এই আফিফকেই কি চেয়েছিলো বাংলাদেশ?

‘সে অভিজ্ঞ এবং বর্তমানে তাকে বেশ ছন্দেই দেখা যাচ্ছে’—পাকিস্তান সিরিজের জন্য আফিফ হোসেন ধ্রুবকে দলে ফেরানোর সময় প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন লিপুর কণ্ঠে ছিল এমন আত্মবিশ্বাসের সুর। তবে মাঠের লড়াই শুরু হতেই দেখা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র। নির্বাচকদের আস্থার প্রতিদান দিতে তো ব্যর্থ হয়েছেনই, বরং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর ব্যাটিংয়ের ধরন নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন। ওয়ানডেতে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ ভুগছে বাংলাদেশ। ফল তো পক্ষে আসছেই না এমনকি ৫০ ওভার ব্যাটিংও করতে পারছে না নিয়মিত। এই সম্যার মূল্যে অন্যতম দায় ছিল মিডল অর্ডারের। যেখানে নুরুল হাসান সোহান, শামীম পাটোয়ারিদের সুযোগ দিলেও তারা প্রত্যাশা মেটাতে পারেননি। এরপর পাকিস্তান সিরিজে ফেরানো হয় লিটন কুমার দাস ও আফিফকে। ওপেনার লিটনকে নিয়ে মিডল অর্ডারে খেলানোর নতুন পরিকল্পনা করা হয়। যেখানে দ্বিতীয় ম্যাচে দারুণ ইনিংস খেললেও সিরিজের শেষ ম্যাচে ভুগেছেন বেশ। তবে আফিফ নিজে ভুগেছেন, দলকেও ভুগিয়েছেন। প্রথম ম্যাচে ব্যাটিংয়ের প্রয়োজন হয়নি। প্রথম ৪ ব্যাটারই ম্যাচ শেষ করে ফেলেছেন। দ্বিতীয় ম্যাচে বৃষ্টি বাধায় বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ৩২ ওভারে ২৪৩ রান। আফিফ যখন ব্যাটিংয়ে নামেন ১৯.৩ ওভারে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ১৮০ রান। সেখান থেকে ১৫ বলে মাত্র ১৪ রান করেন তিনি। এর মধ্যে দুটি চার মারলেও দুটিই আসে ব্যাটের কানায় লেগে। ১৫ বলের মধ্যে একবারও মনে হয়নি তার পক্ষে বড় শট খেলা সম্ভব! এর চেয়েও বিষ্ময়ের বিষয়, তিনি চেষ্টাও করেননি। অথচ দলের প্রয়োজনীয় রান রেট ক্রমশ বেড়েই যাচ্ছিলো। প্রধান নির্বাচকের মতে ছন্দে ছিলেন আফিফ, অথচ জাতীয় দলের জার্সিতে তাকে মোটেও স্বাচ্ছন্দ্যে ছিলেন না। পরের ম্যাচ রোববার ছিল সিরিজ নির্ধারনী। এদিনও একই দৃশ্য, আফিফ যেন বড় শট খেলতেই পারেন না! ৪৬.৪ ওভারে রিশাদ আউট হলে উইকেটে যান আফিফ। ২০ বল বাকি, দল প্রথমে ব্যাটিং করছে, হাতে যথেষ্ট উইকেট। এমন অবস্থায় কোনো ব্যাটার উইকেটে গেলে তার প্রথম ও একমাত্র পরিকল্পনা থাকে প্রত্যেক বল থেকেই সর্বোচ্চ রান আদায় করা, অন্তত চেষ্টা করা। বাকি থাকা ১২ বলের ৮টিই খেলার সুযোগ পেয়েছেন আফিফ! যেখান থেকে করেছেন মাত্র ৫ রান, নেই কোনো বাউন্ডারি। প্রত্যেক বলেই দেখা গেছে নিরাপদ শট খেলার তাড়না! যার কারণে প্রত্যেক শটই ছিল মাটিতে, চার বা ছক্কা মারার ন্যূনতম অ্যাপ্রোচও দেখা যায়নি। অথচ আগে ব্যাটিং করা বাংলাদেশের সামনে তখন লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানকে যত সম্ভব বড় লক্ষ্য দেওয়া যায়। ভুগেছেন বাকিরাও, লিটন বা হৃদয় কেউই শেষের দিকে রানের গতি বাড়াতে পারেননি। কিন্তু তাদের আর আফিফের অ্যাপ্রোচের মধ্যে পার্থক্য ছিল দিনের আলোর মতো পরিস্কার। মূলত আফিফকে দলে ফেরানোর সিদ্ধান্তই প্রশ্নবিদ্ধ। তবু যেহেতু নির্বাচকরা তার মধ্যে বিশেষ কিছু দেখেছিলেন, দাবি করেছিলেন ছন্দে আছেন সেহেতু দেখতেই হতো কেমন ব্যাটিং করেন! নির্বাচকদের আফিফ পুরোদমে ভুল প্রমান করেছেন, একই সঙ্গে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন তার সামর্থ্য! বিসিএল দেখেই তার প্রতি সন্তষ্ট হয়ে দলে ফেরান নির্বাচকরা। তবে সেখানেও বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় আর যাই হোক জাতীয় দলে ফেরার মতো আহামরি কিছু করেননি তিনি। তিন ম্যাচে এক সেঞ্চুরিতে করেছেন ১২৮ রান। বাকি দুই ম্যাচের একটিতে ৫২ বলে ২৪ আর আরেকটিতে ৭ বলে চার। ৮৬ বলের ১০০ রানের ইনিংসে জীবন পেয়েছেন অন্তত ৩বার। এমনকি তার সেঞ্চুরি পূর্ণ নিয়েও আছে নানা কথা। প্রতিপক্ষের জয় নিশ্চিত হওয়ায় ফিল্ডার আফিফের শট ধরার তেমন চেষ্টাও করেননি। অথচ ওই শট ধরলেই তার আর সেঞ্চুরি হয় না, তার আগেই জয় নিশ্চিত হয়ে যায় সাউথ জোনের। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও আফিফের এমন কোনো ইনিংস নেই যার উপর তাকে ভরসা করা যায়! বিশেষ করে দল যখন ভুগছে। পাকিস্তান সিরিজের আগে ১৫ ইনিংস আগে সবশেষ ফিফটি এসেছে তার ব্যাট থেকে। সেটাও প্রায় চার বছর আগে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। এই দফায় ফেরার আগে দেড় বছর আগে খেলা তিন ম্যাচের সিরিজেও তার পারফরম্যান্স ভালো ছিল না। তাহলে এরপরও কেনো আফিফকে ফেরানো হলো! নির্বাচকরা তাকে নিয়ে জুয়া খেললেন নাকি বিসিএলে এক সেঞ্চুরি দেখেই দলে ফেরালেন! যে সেঞ্চুরিতে কিনা নিখুঁত কোনো ইনিংস ছিল না। অথচ এর আগের সিরিজে মিরপুরের কালো উইকেটে অভিষেক হওয়া মাহিদুল ইসলাম খুব একটা খারাপ করেননি। স্কোয়াডে টিকে গেলেও তিন ম্যাচের কোনোটিতেই সুযোগ হলো না তার। এমনকি আগের সিরিজের শেষ ম্যাচে ৯১ রান সৌম্য সরকারও পুরো বসে রইলেন ডাগআউটে। যে বিসিএল দেখে আফিফকে নেওয়া হয়েছিল সেখানেও তার থেকে ভালো পারফর্ম করা মিডল অর্ডার ব্যাটার আছেন। আকবর আলীও এক সেঞ্চুরি করেছেন (৮৭ বলে ১১১), তার রানও ( ১৫২) আফিফের থেকে বেশি। এক সেঞ্চুরি দেখে যদি আফিফকে ফেরানো যায় তাহলেও তো আকবর তার থেকে এগিয়ে! এমনকি পাকিস্তান সিরিজের দল ঘোষণার সময়ে আফিফের চেয়ে আকবরের নামই ছিল আলোচনায় বেশি! অথচ সেখান থেকে নির্বাচকদের চোখ আটকে গেলো শুধু আফিফে। আফিফের ব্যাটিংয়েও বিষ্ময়ের জন্ম দিয়েছেন অধিনায়ক মিরাজ। তার নাকি আফিফের অ্যাপ্রোচ ভালো লেগেছে, ‘আমার কাছে ওর অ্যাপ্রোচটা ভালো লেগেছে। আপনি যদি লাস্ট ম্যাচের ব্যাটিংটা দেখেন আফিফের ওখানে কিন্তু আমাদের প্রায় নয় করে রান লাগ লাগতো। কিন্তু ও কিন্তু ওখানে হয়তো নিজের জন্য ক্রিকেট খেলতে পারতো সেভাবে কিছু রান করি। ও কিন্তু সেটা করেনি।সে দলকে জেতানোর জন্য ঝুঁকি নিয়েছে। কারণ আপনি যদি এক এক করে খেলেন দিনশেষে ম্যাচ জিততে পারবেন না। এটা আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে এবং হয়তো রান করতে পারেনি। সুযোগ পায়নি, কিন্তু আমার কাছে মনে হয় যদিও এরকম অপরচুনিটি আরো আসে সামনে ও ভালো করবে।ট আগামী ১৩ এপ্রিল বাংলাদেশে আসছে নিউজিল্যান্ড। এই সিরিজে এমন অ্যাপ্রোচ দেখানো আফিফ কি সেখনেও টিকে যাবেন! অধিনায়ক মিরাজ যেভাবে তার অ্যাপ্রোচ ডিফেন্ড করলেন তাতে কিছুই বলা যায় না। অথচ আকবর আলী কড়া নাড়ছেন জাতীয় দলের দরজায়।  এসকেডি/আইএন