ঝুঁকি জেনেও মোটরসাইকেলে ২০ লাখ পরিবারের ঈদযাত্রা

ঢাকা থেকে ৮ লাখ পরিবার মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরবে চালক ও যাত্রী উভয়কে পড়তে হবে গুণগত মানের হেলমেট টায়ার, লুব্রিকেটিং ও অয়েলসহ ফিটনেস চেক করে নিতে হবে দীর্ঘ যাত্রায় ঘণ্টা খানেক পর পর বিরতি দেওয়া উচিত ঈদে বাড়ি ফেরা মানে একপ্রকার যুদ্ধ। ট্রেনের টিকিট মেলা ভার। আবার বাসেও স্বস্তি নেই, কেননা পথে পথে দীর্ঘ যানজটে আটকে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বাধ্য হয়েই ঝুঁকি নিয়ে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরা। এবার ঈদে বাড়ি যাবেন মোটরসাইকেলে করে, তাই কথাগুলো শেয়ার করছিলেন নেত্রকোণার বাসিন্দা সুজন মিয়া। গত কয়েক বছরের মতো এবারও ঈদে মোটরসাইকেলে করে গ্রামে ফেরার কথা বললেন তিনি। সুজন মিয়ার মতো একই সুরে কথা বলেন ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্কে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা জোনায়েত উল্লাহ রনি। ঈদে তিনিও বাইকে করে গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জে এবারও যাবেন। রনি বলেন, ঢাকায় যাদের মোটরসাইকেল রয়েছে তারা কয়েকটি কারণে গ্রামে নিয়ে যায়। ঈদের খুশিতে তারা বাইকে গ্রামে যায়। গ্রামে বাইকে ঘুরতে পারেন, অন্যান্য যানবাহনে চড়ে বেশি টাকা খরচ করতে হয় না। ঢাকা থেকে যাওয়ার পথে গণপরিবহনের ভোগান্তি এড়ানো যায়। যানজট থেকেও রেহাই মেলে। আর যাওয়া যায় যখন-তখন। এসব কারণেই বাইকে করে ঢাকা থেকে ঈদ করতে গ্রামে যান তিনি। শুধু সুজন মিয়া ও জোনায়েত রনি নয়, ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ঈদযাত্রায় অনেকের পছন্দ মোটরসাইকেল। এবার সারাদেশে ২০ লাখ পরিবার মোটরসাইকেলে ঈদযাত্রা করতে পারেন। আর শুধু ঢাকা থেকেই ৮ লাখ পরিবার মোটরসাইকেলে করে গ্রামে ফিরতে পারেন। এমন ধারণা করছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। একই রকম ধারণা দেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকায় থাকা ১০ থেকে ১৫ লাখ মোটরসাইকেলের ৬০ শতাংশ ঈদযাত্রায় ব্যবহার হয়ে থাকে বলে মনে করছেন এক পরিবহন বিশেষজ্ঞ। আর এখন ঈদযাত্রায় নগরীর আশেপাশের কয়েকটি জেলা পর্যন্ত মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ার করে থাকেন উবার ও পাঠাও চালকরা। জানা গেছে, দেশে এখন নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৪৮ লাখের বেশি। ঈদে মোটরসাইকেলের যাত্রা সবচেয়ে অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিবছরই ঈদযাত্রায় নিহত হওয়া ব্যক্তিদের অধিকাংশই মোটরসাইকেল চালক ও যাত্রী। অনিরাপদ জেনেও বাধ্য হয়েই মোটরসাইকেলে ঈদযাত্রা করে থাকেন অনেকে। যা বলছেন মোটরসাইকেল চালকরা ঈদে গত কয়েক বছর ধরে ঢাকা থেকে কুষ্টিয়ায় মোটরসাইকেলে যান বেসরকারি কর্মচারী রবিউল আলম। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই সড়ক অনেক উন্নত হয়েছে। এখন মোটরসাইকেলে করে কুষ্টিায়ায় খুব দ্রুত যাওয়া যায়। ঈদে বাসের টিকেট না পাওয়া ও ভাড়া বেশির কারণে মোটরসাইকেলে যাই।’ কয়েক বছর আগেও তিনি বাসে করে গ্রামে যেতেন। জাগো নিউজকে রবিউল আরও বলেন, ঈদের সময় রাস্তায় অনেক যানজট থাকে। তাই পরিবারকে রোজার মাঝে পাঠিয়ে দিয়েছি। এবার এবার ঈদে লম্বা ছুটি। গ্রামে মোটরসাইকেল  নিয়ে গেলে বেড়ানো যাবে। আনন্দ ফূর্তি করা যাবে। এজন্য এবার মোটরসাইকেলে যাবো। তিনি আরও বলেন, মোটরসাইকেলে ফেরিতে ১২০ টাকা নেয়। এর বাইরে শুধু তেলের খরচ। আর বাসে গেলে ফেরিতে উঠতেই এক থেকে দুই ঘণ্টা বাসে অপেক্ষা করতে হতো। কিন্তু মোটরসাইকেলে সরু রাস্তা দিয়ে যানজট হলেও ফেরিতে উঠা যায়। মদারীপুরের বাসিন্দা রিপন শেখ জাগো নিউজকে বলেন, পদ্মাসেতু হওয়ার পর এখন আমাদের গ্রামে যেতে মোটরসাইকেলে দুই ঘণ্টাও লাগে না। এ কারণে ঈদে এই রুটে মোটরসাইকেলে চাপ থাকে। অনেকেই মোটরসাইকেলে ঈদে গ্রামে যাবেন। আমিও ২৯ রজমানে অফিস শেষে মোটরসাইকেলে রওয়ানা দেবো। ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার বাসিন্দা ফাহিম বলেন, গফরগাঁও যাওয়ার প্রধান মাধ্যম ট্রেন। কিন্তু ঈদে ট্রেনে উঠা মানে বিশ্বজয়ের মতো বিষয়। এই বিশ্বজয়ের যুদ্ধে অংশ নিতে গেলে পকেট মার থেকে শুরু করে অনেক ভোগান্তি। ফলে কয়েক বছর ধরে ঈদে মোটরসাইকেলে করে বাড়ি যাই। ভোগান্তি এড়াতে এরইমধ্যে বউ বাচ্চা গ্রামে রেখে এসেছি। ঈদের আগের দিন অফিস ছুটি হবে। তখন মোটরসাইকেলে করে চলে যাবো। ২০ লাখ পরিবারের ঈদযাত্রা মোটরসাইকেলে এবার ঈদে ২০ লাখ পরিবার মোটরসাইকেলে ঈদযাত্রা করতে পারেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, আমাদের সমীক্ষা অনুযায়ী, এবার সারাদেশে প্রায় ২০ লাখ পরিবার ঈদযাত্রায় মোটরসাইকেল ব্যবহার করতে পারে। এরমধ্যে ঢাকা থেকেই প্রায় ৮ লাখ পরিবার মোটরসাইকেলে করে বাড়ি ফিরবে। এতে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি আছেই। মোটরসাইকেলে ঈদযাত্রার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, একদিকে গণপরিবহন সংকট, অন্যদিকে বাড়তি ভাড়া এই দুই সংকটের মধ্যেই মানুষকে এবারের ঈদযাত্রা করতে হচ্ছে। কিন্তু ঈদের সময় অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ন্ত্রণে এখনো কোনো কার্যকর কাঠামোগত সংস্কার হয়নি। ফলে অনেক যাত্রী বাড়তি ভাড়ার চাপ বহন করতে পারছেন না। এর সঙ্গে বাস ও ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়সহ নানা ধরনের ভোগান্তিও যুক্ত হচ্ছে। এই ঝক্কি-ঝামেলা এড়াতে অনেক মানুষ মোটরসাইকেলকে বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। মোজাম্মেল হক বলেন, ‘এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় গণপরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে শুধু মৌখিক ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থেকে কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে। বিশেষ করে গণপরিবহনে ক্যাশ লেনদেন বন্ধ করে ডিজিটাল পেমেন্ট চালু করা গেলে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য অনেকটাই কমে আসবে। ঈদযাত্রা ও গণপরিবহন পরিস্থিতির সামগ্রিক বিশ্লেষণ থেকে আমাদের সমীক্ষায় এসব বিষয় উঠে এসেছে। ৬ লাখের বেশি চালক ঈদযাত্রায় মোটরসাইকেল ব্যবহার করে থাকেন এমন ধারণা দিয়ে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ঢাকায় কত মোটরসাইকেল রয়েছে, সেই সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বলা কঠিন। তবে আমার ধারণা, ঢাকা শহরে ব্যক্তিগত ও রাইড শেয়ারিং মিলিয়ে প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ মোটরসাইকেল আছে। এর মধ্যে ঈদের সময় প্রায় ৬০ শতাংশ মোটরসাইকেল ঢাকা থেকে বাইরে যেতে পারে। ‌‘মোটরসাইকেলে যখন খুশি তখন রওয়ানা দেওয়া যায়’ পরিবহন ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ঈদ যাত্রাটায় অধিকাংশ মানুষ এখন সড়ক পথকেই বেছে নেয়। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে পদ্মা সেতুর ওপারের মানুষ সড়ক পথেই বেশি যায়। আবার উত্তরবঙ্গের দিকে নৌপথে যাওয়ার সুযোগ নেই, তারমানে সড়ক পথেই চাপটা সবসময় বেশি থাকে। যদিও আমাদের সড়কের পরিমাণ বেড়েছে, সড়ক অনেক প্রশস্ত হয়েছে, কিন্তু পরিবহনের সংকট কিন্তু রয়ে গেছে। মোটরসাইকেলে অনেক মানুষ যাত্রা করে তার একটা বড় কারণ হচ্ছে পরিবহনের সংকট। আরেকটা হচ্ছে এর ফ্লেক্সিবিলিটি, মানুষ চাইলে যখন খুশি তখন রওয়ানা দিতে পারে, নিজের খেয়াল-খুশিমতো। ঈদের সময় গণপরিবহন ব্যবহার করতে গেলেও একটা অনিশ্চয়তা থাকে, কাউন্টারে দীর্ঘ সময় বসে থাকা, বাস কখন আসবে সেই অনিশ্চয়তা, ঢাকা থেকে বের হওয়ার জটলা। এই অনিশ্চয়তা এড়াতেই ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও অনেকেই মোটরসাইকেল নিয়ে যাত্রা করে। সতর্কতা অবলম্বন জরুরি মোটরসাইকেল চালক ও যাত্রী উভয়কে পড়তে হবে গুণগত মানের হেলমেট। মোটরসাইকেলের মেইনটেন্যান্স ঠিক আছে কি না, টায়ার, লুব্রিকেটিং অয়েলসহ ফিটনেসের বিষয়গুলো দেখে নিতে হবে। দীর্ঘ যাত্রায় ঘণ্টাখানেক পরপর বিরতি দেওয়া উচিতও বলে মনে করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। যারা মোটরসাইকেল ঈদ যাত্রা করেন, সেই চালকদের করণীয় বিষয়ে পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘যারা মোটরসাইকেলে যাচ্ছেন তাদের প্রথমেই মনে রাখতে হবে অনেকে নিয়মিত দূরপাল্লায় মোটরসাইকেল চালান না। তারা মূলত শহরের মধ্যে চালান, কিন্তু ঈদের সময় হঠাৎ করে লম্বা ট্রিপে চলে যান। এজন্য গুণগত মানসম্পন্ন হেলমেট পরিধান করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। শুধু চালক নয়, সহযাত্রীকেও মানসম্পন্ন হেলমেট পরতে হবে। একই সঙ্গে মোটরসাইকেলের মেইনটেন্যান্স ঠিক আছে কি না, টায়ার, লুব্রিকেটিং অয়েলসহ ফিটনেসের বিষয়গুলো দেখে নিতে হবে। সামনে বৃষ্টি হচ্ছে, রাস্তা পিচ্ছিল থাকতে পারে, অনেক জায়গায় নির্মাণকাজ চলছে। তাই এগুলো যাচাই করে তবেই দূরপাল্লায় বের হওয়া উচিত। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটানা মোটরসাইকেল চালানো উচিত নয়। তিন-চার ঘণ্টা পরপর উপযুক্ত জায়গায় দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিয়ে তারপর আবার যাত্রা করা উচিত। এতে ঝুঁকি কিছুটা কমানো যায়। ঈদযাত্রা নিরাপদ করতে বুয়েটের এই অধ্যাপক বলেন, গণপরিবহনের সংকট থাকবে, এটা আমরা জানি। কিন্তু পরিবহন মালিকরা সারাবছর হাজার হাজার বাস কিনে ফেলে রাখবে আর শুধু ঈদের সময় ব্যবহার করবে, এটা বাণিজ্যিকভাবে সম্ভব না। তাই সরকারকে বিকল্প ভাবতে হবে। আমাদের সরকারি বহু প্রতিষ্ঠানের বাস আছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও অনেক বাস আছে, যেগুলোর ফিটনেস ঠিক আছে এবং দক্ষ চালক রয়েছেন। সরকার যদি পরিকল্পনা করে ঈদের সময় বিভিন্ন রুটে এই বাসগুলো চালাতে পারে, তাহলে যাত্রীরা বিকল্প পাবে এবং ঝুঁকি নিয়ে মোটরসাইকেলে যাত্রার প্রবণতা কমবে। ইএইচটি/এসএনআর