস ও পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো অনায়াসেই ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। ফলে তপ্ত দুপুরেও মসজিদের ভেতরে বৈদ্যুতিক আলো বা পাখার প্রয়োজন হয় না। নামাজে বসে মুসল্লিরা জালের ওপাশ দিয়ে প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য অবলোকন করতে পারেন, যা ইবাদতে আনে এক অপার্থিব প্রশান্তি।মসজিদটির ছাদ দাঁড়িয়ে আছে মাত্র চারটি সরু পিলারের ওপর, যার ওপর ভর করে আছে প্রায় চারশ মিটার ব্যাসার্ধের এক বিশাল গম্বুজ। গম্বুজের চূড়ায় রাখা হয়েছে বিশেষ আলোকপথ, যা দিয়ে দিনের আলো সরাসরি মূল হলের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে।মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য মো. আমিরুল ইসলাম জানান, এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ। এর মেঝেতে ব্যবহার করা হয়েছে বিশেষ ধরনের ‘শিলা’ বা শীতল পাথর, যা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত বিরল। এই পাথরের গুণেই প্রচণ্ড গরমেও মসজিদের মেঝে শীতল থাকে, যা মুসল্লিদের দীর্ঘক্ষণ তিলাওয়াত ও জিকিরে সহায়তা করে।আরও পড়ুন: সংস্কারের অভাবে ধ্বংসের পথে সাড়ে ৫০০ বছরের মজিদবাড়িয়া শাহী মসজিদস্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ মো. আবু বক্কর জানান, পাকিস্তান আমলে যখন কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করা হয়, তখন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয়দের ইবাদতের জন্য এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এক সময় এখানে হাজারো মানুষের ঢল নামত।বর্তমান মুসল্লি মো. হাসেম মিয়া বলেন, 'এখানে নামাজ পড়তে আসলে মনটা জুড়িয়ে যায়। গরমের দিনেও ভেতরের পরিবেশ এতোটা ঠাণ্ডা থাকে যে মনে হয় না বাইরে কাঠফাটা রোদ। কিন্তু মসজিদের বর্তমান অবস্থা দেখে খুব কষ্ট হয়।'স্থাপত্যের এই মহান নিদর্শনটি এখন বয়সের ভারে নতজানু। দেয়ালের রং চটে গেছে বহু আগে। সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দেয় বর্ষাকালে। ছাদের বিশাল গম্বুজ চুইয়ে পানি পড়ে মসজিদের ভেতর। তখন আর নামাজ পড়ার পরিবেশ থাকে না।পরিচালনা কমিটির সদস্য আমিরুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, 'মসজিদটির আয় বলতে তেমন কিছু নেই। সাধারণ মানুষের দেওয়া যৎসামান্য দানে ইমাম ও মুয়াজ্জিনের সম্মানি দেওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে কিছু সহায়তা মিললেও তা বিশাল এই স্থাপনা সংস্কারের জন্য যথেষ্ট নয়। অনেক ঝুঁকি নিয়ে আমরা এখানে নামাজ আদায় করছি।'