মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি যুক্তরাজ্যকে বলেছেন যে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের জাহাজ পাঠানোর আর দরকার নেই, কারণ ইতোমধ্যেই তিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জিতে গেছেন। কিন্তু এখন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিশেষ সম্পর্কের’ মিত্র; সহযোগী ন্যাটো রাষ্ট্রগুলো; এমনকি চীনকেও হরমুজ প্রণালী খোলার জন্য জাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানাচ্ছেন ট্রাম্প। ফলে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে, সেটি হলো- ট্রাম্প যদি ইতোমধ্যেই ইরান যুদ্ধে জয়ী হয়ে থাকেন, তাহলে কেন এটি শেষ করার জন্য এখন বিদেশি জাহাজের প্রয়োজন?মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলছে, সহায়তা না পেলে ইউরোপের ওপর মার্কিন ‘প্রতিরক্ষা ছাতা’ এবং চলতি মাসে চীনা নেতা শি জিনপিং-এর সঙ্গে তার পরিকল্পিত শীর্ষ বৈঠকও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের এই মন্তব্য ছিল এক নতুন ইঙ্গিত যে, ইরানে তার একাধিকবার বিজয়ের দাবির পরও, যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। অনেকের মতে, ইরানে সামরিক অভিযান ওয়াশিংটনের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে চলছে। সম্ভবত এ কারণেই মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা এখন জনসাধারণ ও বৈশ্বিক বাজারকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে সংঘাতটি দ্রুতই শেষ হতে পারে। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ গেল রোববার (১৫ মার্চ) সিএনএর-এর ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ অনুষ্ঠানে বলেন, আধুনিক মার্কিন সামরিক ইতিহাসে বিরল এক ‘প্রভাবশালী বিজয়’ অর্জন করেছে মার্কিন বাহিনী। তবে মার্কিন সেনারা কবে দেশে ফিরতে পারবেন তা বলতে পারেননি তিনি। অন্যদিকে জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটকে মনে হয়েছে আরও আশাবাদী। এবিসি নিউজের ‘দিস উইক’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় এই সংঘাত কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে, সম্ভবত তার আগেও।’ এদিকে ইসরাইল সিএনএন-কে জানিয়েছে, ইরানের সামরিক ও গোয়েন্দা স্থাপনাগুলোর ওপর তাদের ভয়াবহ বোমা হামলা আরও অন্তত তিন সপ্তাহ চলতে পারে। যুদ্ধের প্রথম কয়েক সপ্তাহে ফল নির্ধারিত হয় না চলমান ইরান যুদ্ধের সামগ্রিক প্রভাব বিচার করার সময় এখনো হয়নি বলে মনে করছেন অনেকে। প্রতিবেদন অনুসারে, এমনও হতে পারে, এমনকি সম্ভবত সত্যও হতে পারে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলা ইরানের সামরিক শক্তি এবং বাইরের বিশ্বকে হুমকি দেয়ার ক্ষমতার ওপর বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। যদি তা নিশ্চিত হয়, তাহলে ট্রাম্প বলতে পারবেন যে তিনি বিশ্বকে আরও নিরাপদ করেছেন। তাছাড়া যুদ্ধটি মাত্র দুই সপ্তাহ পুরনো। যেকোনো মানদণ্ডে এটি খুব বেশি সময় নয়। তাই গণমাধ্যম বা বিশ্লেষকদের দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রবণতায় সামরিক নেতৃত্বের বিরক্তি কিছুটা বোঝা যায়। কিন্তু আধুনিক ইতিহাস দেখায়, কোনো যুদ্ধের প্রকৃত রূপ সাধারণত প্রথম কয়েক সপ্তাহে নির্ধারিত হয় না, বিশেষ করে যখন যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক শক্তির প্রভাব সবচেয়ে বেশি থাকে। এই কারণে হোয়াইট হাউস এখন নানা কারণে সংশয়ের মুখে পড়েছে যে তারা দ্রুত এই যুদ্ধ থেকে বের হতে পারবে কি না। আরও পড়ুন: আল জাজিরা এক্সপ্লেইনার /ইরানের স্কুলে হামলা: দায় এড়ানোর চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের, কী ঘটেছিল সেদিন ট্রাম্প যুদ্ধের জন্য তার দেশকেও তেমন প্রস্তুত করেননি এবং পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি আরও বিভ্রান্তিকর করে তুলেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলছেন, যুদ্ধ ইতোমধ্যেই জেতা হয়ে গেছে। কিন্তু একই সঙ্গে বলছেন, যুদ্ধ শেষ হবে তখনই যখন তিনি তা নিজের ‘হাড়ে হাড়ে অনুভব করবেন’। যদি বিজয় অর্জিত হয়েই থাকে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে যে এখনও কেন মার্কিন সেনারা ঝুঁকির মধ্যে আছে, যখন সক্রিয় দায়িত্বে ইতোমধ্যে ১৩ সেনা নিহত হয়েছেন? বর্তমান মার্কিন প্রশাসনও এক অন্ধকার ঐতিহাসিক মেঘের আড়ালে কাজ করছে। এই যুদ্ধ এখনও ইরাক এবং আফগানিস্তানের ‘চিরকালীন যুদ্ধের’ সাথে সরাসরি তুলনীয় নয়। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই, প্রাথমিক আক্রমণের রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর দুর্বল বোঝাপড়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক বিজয় ক্ষুণ্ন হয়েছিল। ইরানের ক্ষেত্রেও এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। চ্যালেঞ্জের মুখে ট্রাম্প ট্রাম্পের সামনে এমন কিছু সংকট রয়েছে যার সমাধান না হলে তার বিজয় ঘোষণা দুর্বল হয়ে যাবে। আর এগুলো সমাধান করতে ‘কয়েক সপ্তাহ’-এর বেশি সময় লাগতে পারে। ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি, সমুদ্রপথে পরিচালিত ড্রোন ও মাইন অপসারণ করা দীর্ঘ সময়ের কাজ হতে পারে। এমনকি এর জন্য স্থলবাহিনী মোতায়েনের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। এখন বিদেশি নৌবাহিনীকে এই সংকীর্ণ কৌশলগত পথ (হরমুজ প্রণালী) খুলে দিতে বা সেখান দিয়ে জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তা সাহায্যের আহ্বান জানাচ্ছেন ট্রাম্প। তবে এখন পর্যন্ত এ আহ্বানে খুব স্পষ্ট কোনো সাড়া দেয়নি কেউ। ট্রাম্প ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলের ওপর ইউরোপ ও চীনের নির্ভরতা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি। যদিও তেলের দাম বাড়ায় মার্কিন ভোক্তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ট্রাম্পের মন্তব্য অনেকের কাছে এমন মনে হতে পারে যে তিনি নিজে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে যে পরিস্থিতি তৈরি করেছেন, তা সামাল দিতে এখন অন্যদের সাহায্য চাইছেন। ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের দুর্বল জায়গাতেও আঘাত করেছেন, যারা নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘যদি কোনো সাড়া না আসে বা নেতিবাচক সাড়া আসে, তাহলে তা ন্যাটোর ভবিষ্যতের জন্য খুবই খারাপ হবে।’ ইরানের কাছে এখনো উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত রয়েছে, যা দিয়ে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগোতে পারে। যদিও গত বছর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করে দেয়ার দাবি করেছিলেন ট্রাম্প। তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিষ্কাশনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর ইউনিটগুলো প্রশিক্ষিত। কিন্তু ইরানের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে এই ধরনের অভিযানের জন্য শত শত সেনার প্রয়োজন হতে পারে এবং প্রতিকূল ভূখণ্ডের গভীরে ইরানি বাহিনীর সাথে বিপজ্জনক স্থল যুদ্ধের সূত্রপাত হতে পারে। ইরান সরকারকে বড় ধাক্কা দিতে হলে যুক্তরাষ্ট্র দখল করতে পারে খার্গ দ্বীপ, যেখান থেকে দেশটির অধিকাংশ তেল রফতানি হয় এবং যা সরকারের প্রধান অর্থের উৎস। যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি এই দ্বীপে বিমান হামলা চালিয়েছে। দ্বীপটি দখল হয়ে গেলে ইরান সরকারের হিসাব-নিকাশ বদলে যেতে পারে। তবে এমন অভিযান বড় ধরনের মার্কিন হতাহতের ঝুঁকি তৈরি করবে। পাশাপাশি ইরান নিজেই যদি তাদের তেল স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দেয়, তাহলে পরিবেশগত বিপর্যয় এবং বৈশ্বিক বাজারে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। মার্কিনিরা কেন প্রশাসনের সময়সীমায় আস্থা নাও রাখতে পারে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও যুদ্ধ শেষ হওয়ার সময় নির্ধারণকে কঠিন করে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের ড্রোন হামলার গতি কিছুটা কমেছে। মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় তেহরানের সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এর মধ্যেও রোববার (১৫ মার্চ) বাগদাদ বিমানবন্দর ও ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। সংঘাত বন্ধের কোনো কূটনৈতিক পথও এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। কোনো ‘চুক্তি’র ইঙ্গিত নেই, আর ট্রাম্পের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। এছাড়া নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির অভিষেক ইঙ্গিত দেয় যে তেহরান ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে তাদের দীর্ঘ প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে চায়। আরও পড়ুন: সিএনএনের বিশ্লেষণ /ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের না জেতার সাত কারণ ইরান সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ারও কোনো লক্ষণ নেই। ট্রাম্প যুদ্ধ শুরুর সময় ইরানিদের বলেছিলেন এটি তাদের জন্য সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার বড় সুযোগ। কিন্তু এখনো তেমন কোনো গণআন্দোলন দেখা যায়নি। ইরানে সরকার পতন হলে তা ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক সাফল্য হতে পারে। তবে অনেক বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন, কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ভেঙে পড়লে দেশটি সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ বা গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা বহু বছরের জন্য অঞ্চলটিতে জড়িয়ে পড়তে পারে অথবা মিত্র দেশগুলোকে বড় নিরাপত্তা সংকটে পড়তে হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ হয়তো শেষ হবে, কিন্তু এর ফলে সৃষ্ট আন্তর্জাতিক সংকট আরও খারাপ হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রেও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সমর্থক গোষ্ঠীর বাইরে অনেকেই এই যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহে শেষ হবে– এমন পূর্বাভাস নিয়ে সন্দিহান। যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময়ই একাধিক জরিপে তার যুদ্ধ নেতৃত্বের ওপর আস্থা কম দেখা গিয়েছিল। রিপাবলিকানরা কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তবে যুদ্ধ ‘কয়েক সপ্তাহ’ চলবে এমন আশ্বাস থেকে বোঝা যায় যে দলটির নেতারাও জানেন, ইরানে দীর্ঘ যুদ্ধ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাদের ক্ষতি করতে পারে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সম্প্রতি বলেন, এই যুদ্ধকে ইরাক কিংবা আফগান যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করা ঠিক নয়। তার ভাষ্য, ‘এটি সেই ধরনের অন্তহীন জাতি গঠনের যুদ্ধ নয়।’ তবে কংগ্রেসের সঙ্গে পরামর্শ না করে যুদ্ধ শুরু করা, অস্পষ্ট লক্ষ্য এবং স্পষ্ট প্রস্থান কৌশলের অভাব ইতোমধ্যেই ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনার সুযোগ করে দিয়েছে। ডেমোক্র্যাট নেতা পিট বাটিগিগ বলেন, ‘আমি সেনাদের নিয়ে উদ্বিগ্ন নই। আমি উদ্বিগ্ন তাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে, যেমন পিট হেগসেথ ও ডনাল্ড ট্রাম্প।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ছোটবেলায় এমন একটি যুদ্ধ দেখেছি যা মিথ্যা অজুহাতে শুরু হয়েছিল। কিন্তু এই যুদ্ধ তো কোনো অজুহাত ছাড়াই শুরু করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট (ট্রাম্প) নিজেই এটি শুরু করেছেন।’ আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, দীর্ঘ বিদেশি বিভিন্ন যুদ্ধে প্রাণ হারানো অসংখ্য মার্কিন পরিবারের স্মৃতি এখনো তাজা। ট্রাম্প নিজেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি এমন যুদ্ধ আর করবেন না। সেই বেদনাদায়ক ইতিহাস নতুন কোনো যুদ্ধের ক্ষেত্রে একটি কঠিন মানদণ্ড তৈরি করেছে, বিশেষ করে যখন তার সমাপ্তি অনিশ্চিত। সূত্র: সিএনএন