‘ধ্বংসস্তূপ’ থেকেও উড়ছে মিসাইল: ইরানের অন্তহীন ক্ষেপণাস্ত্রের রহস্য কী?

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের গন্ধ আর আগুনের গোলক এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের দাবি অনুযায়ী, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মাধ্যমে ইরানের সামরিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়া হয়েছে। হোয়াইট হাউস ঘোষণা করেছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এখন ‘কার্যত ধ্বংসস্তূপ’। কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপ থেকেই সোমবার সকালে কাতারের আকাশে দেখা গেল ইরানি মিসাইলের ঝলকানি। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ইসরাইল–সবখানেই বাজছে সাইরেন। প্রশ্ন উঠেছে, আধুনিক সমরাস্ত্রের ব্যাপক হামলার মুখেও ইরান কীভাবে এখনও তাদের আক্রমণ জারি রেখেছে? এটি কি কেবল টিকে থাকার লড়াই, নাকি তেহরানের কোনো গভীর ‘অপ্রতিসম’ রণকৌশল?মার্কিন দাবি ও বাস্তবতার বৈপরীত্য গত শনিবার হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা আজ সম্পূর্ণ অকার্যকর। তাদের নৌবাহিনী এখন লড়াই করার ক্ষমতা হারিয়েছে এবং আকাশসীমায় আমাদের পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও দাবি করেছেন, মার্কিন বাহিনী ইরানের ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্রগুলো গুঁড়িয়ে দিয়েছে।পরিসংখ্যান বলছে, হামলার তীব্রতা আগের চেয়ে অনেক কমেছে। যুদ্ধের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যেখানে ইরান ১৬৭টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৫৪১টি ড্রোন ছুড়েছিল, সেখানে ১৫তম দিনে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৪টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৬টি ড্রোনে। পেন্টাগনের হিসাবে, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ আগের চেয়ে ৯০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু এই সংখ্যার হ্রাস কি ইরানের পরাজয়, নাকি তাদের কৌশলী নীরবতা?গোপন লঞ্চার ও ভৌগোলিক সুবিধাইরান একটি বিশাল দেশ, যার ভূপ্রকৃতি অত্যন্ত জটিল। ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ডেভিড ডেস রোচেসের মতে, আকাশপথে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলেই মাটির নিচের সক্ষমতা ধ্বংস করা যায় না। ইসরাইলি গোয়েন্দাদের দাবি অনুযায়ী, তারা ইরানের আনুমানিক ৪৪০টি লঞ্চারের মধ্যে ২৯০টি অচল করে দিয়েছে। কিন্তু বাকি লঞ্চারগুলো কোথায়? আরও পড়ুন: হরমুজে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে মিত্রদের অনীহা, ক্ষুব্ধ ট্রাম্পবিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান যুদ্ধের অনেক আগে থেকেই তাদের মোবাইল লঞ্চারগুলো সামরিক ঘাঁটির বাইরে পাহাড়ের গুহায়, সাধারণ লোকালয়ে বা অচিহ্নিত গোপন স্থানে সরিয়ে নিয়েছে। প্রতিটি মিসাইল উৎক্ষেপণের সময় যে তাপ ও আলো তৈরি হয়, তা স্যাটেলাইটে ধরা পড়ে ঠিকই, কিন্তু লঞ্চারটি শনাক্ত করার আগেই তা স্থান পরিবর্তন করে ফেলে। ফলে ‘বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড’ বা সরাসরি স্থল অভিযান ছাড়া এই ভ্রাম্যমাণ ইউনিটগুলো পুরোপুরি নির্মূল করা অসম্ভব।‘হ্যারাসমেন্ট ফায়ার’: তেহরানের নতুন অস্ত্রসামরিক বিশ্লেষকরা ইরানের বর্তমান কৌশলকে বলছেন ‘হ্যারাসমেন্ট ফায়ার’ বা বিরক্তিকর হামলা। বড় ধরনের ঝাঁকে ঝাঁকে মিসাইল ছুড়ে শক্তি ক্ষয়ের বদলে ইরান এখন একটি বা দুটি করে মিসাইল ছুড়ছে। গত সোমবার আবুধাবিতে একটি বেসামরিক গাড়ির ওপর ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানা বা দুবাই বিমানবন্দরের কাছে ড্রোনের কারণে আগুন লাগার ঘটনা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।সামরিক দিক থেকে এই একটি বা দুটি হামলার গুরুত্ব হয়তো কম, কিন্তু মনস্তাত্ত্বিকভাবে এটি অত্যন্ত শক্তিশালী। এটি প্রমাণ করে যে, শত্রুপক্ষ আকাশ নিয়ন্ত্রণ করলেও ইরানের ‘আঘাত করার ক্ষমতা’ এখনও শেষ হয়ে যায়নি। এই চোরাগোপ্তা হামলা প্রতিবেশী দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সারাক্ষণ উচ্চ সতর্কতায় রেখে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে দিচ্ছে।ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের সমীকরণ জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের গবেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, তেহরানের মূল লক্ষ্য এখন একটি দীর্ঘমেয়াদি ‘অ্যাট্রিশন ওয়ার’ বা ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ। ইরানের হিসাবটা খুব সহজ–ইসরাইল বা উপসাগরীয় দেশগুলোর ব্যবহৃত ‘প্যাট্রিয়ট’ বা ‘আয়রন ডোম’-এর মতো ইন্টারসেপ্টর মিসাইলগুলোর একেকটির দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, ইরানের তৈরি একেকটি ড্রোনের দাম মাত্র কয়েক হাজার ডলার। আরও পড়ুন: ‘রকেট বৃষ্টি’তে ইসরাইলি বাহিনীকে গুঁড়িয়ে দেয়ার দাবি হিজবুল্লাহরইরান বিশ্বাস করে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র মজুত শেষ হওয়ার আগেই প্রতিপক্ষের ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভান্ডার ফুরিয়ে যাবে। এটি মূলত একটি ‘সময়ের যুদ্ধ’। ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কমান্ডকে বিকেন্দ্রীকরণ করেছে, যার ফলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিচ্ছিন্ন থাকলেও স্থানীয় কমান্ডাররা স্বাধীনভাবে হামলা চালিয়ে যেতে পারছেন।সস্তা ড্রোন ও ‘শাহেদ’ রহস্যইরানের অপ্রতিসম যুদ্ধের তুরুপের তাস হলো তাদের ড্রোন বাহিনী, বিশেষ করে ‘শাহেদ-১৩৬’। এগুলো সাধারণ কারখানায় খুব দ্রুত তৈরি করা যায় এবং এর জন্য কোনো জটিল লঞ্চারের প্রয়োজন হয় না। এই ড্রোনগুলো ধীরগতির হলেও (ঘণ্টায় মাত্র ১৮৫ কিমি) এগুলো অত্যন্ত নিচু দিয়ে উড়তে পারে, যা অনেক সময় রাডারকে ফাঁকি দেয়। একসঙ্গে কয়েক ডজন ড্রোন ছুড়লে অনেক সময় উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও খেই হারিয়ে ফেলে। ডোহা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মুহানাদ সেলুম বলেন, ‘কতগুলো ছুড়লেন সেটা বড় কথা নয়, একটি সফল ড্রোনই সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বোধ চুরমার করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।’অর্থনৈতিক ফ্রন্ট: জ্বালানি বাজারের অস্থিরতাবিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সামরিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘অসম যুদ্ধ’ বা অসম শক্তির সংঘাত। অর্থাৎ সামরিকভাবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সরাসরি মোকাবিলার বদলে অবকাঠামো ও অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করা। এরইমধ্যে এই সংঘাতের প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের উপরে উঠে গেছে এবং বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বড় গ্যাস রফতানিকারক কাতার তাদের উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। বাহরাইনের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সরবরাহে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছে এবং ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান তেলক্ষেত্রগুলোর উৎপাদনও প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। আরও পড়ুন: আরব আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ তেল বন্দর এবং দুবাই বিমানবন্দরে হামলা চালাল ইরান বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান যদি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ ধরে রাখতে পারে, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভালি নাসর এর মতে, ইরান যদি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এই অস্থিরতা ধরে রাখতে পারে, তবে তা আমেরিকান বোমার চেয়েও বেশি ক্ষতি করবে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে। তেলের দামের এই ঊর্ধ্বগতি পশ্চিমা বিশ্বের সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধের রাজনৈতিক সমর্থনে ফাটল ধরাতে পারে।শেষ কথা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাঁড়াশি অভিযানে ইরানের প্রথাগত সামরিক শক্তি নিশ্চিতভাবেই বড় ধাক্কা খেয়েছে। কিন্তু ‘ধ্বংসস্তূপ’ থেকে এখনও যে মিসাইলগুলো উড়ছে, তা প্রমাণ করে ইরান তার ‘অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশল’ থেকে সরে আসেনি। আধুনিক সমরাস্ত্র বনাম সস্তা কিন্তু কার্যকর ড্রোন-মিসাইলের এই অসম লড়াইয়ে জয় কার হবে, তা কেবল সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত তেহরানের এই ‘হ্যারাসমেন্ট স্ট্র্যাটেজি’ মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।