‘অনাহারে কাটছে ৮৫ মালয়েশিয়া প্রবাসীর রমজান’ শিরোনামে ১৬ মার্চ প্রকাশিত সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে মালয়েশিয়ার জোহর রাজ্যে শ্রমিকদের বেতন বকেয়া ইস্যুতে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় (কেসুমা) ও মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন। মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ জাবাতান তেনাগা কেরজা সেমনাঞ্জুং মালয়েশিয়া (জেটিকেএসএম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসস্টার ভিশন সেন্ডিরিয়ান বেরহাদ নামের একটি নির্মাণ ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের বেতন পরিশোধে বিলম্ব করেছে। ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ পরিচালিত তদন্তে দেখা গেছে, কোম্পানিটিতে মোট ১৬৯ জন কর্মী কাজ করেন। এর মধ্যে ৬৫ জন স্থানীয় এবং ১০৪ জন বাংলাদেশি কর্মী। তদন্তে আরও জানা যায়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বেতন দিতে বিলম্ব শুরু হয়। সেপ্টেম্বর মাসের বেতনের একটি অংশ ধাপে ধাপে পরিশোধ করা হয়েছে। জেটিকেএসএমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ২৯ জন স্থানীয় কর্মীকে নিয়ে মোট ১৪টি শ্রম মামলা দায়ের করা হয়, যেখানে মোট দাবি ছিল ২ লাখ ৬৩ হাজার ৭৬ দশমিক ৭৯ রিঙ্গিত। অন্যদিকে ২০২৬ সালে নতুন করে ১৪টি শ্রম মামলা খোলা হয়েছে, যেখানে ৮৬ জন বিদেশি কর্মী এবং ৬ জন স্থানীয় কর্মী জড়িত। এসব মামলায় মোট দাবি ৬ লাখ ৩৬ হাজার ৪১৪ দশমিক ৬৫ রিঙ্গিত, যার মধ্যে প্রায় ৫ লাখ ৭৮ হাজার রিঙ্গিত বিদেশি কর্মীদের পাওনা। এ পর্যন্ত শ্রম আইন অ্যাক্ট ১৫৫-এর ধারা ১৯(১) ও ধারা ৬৯(৪) অনুযায়ী ১৬টি তদন্ত নথি (কেস পেপার) খোলা হয়েছে এবং আরও আটটি তদন্ত প্রক্রিয়াধীন বলে জানিয়েছে বিভাগটি। মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে বলেছে, শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। শ্রম আইন লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা সহ্য করা হবে না। এ বিষয়ে মানবসম্পদ মন্ত্রী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কোম্পানিটির বিরুদ্ধে বিস্তারিত তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, যেন প্রযোজ্য আইনের আওতায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া যায়। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জেটিকেএসএমের মাধ্যমে মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ অব্যাহত থাকবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করার দিকে নজর রাখা হবে। একই সঙ্গে নিয়োগকর্তাদের শ্রম আইন মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। এদিকে ১৬ মার্চ মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ জানায়, ২০২৬ সালের ১৬ জানুয়ারি এসস্টার ভিশন এসডিএন বিএইচডি (ইভিএসবি) কোম্পানির বিরুদ্ধে ৮৫ জন বাংলাদেশি কর্মী বেতন না পাওয়ার অভিযোগ ই-মেইলের মাধ্যমে হাইকমিশনে জানান। অভিযোগে চার মাসের বেতন বকেয়া থাকা এবং ছয়জন কর্মীর ভিসা বাতিলের বিষয় উল্লেখ করা হয়। এ বিষয়ে শ্রমিকরা মালয়েশিয়ার শ্রম দপ্তরে অভিযোগ দায়ের করেন এবং প্রথম শুনানি অনুষ্ঠিত হয় ২৮ জানুয়ারি। ওই শুনানিতে শ্রমিকদের পক্ষে বাংলাদেশ হাইকমিশনের একজন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে হাইকমিশন কোম্পানি কর্তৃপক্ষকে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। ১১ ফেব্রুয়ারি কোম্পানির সিইও, এইচআর ম্যানেজারসহ তিনজন কর্মকর্তা হাইকমিশনে এসে মিনিস্টার (শ্রম)-এর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে কর্মীদের পাওনা দ্রুত পরিশোধের অনুরোধ জানালে কোম্পানি আর্থিক সমস্যার কথা উল্লেখ করে মূল বেতনের সঙ্গে কিস্তিতে বকেয়া পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেয়। পরে ৮ ও ৯ মার্চ প্রথম সচিব (শ্রম)-এর নেতৃত্বে বাংলাদেশ হাইকমিশনের একটি প্রতিনিধি দল জোহর বারুতে গিয়ে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশি শ্রমিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে। এছাড়া ১০ ও ১১ মার্চ মামলার দ্বিতীয় শুনানিতেও হাইকমিশনের একজন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ১৬ মার্চ কোম্পানিকে চিঠি দিয়ে শ্রমিকদের পাওনা দ্রুত পরিশোধের জন্য পুনরায় অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছে হাইকমিশন। জোহর রাজ্যের পাসির গুদাং এলাকায় ওই নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৮৫ জন বাংলাদেশি শ্রমিক দীর্ঘদিন ধরে বেতন না পাওয়ায় চরম মানবিক সংকটে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শ্রমিকদের দাবি, প্রায় ছয় মাস ধরে তারা বেতন ও ওভারটাইম ভাতা পাচ্ছেন না। ফলে খাদ্য সংকট, অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, গত জানুয়ারি মাসের শেষ দিক থেকে কোম্পানি খাবার সরবরাহও বন্ধ করে দিয়েছে। পবিত্র রমজান মাসে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে স্থানীয় কিছু বাংলাদেশির দেওয়া জাকাত ও সহায়তার খাবারের ওপর নির্ভর করে কোনোভাবে দিন পার করছেন তারা। অনেক সময় শুধু পানি দিয়ে ইফতার করতে হচ্ছে এবং আগের দিনের বাসি খাবার দিয়ে সেহরি সারতে হচ্ছে। অভিযোগের বিষয়ে কোম্পানির মুখপাত্র ল ইয়িক হুই বলেন, বিদেশি শ্রমিকদের উত্থাপিত উদ্বেগ সম্পর্কে কোম্পানি অবগত রয়েছে এবং বিষয়টি বর্তমানে শ্রম বিভাগের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে। তিনি দাবি করেন, কোম্পানি বেতন দিতে অস্বীকার করেনি এবং আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সমস্যার সমাধান করা হচ্ছে। পাশাপাশি শ্রমিকদের খাবারের ব্যবস্থা এবং কিছু আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথাও জানান তিনি। তবে শ্রমিকরা এই দাবি অস্বীকার করেছেন। তাদের বক্তব্য, এখন পর্যন্ত কোম্পানির পক্ষ থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা বা খাবার দেওয়া হয়নি। শ্রমিকরা দ্রুত বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং ‘রিলিজ লেটার’ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন, যেন তারা অন্য জায়গায় কাজের সুযোগ খুঁজে নিতে পারেন। বিদেশে আসার জন্য নেওয়া ঋণ এবং দেশে পরিবারের খরচের চাপের কারণে তারা বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।তাদের আশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিলে এই মানবিক সংকটের সমাধান হবে এবং তারা তাদের ন্যায্য পাওনা ফিরে পাবেন। এমআরএম/জেআইএম